আন্না এগিয়ে এসে জ্যোতির দিকে হ্যান্ডশেকের ভঙ্গিতে হাত বাড়িতে দিলেন। তুমি মি. ঠাকুর জুনিয়র? আমার নাম আন্না।
জ্যোতি হাত মেলালেও আন্নার সহজ হাবভাবে একটু অবাক হন। তার সপ্রতিভ আচরণে মুগ্ধ হলেও মনে মনে বাঙালি মেয়েদের সঙ্গে তুলনা করতে থাকেন। জ্যোতির তরুণ হৃদয় যেন লাজুক বাঙালি কন্যাদের দিকেই ঝুঁকে আছে।
জ্যোতি আন্নার হাতের লাল পানীয়র গ্লাসের দিকে তাকিয়ে জানতে চান, তুমি কী পানীয় নিয়েছ?
আন্না কটাক্ষ করে বলেন, কেন, রেড ওয়াইন। তুমি চেনো না? তোমার হাত খালি কেন, চলো একটা ড্রিঙ্ক নাও।
ঠাকুরবংশে সবরকম নেশাই চলে কিন্তু দেবেন ঠাকুরের ছেলেরা শুদ্ধ জীবনযাপনে বিশ্বাসী, মদে নয় তারা কাব্যপাঠের নেশায় মাতাল। জ্যোতির দ্বিধা দুর থেকে লক্ষ করে এগিয়ে আসেন জ্ঞানদা, জ্যোতির হাত ধরে বলেন, সত্যি তো পার্টিতে এসে ড্রিঙ্ক নিচ্ছ না কেন নতুন, আন্না তো ঠিকই বলছে, চলো। তাঁকে টেনে সেলারের দিকে নিয়ে যান জ্ঞানদা।
আন্নাও সঙ্গে সঙ্গে আসেন। স্কচ নেবে, না ওয়াইন? জিজ্ঞেস করেন জ্যোতিকে। জ্ঞানদার দিকে প্রশ্নাকুল চোখে তাকান জ্যোতিরিন্দ্র, তুমি বলো মেজোবউঠান কী নেব?
স্কচ, জ্ঞানদা বলেন।
আন্না তাকে বাধা দিয়ে বলেন, মি. ঠাকুর জুনিয়র, তুমি প্রথমবার খাচ্ছ তো রেড ওয়াইন টেস্ট করো। আমার মতো।
এই সময় ড্রিঙ্ক নিতে এলেন মি. জন ম্যাকগ্রেগর, সত্যেনের বন্ধু। জ্ঞানদার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বলেন, ওঃ লুক! হাউ বিউটিফুল ইউ আর লুকিং টুনাইট!
লজ্জায় লাল হয়ে জ্ঞানদা বলেন, মি. ম্যাকগ্রেগর, প্লিজ ডোন্ট মেক মি এমব্যারাসড। দেয়ার আর সো মেনি বিউটিজ অ্যারাউন্ড।
মিসেস টেগোর, টুমি সবার থেকে সুন্দর। টোমার ড্রেস সুন্দর, টোমার বডি সুন্দর, টোমার কথা সুন্দর। ইউ আর দি এপিটোম অফ ইন্ডিয়ান বিউটি। চলো ডান্স করি। টুমি আমার পার্টনার হবে প্লিইইইইজ। ম্যাক কাতর অনুনয় করেন জ্ঞানদার হাত ধরে।
জ্যোতি প্রথমে অবাক হচ্ছিলেন পরে তার রাগ হতে থাকে। ঠাকুরবাড়ির বউয়ের হাত ধরে একজন উটকো সাহেব কেন টানাটানি করবে? মেজদাদা দূর থেকে দেখলেও যেন দেখছেন না। হাসছেন, যেন খুব মজার কিছু ঘটছে। তিনি জোর করে জ্ঞানদার হাতে ধরা ম্যাকের হাত ছাড়িয়ে দেন। রাগতস্বরে বলেন, ডোন্ট ডিসটার্ব হার, লিভ হার অ্যালোন।
হাউ ডেয়ার ইউ? ম্যাক জ্যোতিকে চেনেন না, তেড়ে যান তার দিকে। জ্ঞানদার দিকে তাকিয়ে বলেন, লুক লেডি, ইফ ইউ ডোন্ট লাইক মি প্লিজ টেল মি ডিরেক্টলি, বাট কনট্রোল ইয়োর বডিগার্ড।
পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে সত্যেন এগিয়ে আসেন, জ্যোতিকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ম্যাক, হোয়াই আর ইউ সো টেনস? মাই ইয়াং ব্রাদার ইজ আ বিট পজেসিভ আবাউট হিজ বৌঠান। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।
উত্তেজিত জ্যোতিকে টেনে সরিয়ে এনে সত্যেন বললেন, ম্যাক যদি জ্ঞানদার সঙ্গে ডান্স করতে চায় তাতে কী মহাভারত অশুদ্ধ হল? নারীপুরুষ একসঙ্গে নাচা তো বিলিতি কালচারের পার্ট, জ্ঞানদা এখনও সহজ হতে পারছে না কিন্তু হয়ে যাবে। তোকেও শিখতে হবে। এজন্যই তো এ-সব পার্টিতে আসা। তুই কেন কুয়োর ব্যাঙের মতো আচরণ করছিস?
জ্যোতি ক্ষুব্ধ মনে অন্যদিকে সরে যান। বিলিতি কালচারের সবকিছুই আমাদের নকল করতে হবে কেন? মেজোবউঠানের ইচ্ছে না হলেও ওই সাহেবটার সঙ্গে নাচতে বাধ্য করবেন মেজদাদা?
গৃহস্বামী পাণ্ডুরং ম্যাকগ্রেগরের সঙ্গে রঙ্গতামাশা করে হালকা করে দিতে চান ব্যাপারটা। হলঘরের কোনায় রাখা সোফায় আন্না, জ্ঞানদা ও ম্যাকগ্রেগরকে নিয়ে আড্ডা দিতে বসেন। শ্ৰীমতী পাণ্ডুরং অচিরেই তাদের দলে যোগ দিলেন। আজ তিনি কী সুন্দর পাথর বসানো কাশ্মীরি সিল্ক পরেছেন, গলায় সাতনরি মুক্তোর হার। প্রতিবারের মতো এদিনও তাকে দেখে চমৎকৃত হন জ্ঞানদা। রুচি ও সম্পদের কী আশ্চর্য মিলন।
প্রথমবার বোম্বাই এসে এঁদের আতিথ্যেই ছিলেন জ্ঞানদা। এই মরাঠি পরিবারের মেয়েদের সাজগোজ, শাড়ি পরার ধরন জ্ঞানদাকে খুবই আকৃষ্ট করেছিল। এখানেই তার আধুনিকতার পাঠশালা। পারঙের স্ত্রী শিক্ষিত কেতাদুরস্ত মহিলা, সাহেবমেম নারীপুরুষ সবার সঙ্গেই মেলামেশায় স্বচ্ছন্দ। ওঁদের তিন মেয়ে আন্না দুর্গা ও মানিক, ইংরেজি কেতায় বড় হচ্ছে। বোম্বাই অঞ্চলে সমাজ সংস্কারের ব্যাপারে এই পরিবার খুবই অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। শ্রীমতী পাণ্ডুরঙের বাড়িতে দুঃসাহসী সমাজ সংস্কারক পণ্ডিতা রমাবাইয়েরও নিয়মিত যাতায়াত।
এঁদের সান্নিধ্যে জ্ঞানদা সবসময়েই উজ্জীবিত হন। কিন্তু এখন ওঁদের সঙ্গে কথাবার্তার মধ্যেও তার দুর্ভাবনা হচ্ছে। জ্যোতিটা বোকা, কেন যে এত মাথা গরম করে ফেলল! সত্যেন পরে নিশ্চয় জ্ঞানদাকেই বকবেন।
এভাবেই ঠাকুরবাড়ির বৃহৎ সংসারের বাইরে শিল্প সংস্কৃতি আত্মীয়তার একটি অন্তরঙ্গ ত্রিকোণ রচিত হচ্ছে সতেরো বছরের জ্ঞানদা, আঠারোর জ্যোতিরিন্দ্র আর তাদের অভিভাবক সত্যেনের মধ্যে। আমেদাবাদে আরও কিছুদিন ইংরেজি সাহিত্য চর্চার পর জ্ঞানদার আগ্রহ জাগল সংস্কৃত কাব্যের প্রতি। ঠাকুরবাড়ির পাঠশালায় বাংলা ইংরেজি অনেক পড়া হলেও জ্যোতির সংস্কৃত পড়া হয়নি। জ্ঞানদার উৎসাহেই সংস্কৃত কাব্য ও নাটকপাঠ শুরু করলেন জ্যোতি। প্রতিদিন সন্ধেবেলা সত্যেন ঘরে ফিরলে শুরু হয় তিনজনের আসর। কখনও জ্যোতি কখনও সত্যেন অভিজ্ঞান শকুন্তলম্ পাঠ করেন। পড়তে পড়তে শকুন্তলার অনুবাদ করতে ইচ্ছে হয় জ্যোতির।
