স্বর্ণ এসেছেন শুনে দোতলার ঘর থেকে জ্ঞানদাও নেমে আসেন। ওঁদের দুটিতে খুব ভাব। স্বর্ণ তাঁর দিকে প্রীতির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন, কী গো মেজোবউঠান, শুনেছ আমাদের সাজপোশাক নিয়ে কত রগড় লেখা হচ্ছে?
হ্যাঁ স্বর্ণ, সেদিন নতুনঠাকুরপো বলছিল, কয়েকটি কলেজের ছোকরা নাকি বলাবলি করছে ঠাকুরবাড়ির বউবিবি আরও কত কী!
তবু তোদের হাওয়া খেতে যেতে হবে? সারদা বিরক্তি চেপে রাখেন না। ঠাকুরবাড়ির এত বদনাম আমার প্রাণে সয় না বাপু।
কেন মা, পত্রিকায় মেজোবউঠানের দেওয়া বিজ্ঞাপন দেখে কত ব্রাহ্মিকা শাড়ি-পরা শিখতে আসছেন দেখছ তো! আগে এঁরা গাউন পরে বাইরে বেরনোর কথা ভাবছিলেন। কেউ কেউ তো গাউনের ওপর আঁচল জুড়ে কিম্ভুত পোশাক তৈরি করে ফেলেছেন। তার চেয়ে বোম্বাই কায়দায় শাড়ি পরার দিশি ঢং অনেক ভাল।
বছর আটেকের একটি বালিকা কোথা থেকে হঠাৎ দৌড়ে এসে সারদাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। মেয়ে-বউরা সব সচকিত হয়, কে এই মেয়েটা?
সারদা ওর হাত ছাড়িয়ে মুক্ত হতে চেষ্টা করেন, এই, কে রে তুই? কোত্থেকে এসে আমার গায়ে উঠে পড়লি? আমার এ-সব একদম ভাল্লাগে না, তোরা জানিস না? সর, সরে যা বলছি।
মেয়েটি মুখ তুলে বলে, আমাকে ওরা ধরে নিয়ে যেতে আসছে, তুমি বাঁচাও কর্তামা। আমি তোমার কাছে থাকব।
এই মানদা, এটা কে রে? ওপাশের কুটুমদের কারও মেয়ে নিশ্চয়? দাসীদের কাছে জানতে চান সারদা। সরিয়ে নিয়ে যা ওকে।
মানদা টেনে মেয়েটিকে সারদার কাছ থেকে সরিয়ে আনে। ঠাস করে থাপ্পড় দিয়ে বকে ওঠে, এই বেহায়া মেয়ে, কে রে তুই?
বালিকা ফুঁপিয়ে উঠে বলে, আমি তো রূপা, আমি এখেনে এসে রোজ বসে থাকি তোমাদের পেছুনে, দেকনি আমাকে?
বালিকার মুখটি ভারী মিষ্টি, মায়াময়। সারদা জানতে চান, তুই কোথায় থাকিস, মা কে রে তোর?
তুমিই আমার মা। সরিয়ে দিচ্ছ কেন, আমি আর ওভেনে যাব না। ওরা আমায় ভালবাসে না কেউ।
ঘোমটায় জড়সড় একটি বউ ছুটে এসে মেয়েটাকে টানতে যায়। সারদা গম্ভীর গলায় বলেন, দাঁড়াও, কে তুমি? আর মেয়েটাই বা কে? তোমার মেয়ে?
হাত জোড় করে বউটি জানায়, অপরাধ নেবেন না কত্তামা, আমরা আপনার আশ্রিত, কুটুমদের মহলে থাকি। এটি আমার সোয়ামির আগের পক্ষের মা-মরা মেয়ে। এমন দজ্জাল, কোনও কথা শোনে নাকো। মারতে মারতে আমার শাখা ভেঙে যায়, ওর শিক্ষে হয় না।
সারদা হুকুম দেন, খবরদার ওকে মারবে না বলছি। সতীনের মেয়ে বলে মেরে হাতের সুখ করছ? আমার এখানে থাকতে হলে এ-সব চলবে না। মানদা তুই নজর রাখ তো কুটুম মহলে। গুষ্টির লোক আমাদের খাচ্ছেদাচ্ছে আর বাড়ির নিয়ম মানছে না, এ আমি সইব না। আমার ছাতের নীচে কোনও মেয়ের গায়ে কেউ হাত তুলবে না।
রূপা সৎমায়ের হাত ছাড়িয়ে সারদার দিকে ছুটে আসতে চায় আবার। দূর থেকে দেখে দেখে সে বুঝেছে এই মহিলার দয়া পেলে সে বেঁচে যাবে। এখানকার আলো-হাওয়া, হাসি-গল্প আনন্দের জগৎ ছেড়ে সে আর ওই কুটুম মহলে অন্ধকার, কলহ, ঝগড়াঝাটির মধ্যে ফিরে যেতে চায় না।
তবু যেতে হয়। যাওয়ার আগে তার করুণ দৃষ্টি দেখে একটু মায়া হয় সারদার। তিনি বলেন, তুই রোজ সকালে এখানে এসে আমাকে প্রণাম করে যাস রূপা। এই একটি কথায় বালিকার জীবন যেন বদলে যায়। সে বোঝে, আর তাকে মার খেতে হবে না।
আসর সেদিন ক্রমশই জমে উঠছিল। ইতিমধ্যে বই-মালিনী এসে হাজির হতে সোনায় সোহাগা। ধনী ঘরের মেয়েদের বই বিক্রি করে বেড়ায় সে। অন্দরে বাইরে অবাধ গতি। সে এলেই ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা যেন নেচে ওঠে, তাদের ঘরবন্দি জীবনে রহস্যময়ী মালিনীর আসা যেন ঠিকরে আসা আলোর মতো। শুধু বই নয়, মেয়েরা মালিনীকে ঘিরে ধরে কারণ তার কাছে রাজ্যের গল্পের ঝাপি। বাবুবিবিদের কেচ্ছা থেকে বামাবোধিনীর নতুন কিস্যা।
তাকে দেখে জ্ঞানদা এগিয়ে এসে হাত ধরেন, এসো এসো, কতদিন পরে আমাদের কথা মনে পড়ল বই-মালিনী। গল্পগাছা করতেও তো আসতে পারো মাঝে মাঝে।
আমার কি আর গল্প করার ফুরসত আছে বউঠান, এ-বাড়ি থেকে সেবাড়ি, বটতলা থেকে বইপাড়া, একাল থেকে ত্রিকাল ছুটে বেড়াই। আগামীদিনে যে বই লেখা হবে তাও আমি শুনিয়ে দিতে পারি, তবে সে গুহ্যকথা, সবাইকে জানানো যায় না। মালিনী কৌতুক করে।
জ্ঞানদা হেসে উঠে বলেন, তুমি বেশ কথা বলো বই-মালিনী, কেমন রহস্যের গন্ধ! যেন আমাদের জগৎ থেকে বহুদূরের কোন জাদুলোকে তোমার বাস। কথা বললে মনে হয় আমিও সেই জাদুর জগতে ঢুকে পড়েছি। তোমার বইয়ের চেয়েও তোমার কথা শোনার লোভে ডেকে পাঠাই।
যাবে নাকি একদিন আমার জাদুলোকে মেজোবউঠান? চাও তো তোমাকে বেড়াতে নিয়ে যেতে পারি। মালিনী হেসে হেসে বলে, তুমি তো যে-সে লোক নও, তোমার কথা এখন শহরের লোকের মুখে মুখে ফিরছে, যেখানে যাই লোকে তোমার কথা শুধোয়। তুমি সেই গবর্নর হাউসের পার্টিতে গিয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছ। অনেকে নাকি তোমাকে দেখে বিশ্বেস করতে পারেনি, ভেবেছিল ভোপালের বেগম। বড়ঘরের এদেশি মেয়েদের মধ্যে তিনি একাই তো এতদিন বাইরে বেরোতেন।
সারদা রাগ করে বলেন, তুই আর ধুনো দিস না মালিনী। সেখেনে একদল গোরা সাহেবমেমের মধ্যে মেজোবউমাকে দেখে লজ্জায় ছ্যা ছ্যা করে আমাদের জ্ঞাতির লোকেরা পালিয়ে এসেছেন সেদিন। প্রসন্ন ঠাকুর কত্তার কাছে কত রাগ করেছেন।
