বাবারে বাবা, সব দায় যেন মেয়েদের, স্বর্ণ বলেন, মেয়েরা যদি ঘরকন্নার কাজে সারা দিনরাত বাধা পড়ে থাকে তো তারা শিল্পসাহিত্য করবে কী করে? দেশের কাজে যোগ দেবে কীভাবে?
মালিনী বলে, অন্তঃপুর, ভারতমহিলা সব পত্রপত্রিকার দেখো মেয়েদের কর্তব্য নিয়ে যেন চিন্তায় ঘুম হচ্ছে না। প্রগতিশীল বাবুমশায়রা বিবিদের শিক্ষিত করতে চান, কিন্তু গেরস্থালির নিগড় থেকে মুক্তি দিতে নারাজ। আর রক্ষণশীলেরা স্ত্রীশিক্ষার নামেই কেঁপে উঠছেন। প্যারীচাঁদ মিত্র প্রমুখ অনেকে প্রচার করছেন প্রাচীন ভারতে নারীর স্থান ছিল সুউচ্চ। তাই যদি হবে স্বর্ণদিদি, তা হলে অন্দরমহলে এত অন্ধকার কেন?
আচ্ছা মালিনী, তুই তো এত জানিস, সারদা জানতে চান, বল তো বিলিতি মেমরা কি খুব সুখী আর স্বাধীন?
ওরা আমাদের মেয়েদের চেয়ে হাজার গুণ স্বাধীন কত্তামা, কিন্তু ওদেরও অনেক দুঃখ আছে, পরাধীনতা আছে। মালিনী জানায়, মারি উলস্টোনক্রাফট নামে এক বিবির লেখা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে খুব হইচই হচ্ছে, তিনি লিখেছেন, স্ত্রী স্বামীকে ভালবাসবে সহযোগীর মতো কিন্তু তার শাসনদণ্ডের কাছে মাথা নোয়বে না। এ-সব লেখার জন্য তাঁর বর ছেড়ে গেছে। সমাজ টিটকিরি দিয়েছে, কিন্তু তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন। এখন তাঁর মতামতের কিছু শিষ্যা তৈরি হয়েছে। ভাবো কত্তামা, আমরা ওদেশের মেয়েদের স্বাধীন ভাবছি আর ওরা সেই স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। তা হলে আমরা কোথায় আছি?
উফ, তুই কী যে বলিস অদ্ধেক আমার মাথায় ঢোকে না মালিনী। বিলেতে বসে কোন মেমসাহেব কী লিখছে, কী বলছে আর তুই জেনে ফেললি!
মালিনী হাসে, কত্তামা, আমি বলেছি না জাদু জানি। কী শুনতে চাও বলো না। সময় আমাকে বাঁধতে পারে না। আমার বয়স বাড়ে না। কালিদাসের কথা জানতে চাও, আমিই হয়তো ছিলাম তার মালঞ্চের মালিনী। হয়তো ভবিষ্যতে তোমার ছোট ছেলে রবি কী লিখবে তাও আমার চোখের সামনে ফুটে উঠবে। বলো, শুনতে চাও? বিলিতি মেমদের গুহ্যকথা চাও না দুশ বছর পরের কলিকাতা? বিক্রম বেতাল না বামাবোধিনী?
জ্ঞানদা এতক্ষণ শুনছিলেন, এবার বললেন, ঠাট্টা ছাড় মালিনী, ঠিক করে বল তো বামাবোধিনীর মতো পত্রিকাগুলি কি তা হলে বিবিসাহেবের কথামতো শুধু দাসত্বের পাঠক্রমই শেখাচ্ছে? আবার মেয়েরা সব গৃহকাজ তুলে দিলে কাজটা করবেই বা কে? ইংরেজ মেয়েরা কিন্তু খুব নিপুণ ভাবে সংসার করে। সেটাও কি শিক্ষণীয় নয়? # ঘরের কাজ নিয়মিত অভ্যেসে নিপুণ করে তোলাটাকেও একটা আর্ট বলে মানেন জ্ঞানদা। সংসারের সবদিকে তার পরিপাটি নজর। রুচিশীল পোশাক যেমন পরতে হবে, ভারতীয় সংস্কৃতির ভাল দিকটাও রাখতে হবে। আবার তার সঙ্গে মেশাতে হবে ইংরেজ কেতার ভাল অংশটিকে। তিনি নিজেকে যেমন ফিটফাট রাখেন, নিজের ঘরকেও।
স্বর্ণকুমারী কিন্তু জ্ঞানদার মতো গুছিয়ে ঘরের কাজ করা পছন্দ করেন না, তার মনে হয় গৃহকর্ম করলে সময় নষ্ট, তার চেয়ে অনেক জরুরি কাজ তার করার আছে। তিনি প্রতিবাদ করেন, কেন মেজোবউঠান, মেয়ে হয়ে জন্মালেই কেন ও-সব করতে হবে? মিসেস স্মিথের কাছ থেকে মারি উলস্টোনক্রাফটের ওই বইটা আনিয়ে নিয়ে পড়েছিলাম, এ ভিন্ডিকেশন অফ দি রাইটস অফ উইমেন। ওঃ, সে কী তেজস্বিনী লেখিকা, কী আগুনঝরা কথাবার্তা! আমিও শুনেছি, এজন্য তাকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, বিলেতে কেউ তার কথাবার্তা ভালভাবে নেয়নি, সভা বয়কট করেছে, স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গেছে, তবু তিনি দমেননি।
জ্ঞানদা বললেন, বোম্বাই থাকতে আমিও মারির কথা শুনেছি। সাধারণ ইংরেজ মহিলারা তার নাম শুনলে ভয় পান আর পুরুষরা রেগে ওঠেন। ঠাকুরঝি, আমরা বোধহয় তাঁর চেয়ে ভাগ্যবতী, আমাদের দুজনের স্বামীরা আমাদের সঙ্গে আছেন, এবং তারাই স্ত্রী স্বাধীনতার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। মারিকে কিন্তু বিলেতে বসেও ঘরে বাইরে যুদ্ধ করতে হয়েছে। ঘরের কাজে মন না দিয়ে লেখালেখির চর্চা করে তিনি সে দেশে কোণঠাসা হয়েছেন আর এ দেশে বামাবোধিনী শিক্ষিত মেয়েদের ঘরের কাজে অবহেলা করতে না বলে কী এমন অপরাধ করছে?
মালিনী বলে ওঠে, আমাদের এখানেও দুয়েকজন মুখ খুলছেন স্বর্ণদিদি, এই তো দু-তিন বছর আগে সোমপ্রকাশে বেরিয়েছিল স্ত্রীলোকের পরাধীনতা বিষয়ে বামাসুন্দরীর চিঠি। মেয়েরা কী করবে সেটা মেয়েরাই ঠিক করুক না!
ঠিকই তো, দাসী চাকরদের দিয়ে যে কাজ করানো যায় তার জন্য শিক্ষিত পত্নীর কেন দরকার না করলেই কেন সাড়ে সর্বনাশ হবে? আমি কী করব সেটা বামাবোধিনীর জ্ঞান শুনে ঠিক করতে হবে? স্বর্ণকুমারী রাগত স্বরে বললেন।
একটু হেসে মালিনী বলে, এই বিতর্ক বেশ জমে উঠেছে। কিন্তু স্বর্ণদিদি, বামাবোধিনীর এ-লেখা সে-লেখা নয়। আধুনিকা আর পুরাতনীর বিরোধ নিয়েই একটা মজার কথোপকথন, শোনোই না–
সরমা ও সুশীলার কথোপকথন
সরমা। ভাই, আজিকালি মেয়েমানুষে লজ্জা সরমের মাথা খেয়েছে। শ্বশুর, ভাসুর, শাশুড়ী ননদ দেখিয়া একটু ভয়সমীহ করে না। আর অধিক কি বলিব, স্বামীর সঙ্গে নির্লজ্জ হয়ে কথাবার্তা কয়।
সুশীলা। সরমা মেয়েমানুষেরা কি গারোদে বাঁধা চোর? দেখ দেখি, ঈশ্বরের এতবড় জগতে সকল জীবজন্তু ইচ্ছায় ভ্রমণ করিয়া মনের সুখ লাভ করিতেছে। কিন্তু ইহাদিগকে চারি পাঁচিলে ঘেরা অন্তঃপুরের মধ্যে রুদ্ধ থাকিতে হয়। পাখীরা যে পিঁজরাতে বদ্ধ থাকে, তার মধ্যে তাহাদের একটু স্বাধীনতা আছে, চারি পাঁচিলের মধ্যেও নারীগণ একটু স্বাধীনতা না পাইলে তাদের বাঁচিয়া থাকা কেবল যন্ত্রণা মাত্র। আর আমি বলি কেবল ঘোমটা দিয়া জুজু হইয়া থাকিলেই যে মেয়েমানুষ খুব ভাল হইল তাহা নয়। যাহার রীত চরিত্র ভাল, তাকেই ভাল বলি।
