স। তুমি যে কথাগুলি বলিলে তাহা অকাট্য এবং তাহার মত যতদিন আমরা চলিতে না পারি ততদিন আমাদের ভণ্ডামী এবং সকল বিষয়েই কষ্ট তাহাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। নম্রতা, বিনয়, সুশীলতা এই সকলই প্রকৃত লজ্জা যে তুমি বলিলে তাহা সত্য এবং তাহা কেবল সাত হাত ঘোমটা দিলেও হয় না, মুখে গো দিয়া থাকিলেও হয় না। ভাল কাৰ্য্য দ্বারাই ভাল গুণ প্রকাশ পায়।
.
বামাবোধিনী পর্ব মিটতে বেলা দুপুর গড়িয়ে গেল। ইতিমধ্যে মেয়েরা অনেকেই উঠে গেছেন। এই কচকচি সবার ভাল লাগে না। দাওয়ার নীচে দাসীরা রাশিকৃত মাছ নিয়ে কুটতে বসেছিল, তাদের কাজও প্রায় শেষ। এবার রসুইঘরে বামুনঠাকুরেরা রান্না চাপাবে। তার আগে সবাই নারকেলের নাড়ু, দইচিড়ে কলা বাতাসার ফলার দিয়ে জলখাবার খাওয়া শুরু করলেন।
কর্তাদের ও ছেলেদের মহলে মহলে পাথরের থালা-বাটিতে জলখাবার পাঠানো হয়ে গেছে। কোনও বাচ্চা খাওয়া নিয়ে গোল করলে দাসীরা চড়থাপ্পড় দিয়ে খাওয়ায়, ও নিয়ে বাড়ির গিন্নিদের খুব একটা মাথাব্যথা নেই। প্রতিটি ছেলেমেয়ে অন্নপ্রাশনে উপহার পায় একসেট জয়পুরি সাদা পাথরের থালা, বাটি, গেলাস। আর দুধের জন্য একটা রুপোর বাটি। দাসীরা সেই বাসনে রান্নাঘর থেকে খাবার এনে বালক বালিকাদের খাওয়ায়। দুধের ঘর আলাদা। সাদা থালা-বাটি ভাঙলে ক্রমে ক্রমে আসে মুঙ্গেরের কালো পাথরের বাসন। কাসা-পেতলের বাসনে খায় সরকার, বামুন, ঝি, চাকর। তখনও কাঁচের বাসন চালু হয়নি।
মালিনী সবার সঙ্গে পাথরের বাটিতে ফলার খেয়ে প্রচুর বই বিক্রি করে বিদায় নেওয়ার আগে ঠিক হল সে পরের হপ্তায় স্বর্ণকুমারীর বাড়িতে যাবে। বলাই বাহুল্য জোড়াসাঁকোর মেয়েরাও সেদিন স্বর্ণর পালঙ্কে আসর জমাবেন। তার সিমলের বাড়ির শোবার ঘরের বিরাট পালঙ্কে প্রায় দুপুরেই জোড়াসাঁকোর বোন, বোনঝি, বউঠানদের নিয়ে আসর বসে। বিকেল হতেই তাসখেলা, গল্পগুজব, আবৃত্তি, কবিতাপাঠের সঙ্গে চলে মুড়ি-ফুলুরি-বেগুনির ঢালাও সরবরাহ। তার সঙ্গে বই-মালিনীর সঙ্গ যোগ হলে তো ষোলো আনার ওপর আঠারো আনা। একটি আসর শেষ হতে হতেই পরবর্তী আড্ডার সম্ভাবনায় চনমনে হয়ে ওঠে মেয়েরা।
মেয়েমহলের প্রাণসঞ্জীবনী এই আর ছোট ছোট সুখ-দুঃখের কোনও খবরকেই মহাজ্ঞানী কর্তামশাইরা অবশ্য গুরুত্ব দেন না। তাঁদের অজান্তে ও অবহেলায় ঘরের কোণে কোণে মেয়েমহলে বিতর্কের আলো জ্বালিয়ে আসে বই-মালিনী।
০৩. কাদম্বরীর প্রবেশ
মনে পড়ে সেইদিন, নাটকের ‘হিরোইন’
সম্মুখে আয়না ধরি
গবেশ করিতে বন্দী, পাতিছেন নানা ফন্দী
পান খেয়ে ঠোঁট লাল করি।
মরি মরি মরি।।
জ্যোতির উৎসাহে জোড়াসাঁকোয় দুবাড়ির ছেলেরা মেতে উঠেছে স্টেজ বেঁধে নবনাটক অভিনয় করতে। মেয়েদের রোলে পুরুষেরাই অভিনেতা। চন্দ্রলেখার নারীভূমিকায় পুরুষ অমৃতলালের অভিনয় দেখে মজা করে ছড়া বেঁধেছেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। বলাই বাহুল্য তা নিয়ে নাটকের কলাকুশলীরাই হেসে অস্থির। বহুবিবাহপ্রথার দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে লোকশিক্ষায় এই নাটকটি লিখেছেন রামনারায়ণ তর্করত্ন। ও-বাড়ির গণেন্দ্র ও এ-বাড়ির জ্যোতিরিন্দ্রর উদ্যোগে বাড়ির ছেলেরা অভিনয় করতে নেমেছে, মেয়েরা চাইলেও তাদের নাটকে অংশ নিতে দেওয়ার সাহস পাননি জ্যোতিরা। অভিজাত বাড়ির আঙিনায় পরিবারের ছেলেরা নাটক করছে– এটাই যথেষ্ট দুঃসাহসের কাজ। এখনও ইতরশ্রেণির যাত্রার সঙ্গে থিয়েটারকে গুলিয়ে ফেলা হয় বাঙালি সমাজে। বাবামশাই ব্যাপারটা কীভাবে নেবেন, কে জানে।
দেবেন্দ্রনাথ অবশ্য খবর পেয়ে খুশি হয়ে ভাইপো গণেনকে চিঠিতে লিখেছেন, তোমাদের নাট্যশালার দ্বার উদঘাটিত হইয়াছে– সমবেত বাদ্য দ্বারা অনেকের হৃদয় নৃত্য করিয়াছে– কবিত্ব রসের আস্বাদনে অনেকে পরিতৃপ্তি লাভ করিয়াছে। নির্দোষ আমোদ আমাদের দেশের যে একটি অভাব, তাহা এই প্রকারে ক্রমে ক্রমে দূরীভূত হইবে।… কিন্তু আমি স্নেহপূৰ্ব্বক তোমাকে সাবধান করিতেছি যে, এ প্রকার আমোদ যেন দোষে পরিণত না হয়।
জ্যোতিরিন্দ্র শিল্পসাহিত্যে খুব উৎসাহী, কিছুদিন আর্ট স্কুলে আঁকা শিখেছেন। কবিতা ও নাটক লেখেন। সুপুরুষ জ্যোতি এই নাটকে সুন্দরী নটীর রোল করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন। তাঁর মেয়েলি হাবভাব। দেখে লোকে হেসে লুটিয়ে পড়ে।
বাড়ির এক জামাইনীলকমলনট সেজেছেন, আর এক জামাই শরৎকুমারীর বর যদুনাথ সেজেছেন চিত্ততোষ। এই যদুনাথকে নিয়ে দেবেন ঠাকুর খুব ভুগছেন। প্রায়ই তিনি ইয়ারবন্ধুদের বাড়িতে জুটিয়ে এনে মাতলামি করেন। যা কাজের ভার দেওয়া হয় তা কিছুই করেন না, কিন্তু তিনি রসিক এবং নাটুকে ব্যক্তি। তার হালকা স্বভাবের জন্য স্ত্রী শরৎকুমারী প্রথম দিকে স্বামী নামক ব্যক্তিটির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। নাম ধরে যদু যদু বলে ডেকে ফেলে মাঝেমাঝেই সারদাদেবীর কাছে ধমক খেতে হয়েছে তাকে।
গবেশ নামক চরিত্রের দুই স্ত্রী, বড় গিন্নির রোলে সৌদামিনীর বর সারদাপ্রসাদ আর ছোটগিন্নি সাজলেন সরকারমশায়ের ছেলে অমৃতলাল। নারীচরিত্রে এঁদের দেখে দর্শকেরা যে কতদূর আমোদিত হচ্ছিলেন দ্বিজেনের কৌতুক ছড়াটি তারই প্রমাণ।
কিছুদিন পরেই যে এই অমৃতলালের বোন কাদম্বরী কর্মচারী পরিবার থেকে জ্যোতির গৃহলক্ষ্মী হয়ে আসবেন সে-কথা তখনও ভাবা হয়নি। জ্যোতির বিয়ের কথা তখন ওঠেনি। তিনি ব্যস্ত ছিলেন গান, কবিতা, নাটকচর্চা নিয়েই। সত্যেন ও জ্ঞানদাও তাকে উৎসাহ দেন এ ব্যাপারে।
