সে যাই বল মা, স্বর্ণ বলেন, মেজোবউঠানকে দেখে সেদিন এমন গর্ব হচ্ছিল, আমি তো নিজে হাতে সাজিয়ে দিয়েছিলাম। মাথায় সিঁথি পরালাম, গয়না পরালাম। আশমানি বেনারসি শাড়িতে, অলংকারে, ঋজু ভঙ্গিতে তাকে ঠিক রাজরানি মনে হচ্ছিল। মেজদা যেতে পারলেন না বলে এক মেমসাহেবের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন। সে কী মহাব্যাপার, শত শত ইংরেজ মহিলার মধ্যে একজন বঙ্গরমণী। মেজদাদা কত গর্ব করছিলেন সেজন্য।
বই-মালিনী একটি পত্রিকা খুলে ধরে, এই দেখো, সোমপ্রকাশের পৌষ সংখ্যায় কী লিখেছে পড়ে শোনাই, গত বৃহস্পতিবার গবর্ণর জেনেরলের বাটীতে রাত্রিকালে যে মজলিস হয়, তাহাতে বাবু সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী আমাদিগের জাতীয় বস্ত্র পরিধান করিয়া উপস্থিত ছিলেন। ইতিপূর্বে কোন হিন্দু রমণী রাজ প্রতিনিধির বাটীতে গমন করেন নাই।
সে যদি গেলেই বাছা, স্বামীর সঙ্গে গেলেই কি ভাল হত না! সারদা বলে ওঠেন। জ্ঞানদা মনে মনে ভাবেন সংস্কার তা হলে ভাঙছে; এই সেদিন গাড়ি চেপে বাড়ি আসার জন্য যে কত্তামায়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল সেই তিনিই এখন মৃদু আপত্তি জানাচ্ছেন স্বামী সঙ্গে না থাকায়, যেন যাওয়াটা তিনি বাধ্য হয়ে মেনে নিলেন। জ্ঞানদা জানেন বাঙালি মেয়েদের মন থেকে এইভাবে এক এক করে অনেক অন্ধকার কাটাতে হবে। এই তো সবে শুরু!
ইতিমধ্যে মালিনীর ঝাপি থেকে অনেক বই বেরিয়ে পড়েছে। জ্ঞানদা একটা একটা করে উলটে পালটে দেখতে থাকেন। বটতলার একগাদা নতুন বই, উপন্যাস, কাব্য, আষাঢ়ে গল্প এনেছে। মানভঞ্জন, রতিবিলাপ, কোকিলদূত, বস্ত্রহরণের সঙ্গেই আছে গীতগোবিন্দ, আরব্য রজনী, পারস্যোপন্যাস, লায়লা মজনু, বাসবদত্তা।
একটি বই হাতে নিয়ে স্বর্ণ অবাক হন, ওমা এ যে রবিনসন ক্রুশো। মালিনী তুমি বিলিতি বইয়ের বঙ্গানুবাদ এনেছ, কী মজা! আবার সচিত্র বই, ছবিগুলো কিন্তু ভালই এঁকেছে।
কই দেখি দেখি, বালিকা বর্ণ এসে টানাটানি করে ছবি দেখতে চান। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা মালিনীর বই জমিয়ে জমিয়ে ইতিমধ্যেই বেশ ভাল লাইব্রেরি করে ফেলেছেন, সেখান থেকেই ছোট মেয়েদের গল্প উপন্যাস পড়া শুরু হয়। বাড়ির বালকেরা এই রসভাণ্ডারের খোঁজ পায় দেরিতে কারণ শিশুবয়সে বাইরের চাকরদের মহলেই তাদের থাকার নিয়ম। বিশেষ কোনও মাসিমা মামিমা বউঠানদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠতে না পারলে অন্দরে ঢোকা যায় না। নিয়মমতো বিয়ের পর ছেলে-বউয়ের জন্য একটি ঘর নির্দিষ্ট হলে তবেই ভেতরমহলে ছেলেরা ঢুকতে পারে। বিয়ের পর থেকে সত্যেন এই লাইব্রেরির নিয়মিত পাঠক। সত্য আর রবি কোনও ছুতোয় ভেতরে ঢুকতে পারলেই মেয়েদের পাঠাগারের বই নাড়াচাড়া করেন। যে-সব বই তাঁদের পড়তে বারণ করা হয় সেগুলো লুকিয়ে পড়ার জন্য নানারকম উপায় খোঁজেন। সারদা নিজে পড়েন কম, প্রায়ই ছেলেদের ডেকে রামায়ণ বা চাণক্যশ্লোক পড়ে শোনাতে বলেন। সেই সূত্রেই সেজো আর ছোটর অন্দরের লাইব্রেরির সঙ্গে পরিচয়।
ছবছরের রবি কদিন আগেই বইয়ের লোভে এক দুঃসাহসিক কাণ্ড ঘটাল। দূর সম্পর্কের এক মাসিমা দীনবন্ধু মিত্রের জামাইবারিক পড়ছিলেন, রবি সে-বই পড়তে চাইলে বয়স হয়নি বলে তাঁকে নিষেধ করা হল, চাবি দেওয়া আলমারিতে বই তুলে রেখে চাবি আঁচলে বেঁধে পিঠে ফেললেন মাসিমা। বালক রবি সেই চাবি চুরি করতে গিয়ে ধরাও পড়লেন। মাসিমা কোলের ওপর চাবি রেখে মেয়েদের সঙ্গে গোল হয়ে বসে তাস খেলতে লাগলেন। এবার কী হবে, বইটা তো পড়তেই হবে রবিকে! কিন্তু কী উপায়ে? বাধ্য হয়েই বালককে কুটিল কৌশল নিতে হল।
মাসিমার হাতের কাছে পানদোক্তার পাত্র এনে রাখলেন রবি। পানের নেশায় অন্যমনস্ক মাসিমা ঝুঁকে পিক ফেলতেই কোল থেকে চাবিটি মাটিতে পড়ল, মাসিমা চাবি মেঝে থেকে কুড়িয়ে অভ্যাসমতো আবার আঁচলে বেঁধে পিঠে ফেললেন। এবার আর রবির চাবি চুরি করতে কোনও অসুবিধে হল না। চাবি নিয়ে আলমারি খুলে বই বার করে পড়া হল এবং চোর ধরা পড়ল না। পরে রবি নিজে ধরা দিতে সবাই চেঁচামেচি শুরু করল কিন্তু শাস্তি কিছু হল না।
এখন বই নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে থাকা মেয়েদের দিকে তাকিয়ে সারদা বলেন, ওরে শুধু তোরাই দেখবি, না আমাকে কিছু পড়ে শোনাবি? স্বল্লো এদিকে আয়, আমাকে চাণক্যশ্লোকের কপাতা পড়ে শোনা দেখি।
মালিনী বলে, চাণক্যশ্লোক তো রোজ শোন কত্তামা, আজ তোমাকে নতুন একটা কাহিনি শোনাব। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রণীত সীতার বনবাস। শুনলে তোমার চোখে জল আসবে গো মা। কিংবা যদি চাও বামাবোধিনীতে একটা মজার লেখা বেরিয়েছে, সেটা শোনাই…।
স্বর্ণ বিরক্ত হয়ে বলেন, আবার তুই সেই বামাবোধিনীর গা জ্বালানো লেখাগুলো এনেছিস! বলেছি না ও-সব স্ত্রীর প্রতি স্বামীর উপদেশমার্কা লেখা আনবি না, হাজার বছর ধরে ও-সব শুনে শুনে কান পচে গেছে। যেন মনে হয় মেয়েদের শিক্ষা দেবার একমাত্র উদ্দেশ্য সুমাতা, সুভার্যা, সুগৃহিণী তৈরি করা। ও-সব আর শুনতে চাই না।
স্বর্ণদিদি, তোমাদের নতুন মেয়েদের নতুন যুগের ধরন ধারণ দেখে যাদের মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে তারাই ও-সব লেখাচ্ছেন। তারা ভয় পাচ্ছেন লেখাপড়া শিখে একে মেয়েরা মাথায় উঠেছে, এখন বাইরে বেরতে শুরু করলে তাদের আর দাবিয়ে রাখা যাবে না। মেয়েরা আর ঘরের কাজ করবে না, ছেলে মানুষ করবে না, পতিভক্তি উঠে যাবে, শাশুড়ি সেবা পাবেন না। দেখোনা, বঙ্কিমবাবু কেমন দেবী চৌধুরানীকে প্রথমে শক্তিরূপা করে এঁকেও আবার স্বামীর পদতলে নামিয়ে দিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ লিখেছেন, পশ্চিমের মেয়েরা প্রধানত পত্নী, এদেশের মেয়েরা মূলত মা। লিখেছেন, মায়েদের কর্তব্য স্বাস্থ্যবান, শৌর্যপরায়ণ, দেশপ্রেমিক, আর্যজনোচিত সুসন্তান গঠন।
