একদিন জোড়াসাঁকোর দালানে হইহই করে মুড়ি তেলেভাজা সহযোগে নাটকের মহড়া চলছে, এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে একটি কাগজ হাতে জ্যোতি এসে উপস্থিত হলেন, দেখো দেখো, সোমপ্রকাশ আমাদের নাটকের রিভিউতে লিখেছে, শনিবার আমরা জোড়াসাঁকো নাট্যশালায় নবনাটকের অভিনয় দর্শন করিতে গিয়াছিলাম। এখানে নাটক অভিনয়ের যে প্রণালী দর্শন করিলাম, তাহা যদি সৰ্ব্বত্র প্রচলিত হয়, আমাদিগের বিশুদ্ধ আমোদ ভোগের একটি উৎকৃষ্ট উপায় হইয়া উঠে। নাট্য শালা প্রকৃত রীতিতে নির্মিত ও দ্রষ্টব্যর্থগুলি সুন্দর বিশেষতঃ সূৰ্যাস্ত ও সন্ধ্যার সময় অতিমনোহর হইয়াছিল। অধিকতর আহ্লাদের বিষয় এ সমুদায়গুলি এতদ্দেশীয় শিল্পজাত। দর্শকদের উপবেশন প্রণালী অদ্যাপিও উৎকৃষ্ট হয় নাই… এককালে দ্বার উদঘাটিত হওয়াতে যাবতীয় দর্শক প্রবেশ করিয়া সকলেই সমুখের আসন গ্রহণ করিবার চেষ্টা করেন, তাহাতে গোলযোগ, গাত্রঘর্ষণ ও আসনভঙ্গ ইহার ফল হইয়া উঠে।… সকলেরই বেশ প্রায় উত্তম হইয়াছিল, কিন্তু সাবিত্রী না স্ত্রীলোক না হিজড়ে রূপ ধারণ করে।… কোন কোন অংশে কিছু কিছু ত্রুটি থাকুক সাকল্যে বিবেচনা করিলে গ্রন্থ ও অভিনয় উভয়ই উত্তম হইয়াছে।
সোমপ্রকাশ অতি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা। অনুকূল রিভিউ পেয়ে সকলেই আনন্দে মেতে ওঠেন। ন্যাশনাল পেপারেও ভাল রিভিউ বেরিয়েছে। সমর্থন পেয়ে উৎসাহিত কলাকুশলীরা জোড়াসাঁকো রঙ্গমঞ্চে ঘন ঘন প্রায় নবার নবনাটক মঞ্চস্থ করলেন।
ফাল্গুনমাস নাগাদ সত্যেন তার কর্মস্থল আমেদাবাদে ফিরে যাওয়ার সময় জ্যোতিকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন। জ্যোতি না থাকায় কলাকুশলীদের উৎসাহ কমে গেল, নবনাটকও বন্ধ হয়ে গেল।
জ্যোতি এই প্রথম ঠাকুরবাড়ির অভিজাত বনেদিয়ানার বাইরে বেরিয়ে জ্ঞানদার গৃহস্থালির মাঝখানে বিশ্বপৃথিবীর আর একটি সংসার খুঁজে পেলেন। সত্যেন কাজে বেরিয়ে গেলে দুজনের অখণ্ড অবসর, দুজনেই অসীম আগ্রহে নতুন নতুন বই পড়েন, গান শোনেন। শেকসপিয়রের নাটক পড়ে উত্তেজিত আলোচনা করেন। সিমবেলাইন নাটকটি জ্যোতিকে এত নাড়া দিল যে তিনি শুরু করে দিলেন বাংলা তর্জমা। কিছুটা এগিয়ে জ্যোতির মনে হল মাছি মারা কেরানির মতো অনুবাদ না করে তিনি এর বঙ্গীকরণ করবেন। জ্ঞানদাকে পড়ে শোনাতে শোনাতে জ্যোতি বললেন, নাটকটির নাম কী দেওয়া যায় মেজোবউঠান?
জ্ঞানদা বললেন, আচ্ছা তোমার নাটকে নায়িকার নাম তো সুশীলা, তার নামেই নাম দাও না। নায়িকার বাবার নামে এখানে নাটক জমবে না।
জ্যোতি ভাবতে থাকেন, সুশীলা নামটি মন্দ নয়, কিন্তু আরও ভাল কী নাম হতে পারে? শেকসপিয়রের নাটকে রাজা সিমবেলাইনের মেয়ে ইমোজেন বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধে পসথুমাস নামে এক নিচুশ্রেণির ছেলেকে বিয়ে করে। বাবার পছন্দের পাত্র ক্লোটন নানাভাবে ওদের জুটি ভেঙে ইমোজেনের মন জয় করার চেষ্টা করে। অনেক ষড়যন্ত্র, বিচ্ছেদ, সংকটের মধ্য দিয়ে শেষে ইমোজেন ও পসথুমাসের মিলন হয়, সিমবেলাইন তার ভুল বুঝতে পারেন। কিন্তু শেকসপিয়র তাঁর নাটকের নাম ইমোজেন না রেখে সিমবেলাইন কেন রাখলেন?
তাই বলে তুমিও কি নায়িকার বাবার নামে নাম দেবে। বরং নায়কের নামে হোক, জ্ঞানদা বলে ওঠেন। তোতামার তো সহজে কোনও কিছু পছন্দ হয় না নতুন ঠাকুরপো।
আচ্ছা মেজোবউঠান, সুশীলা-বীরসিংহ নাটক নামটা কীরকম হবে? জ্যোতি জিজ্ঞেস করেন।
হ্যাঁ, এবার বেশ বীরত্ব আর লালিত্যের মিলমিশ হয়েছে, এটাই ভাল নাম। নাটকের জন্য লোকের আগ্রহ বাড়বে।
আমেদাবাদে থাকতে থাকতেই তরতর করে নাটক এগিয়ে চলে। মার্চ মাস নাগাদ বই হয়েও বেরিয়ে যায়। সুশীলা-বীরসিংহ নাটকের পরতে পরতে মেজোবউঠানের ছোঁয়া অনুভব করেন জ্যোতি, তার উৎসাহ তরুণ নাট্যকারটিকে শস্যশ্যামলা করে তোলে। অবশ্য সত্যেন এই দুই স্বপ্নাতুর নাট্যমোদীকে প্রশ্রয় না দিলে কিছুই এগোত না। আমেদাবাদে সরকারি কাজকর্মের ফাঁকে সত্যেন নিয়মিত চিঠি লিখছিলেন জোড়াসাঁকোর গণেন্দ্রকে, অনেক কিছুর সঙ্গে জ্যোতির নাটকের বই প্রকাশ করার সমস্ত ব্যবস্থা করার দায়িত্ব তিনি স্বেচ্ছায় নিয়েছিলেন। এক অর্থে ঠাকুরবাড়ির সবচেয়ে প্রগতিশীল পুরুষ সত্যেন্দ্রনাথ। স্ত্রীর শিক্ষা ও স্বাধীনতার বিষয়ে যেমন, ভাইদের প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্রেও তিনিই ছিলেন অগ্রণী।
আমেদাবাদে এসে জ্যোতির বিকাশে যাতে বাধা না পড়ে সে ব্যাপারেও সত্যেন সতর্ক। তার মনে হল জ্যোতির মনে আনন্দ আনার জন্য সেতার শেখানো যেতে পারে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। আবার কিছুদিন জ্যোতি ও জ্ঞানদার জন্য মাস্টার রেখে ফরাসি শেখানোর বন্দোবস্ত হল। আমেদাবাদে থাকতে দু-একটি পারসি ও মরাঠি পরিবারের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেছেন ওঁরা। বোম্বাইতে সত্যেনের পুরনো বন্ধু আত্মারাম পাণ্ডুরঙের বাড়িতে দল বেঁধে যাওয়া হল একবার।
পাণ্ডুরঙের মেয়ে আন্না তড়খড়ের জন্মদিন উপলক্ষে সেদিন তাঁদের। বাড়িতে বিরাট পার্টি। জ্যোতিকে সেই পার্টিতে ছেড়ে দিয়ে মজা দেখছিলেন জ্ঞানদা। সাহেবমেমরা তো আছেনই, তার সঙ্গে আছেন কিছু অভিজাত ভারতীয় পরিবার। পারসি ও মরাঠি সে-সব মেয়েরা কী ঝকঝকে, সপ্রতিভ। বাঙালি নারীসুলভ লজ্জায় জড়সড় নয় একেবারেই। যার জন্মদিন সেই আন্নার রূপে ও স্মার্টনেসে সবাই মুগ্ধ। চটপটে চৌখস মেধাবিনী মেয়েটি বয়সে বালিকা কিন্তু হাবভাবে সাজসজ্জায় যেন রাইকিশোরী। আশেপাশে অনেক প্রীতিপ্রার্থী কিশোর ঘুরঘুর করলেও নবাগত জ্যোতিকেই তাঁর পছন্দ হল।
