এ-সবের মধ্যেই বাতের ব্যথায় একটু অসুস্থ হয়ে পড়লেন সত্যেন। একদিন বললেন, ব্যথাটা বাড়ছে, ভাবছি চিকিৎসার জন্য ছুটি নিয়ে কলকাতায় যাই একবার।
জ্ঞানদা উদ্বিগ্ন হন, পায়ের ব্যথা নিয়ে পনেরোদিন স্টিমারে থাকতে পারবে, কষ্ট হবে না?
সত্যেন হাসতে থাকেন, শোনো এবার আর অনেকদিন ধরে স্টিমারে যেতে হবে না। ১১ই অক্টোবর ১৮৬৭ বোম্বাই-কলকাতা রেলপথ খুলে গেছে। মাত্র পাঁচদিনেই পৌঁছে যাওয়া যাবে বোম্বাই থেকে কলকাতা।
রেল চালু হওয়ায় চারিদিকে মহা উৎসাহ হইচই। জ্ঞানদা আর জ্যোতিও উত্তেজিত নতুন অভিজ্ঞতার সম্ভাবনায়। তাদের উৎসাহের জোয়ারে ভেসে দু-এক দিনের মধ্যেই তিনটে রেলের টিকিট বুক করে ফেললেন সত্যেন। জ্ঞানদা ও জ্যোতিরিন্দ্রকে নিয়ে ফিরে এলেন জোড়াসাঁকোয়।
জোড়াসাঁকো কি পালটে গেল? নাকি ইতিমধ্যে স্বাধীনভাবে থাকতে অভ্যস্ত জ্ঞানদারই এ-বাড়িতে মানিয়ে নিতে অসুবিধে হচ্ছে! তার স্বাধীন চলাফেরায় যেন প্রতিমুহূর্তে বেড়ি পরিয়ে দিতে চাইছে নানা অনুশাসন। সারদার সঙ্গেও খটাখটি লাগছে বারবার। তার ফলে সত্যেনের চিকিৎসাও ব্যাহত হচ্ছে, ঠিকমতো বিশ্রাম হচ্ছে না।
দেবেন্দ্রনাথের অনুমতি নিয়ে এক মাসের জন্য আলাদা বাগান বাড়ি ভাড়া করে স্ত্রীকে নিয়ে চলে গেলেন সত্যেন। নিজের চিকিৎসার জন্যও এই নিরিবিলি পছন্দ হল তার। জ্যোতিও তাদের সঙ্গে এসে জড়ো হলেন। আমেদাবাদ ছাড়ার পর তিনজনের সাহিত্যবাসর যেখানে থেমে গেছিল আবার সেখান থেকেই যেন শুরু হয়ে গেল।
ঠাকুরবাড়িতেও সংস্কৃতি চর্চা থেমে নেই। নীপময়ী গান ও পড়াশোনার পাশাপাশি বাঁয়া তবলা, খোলকরতাল বাজানো শেখা শুরু করেছেন বেণীমাধববাবুর কাছে। হেমেন তাকে নিয়ম করে মিলটনের মহাকাব্য প্যারাডাইস লস্ট পড়াচ্ছেন। এর আগে পড়িয়েছেন কালিদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলম কাব্য। এমনকী দেশি ও বিদেশি শিক্ষকের কাছে ছবি আঁকাতেও হাত পাকাতে চেষ্টা করছেন হেমেনের আদরের পত্নী।
ওদিকে মেয়ে-বউদের পড়ানোর জন্য মেমশিক্ষিকারা আসছেন অন্তঃপুরে। কন্যা সৌদামিনীকে বেথুন স্কুলে পাঠিয়েছিলেন মহর্ষি, কিন্তু তারপরে আর কোনও মেয়ে-বউ স্কুলে যাননি। বাড়িতেই তাদের পড়াশোনার ওপর খুবই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জ্ঞানদা নিজেও সবুরান বিবির কাছে দীর্ঘদিন ইংরেজি শিখেছেন। শরৎকুমারীর অবশ্য রূপচর্চা ও রান্নার দিকে আগ্রহ বেশি। প্রতিদিন যত্ন করে ঘষে ঘষে সর-ময়দার রূপটান মেখে স্নান করেন তিনি। মাঝে মাঝে গায়ে মালিশ করেন স্বামীর বিলিতি মদের সঙ্গে ইতালিয়ান অলিভ অয়েলের মিশ্রণ। তার স্বামী যদুনাথের কাছে একবার ইয়ারবন্ধুরা ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের গায়ের রং জানতে চাইলে যদু রহস্য করে বলেছিলেন, সে রং দুধে আর মদে। পড়াশোনার পাশাপাশি চলত অন্যান্য শিক্ষা। রান্না, সেলাই, সেবা, শিশুপালন সবই নিয়মিত অনুশীলনের বিষয় বলে মানতেন অন্তঃপুরিকারা।
এই সুগৃহিণীপনার পাঠশালায় একেবারেই অনুপস্থিত থাকেন একমাত্র স্বর্ণকুমারী। তার এ-সব ভাল লাগে না। বিয়ের আগেও যেমন, পরেও তিনি ঘর বন্ধ করে সাহিত্যচর্চায় ব্যস্ত রেখেছেন নিজেকে। মগ্ন হয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস পড়েন আর স্বপ্ন দেখেন তিনিই হবেন বাংলার প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক। মাঝে মাঝে মালিনী এসে তার স্বপ্নকে উসকে দিয়ে যায় ইদানীং।
ইতিমধ্যে ঠাকুরবাড়িতে আরেকটি বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। নীপময়ীর বোন প্রফুল্লময়ী এসেছিল দিদির সঙ্গে দেখা করতে। তাকে দেখে খুব পছন্দ হয়ে গেল শরৎকুমারী ও স্বর্ণকুমারীর। তারা ভাই বীরেনের সঙ্গে বিয়ের উদ্যোগ নিলেন। বালিকাকে সাজিয়ে গুজিয়ে বীরেনের সামনে টেনে আনতে গেলে সে লজ্জায় পালিয়ে গেল। বন্ধু হরদেবের আর একটি মেয়ের সঙ্গে তার আর একটি ছেলের বিবাহ প্রস্তাব, দেবেন ঠাকুর খুশি হয়েই সম্মতি দিলেন। গা ভরতি গয়না ঝমঝমিয়ে বালিকাবধূ ঢুকলেন ঠাকুরদের প্রাসাদে। কিন্তু তাঁর বর বীরেন্দ্রর হাবভাবে একটু পাগলামির ছাপ। মহর্ষি ভেবেছিলেন বিয়ে দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
এরপরেই ঠাকুরবাড়িতে শুরু হল জ্যোতির বিয়ের তোড়জোড়। কিন্তু সত্যেন ও জ্ঞানদার তাতে মত নেই। সত্যেন দেবেন্দ্রনাথকে বললেন, বাবামশায়, এত তাড়াতাড়ি জ্যোতির বিয়ের কথা কেন ভাবছেন? ওর বয়স এখনও উনিশ হয়নি। আমার ভাইদের মধ্যে ও সবচেয়ে প্রতিভাধর। ওকে যে আমি বিলেত পাঠিয়ে উচ্চশিক্ষা দিয়ে মেজেঘষে আনব ভাবছিলাম।
দেবেন ঠাকুর কিন্তু এখনই জ্যোতির বিবাহ দিতে চান। কতদিন আর মেজদা মেজোবউঠানের পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়াবে সে! বিবাহ না দিলে ছেলেরা দায়িত্বশীল হয় না। পরিবারে আশ্রিত কর্মচারী শ্যাম গাঙ্গুলির সেজোমেয়ের সঙ্গে জ্যোতির বিয়ের কথা উঠেছে। আট বছরের বালিকা মেয়েটি নিরক্ষর হলেও সুন্দরী। চেনাশোনার মধ্যেই এমন মেয়ে যখন পাওয়া গেছে, বিয়ে লাগিয়ে দিলেই হয়।
জ্ঞানদার একেবারেই পছন্দ নয় এই বয়সে দেবরের বিয়ের প্রস্তাব। এখন তার তৈরি হওয়ার সময়। জ্যোতি লিখবেন একের পর এক নাটক কবিতা প্রবন্ধ, জ্ঞানদা হবেন তার প্রেরণাদাত্রী আর পৃষ্ঠপোষক সত্যেন। এমন একটা জীবনের পরিকল্পনাই তো তাঁরা আমেদাবাদে বসে করেছিলেন। আর বিয়ে যদি করতেই হয়, জ্যোতির বউ হবে ইংরেজি শিক্ষিত, বিলেত ফেরত, কেতাদুরস্ত। জ্ঞানদা এমনই এক পাত্রী দেখে রেখেছেন জ্যোতির জন্য। সূর্যকুমার গুডিভ চক্রবর্তীর বিলেত ফেরত মেয়ে, ইংরেজি শিক্ষিত, শ্যামলা রং কিন্তু মুখশ্রী সুন্দর। মেয়েটি সেসময় কলকাতায় এসেছিল। তাকে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে একদিন নেমন্তন্ন করে আনালেন জ্ঞানদা। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ এই সম্বন্ধে সম্মতি দিলেন না। সত্যেনের বউ শিক্ষিত কেতাদুরস্ত হয়ে ইস্তক বড্ড স্বাধীনচেতা হয়ে উঠেছে, বাড়ির অন্যান্যদের সঙ্গে মানিয়ে চলতে চায় না। এজন্য দেবেন্দ্র কিছুটা বিরক্ত। তিনি জ্ঞানদার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে শ্যাম গাঙ্গুলির মেয়ের সঙ্গেই কথা পাকা করতে নির্দেশ দিলেন।
