স। তোমরা কালের মত মেয়ে। তোমাদের ভাব গতিক আলাদা। কোন কালে মেয়েরা বেহায়া হলে ভাল রীত চরিত্র আবার দেখাতে পেরেছে? কোনকালে আবার মেয়েরা লজ্জা খেয়ে গুরুলোকের সঙ্গে স্পষ্টাস্পষ্টি কথা কয়ে বেড়ায়েছে?
সু। যথার্থ লজ্জা, নম্রতা, বিনয়, সুশীলতা তাহা স্ত্রীলোকের অলঙ্কার সন্দেহ নাই। কিন্তু যদি মনে সেরূপ ভাল ভাব না থাকে, বাহিরের লজ্জা কি কোন কাজের হয়? কত মেয়ে খুব লজ্জা দেখাত, কিন্তু দুঃখের কথা কি বলবো তারা অনায়াসে আবার বেশ্যাবৃত্তি অবলম্বন করিয়াছে, খুব তিলক ফোঁটা কাটিয়া যারা বাহিরে ধার্মিক দেখায়, তাদের মধ্যেই ভণ্ড বেশী। যাহা হউক তুমি জেন, এখন স্ত্রীলোকদের মধ্যে যেরূপ ভণ্ড লজ্জা দেখা যায়, পূৰ্ব্বকালে এ রূপ ছিল না। সীতার ন্যায় সতী কে? কিন্তু তিনি রামচন্দ্র বনে গেলে কাহার কথা না শুনিয়া পতির অনুসরণ করিলেন এজন্য ত কেহ তাহাকে বেহায়া বলিল না। সাবিত্রী, দময়ন্তী প্রভৃতি যত বিখ্যাত রমণীর কথা শুনা যায়, কেহ ত পরিবারের মধ্যে ঘোমটা দিয়া বসিয়া ছিলেন না, অথচ তাহাদের ন্যায় পতিভক্তিপরায়ণা ও গুণবতী রমণী কোথায় দেখা যায়? বেদ পুরাণ ও আর আর প্রাচীন শাস্ত্র যত পাঠ করা যায়, ততই দেখা যায় শাশুড়ী ননদ স্বামী কি শ্বশুর ভাসুরের সঙ্গে কোন স্ত্রীলোক কথাবার্তা কহা পাপ বিবেচনা করিতেন না। আজি কালি মেয়েদের ভাল গুণ থাকুক না থাকুক তাহারা বাহিরে লজ্জা দেখাইয়া বাহাদুরী করিতে চান!!
স। আমরা রামায়ণ মহাভারতের এ সব কথা শুনেছি বটে, কিন্তু তুমি বল দেখি সে কালের ব্যাভার কি একালে খাটে? আর এরকম না কল্লেই বা ক্ষতি কি?
সু। এই তুমি বলিতেছিলে কোন কালে মেয়েরা এরূপ ছিল, কথা উল্টাইয়া লইলে। ভাল, পূৰ্ব্বকালে এখনকার মত ভণ্ড লজ্জা দেখাইবার প্রথা ছিল না তাহা ত বুঝিয়াছ। সেকালের ভাল প্রথা একালে ঘটিবে না কেন তাহাত বুঝিতে পারি না। বর্তমান প্রথায় কি ক্ষতি, বলিতেছি। জগদীশ্বর মুখ দেছেন কেননা মনের ভাব প্রকাশ করিবার জন্য। মেয়ে মানুষেরা কথা কহিতে পায় না বলিয়া ত তাহাদের মন চুপ করিয়া থাকেনা। মনের কথা কাহার সঙ্গে প্রকাশ করিতে না পাইলে তার চেয়ে দুঃখ কি আছে? কত সময় তাহাদের পীড়া ও অনেকপ্রকার কষ্ট উপস্থিত হয়, প্রথমে প্রকাশ করিতে না পারিয়া শেষে বিপরীত ঘটিয়া উঠে। বাঘা শাশুড়ী ননদের ঘরে নববধূদিগের যে দুরবস্থা, তাহা কে বর্ণনা করিতে পারে? এই কারণে অনেকের অপঘাত মৃত্যু ও অপথে পদার্পণও হইয়া থাকে। আর মনে কর হিন্দুর ঘরের ৮/১০ বৎসরের একটী শিশু বাপ মা ভাই ভগিনী সকল পরিত্যাগ করিয়া শ্বশুরগৃহে আসিল। সেখানে সে যদি আপনার লোক না পায়, তাহাকে সর্বদা কুণ্ঠিত হইয়া মুখবন্ধ করিয়া থাকিতে হয়, কাহার মুখপানে চাহিয়া স্নেহ পাইবার আশা না থাকে সে কিরূপে জীবনধারণ করিতে পারে? অনেক গৃহে নববধূদের যে কষ্ট তাহা তাহারাই জানে আর সেই অন্তর্যামী পুরুষই জানেন। শাস্ত্রমতে পতির গৃহই স্ত্রীলোকের গৃহ, পতির পিতা মাতা ভাই ভগিনী তাহারাও পিতামাতা ভাই ভগিনী। তবে তাহাদের নিকট এত লজ্জা কেন? লজ্জা পর বা পাপ বোধ করাইবার চিহ্ন৷ গৃহ, পিতা মাতা, ভাই ভগিনী আপনার সামগ্রী সকল যাহা দ্বারা পর বোধ হয়, এমন লজ্জার ন্যায় শত্রু আর কে আছে? আর পিতা মাতা ভাই ভগিনী আত্মীয়গণের নিকট সরল ভাবে মনের কথা প্রকাশ করিলে তাহাতে যে পাপ আরোপ করে তাহার ন্যায় কু আচার বা জগতে কি আছে?
লজ্জা থাকাতে যাহার প্রতি যে কর্তব্য তাহা প্রতিপালন করিবার অনেক ব্যাঘাত হয়। স্ত্রীলোকেরা যদিও হীনবল, কিন্তু তথাপি তাহারা অশেষ প্রকারে পরিবারের সাহায্য করেন ও করিতে পারেন। কিন্তু অনেক সময় কুৎসিত লজ্জা আসিয়া আপনার মত অতি আত্মীয় জনের বিপদ পীড়া ও দুর্ঘটনার সময় সাহায্য করিতে দেয় না। কত সময় বধূ বা ভাদ্রবধূদের সম্মুখে শ্বশুর বা ভাসুর যদি প্রাণত্যাগ করেন, তথাপি তাহার হস্ত প্রসারণ করিবার ক্ষমতা নাই, একটী সান্ত্বনার কথা বলিবার উপায় নাই। একি সামান্য দুঃখের কথা! এসকল শাস্ত্র ছাড়া–যুক্তি ছাড়া।
স। লজ্জা দ্বারা অনেক ক্ষতি হয় তাহার সন্দেহ কি? কিন্তু তুমি যে বলিলে ইহা শাস্ত্র ছাড়া, যুক্তি ছাড়া তবে সকলে ইহা ধরিয়া চলেন কেন?
সু। এতদিন স্ত্রীলোক লেখাপড়া শিখত না কেন? হিন্দুরা জাহাজে চড়িয়া বিদেশ যাইত না কেন? বিধবা বিবাহ মন্দ ও সহমরণ ভাল বলিয়া প্রসিদ্ধ ছিল কেন? দেশাচার ও কুসংস্কারে কিনা করে? তবে যে প্রথাটী হয় তাহার একটা না একটা কারণ থাকে। স্ত্রীলোকের নম্রতা থাকা উচিত ইহা বেশী করিতে গিয়া এবং পুরুষেরা একটু আপনাদের কর্তৃত্ব বাড়াইতে গিয়া স্ত্রীলোকদিগকে জুজু করিয়া ফেলিয়াছেন। এ প্রথা কোন দেশে নাই এদেশেও থাকিবে না।
স। আচ্ছা, বাড়ীর আর আর লোকের সঙ্গে কথা কহুক, কিন্তু বল দেখি বৌ হইয়া স্বামীর সঙ্গে স্পষ্টাস্পষ্টি কথাবার্তাটা কি ভাল দেখায়?
সু। পতিই স্ত্রীলোকের গতি, পতিই সুহৃদ বন্ধু সকলই। পতির ন্যায় আত্মীয় কে হইতে পারে? পূৰ্ব্বকালে সতীরা পতির জন্য কি না করিয়াছেন? কিন্তু কি আশ্চৰ্য্য একেলে সংস্কার! এমন পরম আত্মীয় পতির সহিত কথা কও দুষ্য। পতি ও পত্নীর মধ্যে যে ধর্ম সম্বন্ধ আছে তাহা না দেখিয়া লোকে কুৎসিত ভাব গ্রহণ করে এবং তাহারাও পরস্পরকে দেখিয়া লজ্জিত হন ইহা অপেক্ষা আমাদের সমাজের জঘন্যতার পরিচয় আর কি আছে? আমি তোমাকে পূৰ্ব্বকালের যে সকল সতী রমণীর কথা বলিয়াছি, তাহাদের দৃষ্টান্ত দেখিয়া সকলেরই চলা উচিত। স্বামীর সঙ্গে এক হৃদয় হওয়াই সতীর লক্ষণ, স্বামীর সুখে সুখ, দুঃখে দুঃখ বোধ করা, ছায়ার ন্যায় সকল কার্যে, তাহার অনুবর্তিনী হওয়া এবং সখীর ন্যায় তাহার হিতকৰ্ম্ম করা, শাস্ত্রমতে এই ত সতীর প্রধান ধৰ্ম্ম। যদি স্বামী ও পত্নীর মধ্যে লজ্জা আসিয়া পরস্পরকে পর করিয়া দেয় এবং পাপের ভার সঞ্চার করে তাহা হইলে প্রকৃত দাম্পত্য ধৰ্ম্ম। কোন রূপেই রক্ষা পাইতে পারে না। আজি তোমাকে এই অবধি বলিলাম, পরে আর আর কথা বলিব, আমার ইচ্ছা স্ত্রীলোকেরা এরূপ জঘন্য লজ্জা পরিত্যাগ করিয়া গৃহে স্বাধীনভাবে আত্মীয়গণের প্রতি যথা কর্তব্য সাধন করুন্। ইহা কি তোমার ইচ্ছা নয়?
