পৃথিবীর অসভ্য জাতীরা অৰ্দ্ধ-উলঙ্গ অবস্থায় থাকে। ইতিহাসে জানা যায়, পূৰ্ব্বে অসভ্য ব্রিটনেরা অৰ্দ্ধনগ্ন থাকিত। ঐ অৰ্দ্ধনগ্ন অবস্থার পূৰ্ব্বে গায় রঙ মাখিত! ক্রমে সভ্য হইয়া তাঁহারা পোষাক ব্যবহার করিতে শিখিয়াছে।
এখন সভ্যতাভিমানিনী (Civilized) ইউরোপীয়া এবং ব্রাহ্মসমাজের ভগ্নীগণ মুখ ব্যতীত সৰ্ব্বাঙ্গ আবৃত করিয়া হাটে মাঠে বাহির হন। আর অন্যান্য দেশের মুসলমানেরা (ঘরের বাহির হইবার সময়) মহিলাদের মুখের উপর আরও একখণ্ড বস্ত্রাবরণ (বোরকা) দিয়া ঐ অঙ্গাবরণকে সম্পূর্ণ উন্নত (perfect) করিয়াছেন। যাঁহারা বোরকা ব্যবহার করেন না, তাঁহারা অবগুণ্ঠনে মুখ ঢাকেন।
কেহ কেহ বোরকা ভারী বলিয়া আপত্তি করেন। কিন্তু তুলনায় দেখা গিয়াছে ইংরাজ মহিলাদের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড হ্যাট অপেক্ষা আমাদের বোরকা অধিক ভারী নহে।
পর্দা অর্থে ত আমরা বুঝি গোপন করা বা হওয়া, শরীর ঢাকা ইত্যাদি—কেবল অন্তঃপুরের চারি-প্রাচীরের ভিতর থাকা নহে। এবং ভালমতে শরীর আবৃত না করাকেই “বে-পদা” বলি। যাঁহারা ঘরের ভিতর চাকরদের সম্মুখে অৰ্দ্ধ-নগ্ন অবস্থায় থাকেন, তাঁহাদের অপেক্ষা যাঁহারা ভালমতে পোষাক পরিয়া মাঠে বাজারে বাহির হন, তাহাদের পর্দা বেশী রক্ষা পায় |
বৰ্ত্তমান যুগে ইউরোপীয়া ভগ্নীগণ সভ্যতার চরম সীমায় উঠিযাছেন; তাঁহাদের পর্দা নাই কে বলে? তাহদের শয়নকক্ষে, এমনকি বসিবার ঘরেও কেহ বিনা প্রবেশ করেন না। এ প্রথা কি দোষণীয়? অবশ্য নহে। কিন্তু এদেশের যে ভগ্নীরা সভ্যতার অনুকরণ করিতে যাইয়া পর্দা ছাড়িয়াছেন, তাঁহাদের না আছে ইউরোপীয়াদের মত শয়নকক্ষের স্বাতন্ত্র্য (bedroom privacy) না আছে আমাদের মত বোরকা!
কেহ বলিয়াছেন যে “সুন্দর দেহকে বোরকা জাতীয় এক কদৰ্য্য ঘোমটা দিয়া আপাদমস্তক ঢাকিয়া এক কিন্তুত কিমাকার জীব সাজা যে কি হাস্যকর ব্যাপার যাঁহারা দেখিয়াছেন, তাঁহারাই বুঝিতে পারিয়াছেন”—ইত্যাদি। তাহা ঠিক । কিন্তু আমাদের বিশ্বাস যে রেলওয়ে প্লাটফরমে দাঁড়াইয়া কোন সম্ভ্রান্ত মহিলাই ইচ্ছা করেন না যে তাঁহার প্রতি দর্শকবৃন্দ আকৃষ্ট হয়। সুতরাং ঐরূপ কুৎসিত জীব সাজিয়া দর্শকের ঘৃণা উদ্রেক করিলে কোন ক্ষতি নাই। বরং কুলকামিনীগণ মুখমণ্ডলের সৌন্দৰ্য্য দেখাইয়া সাধারণ দর্শকমণ্ডলীকে আকর্ষণ করাই দোষণীয় মনে করিবেন।
ইংরাজী আদব কায়দা (etiquette)ও আমাদিগকে এই শিক্ষা দেয় যে ভদ্রমহিলাগণ আড়ম্বররহিত (simple) পোষাক ব্যবহার করিবেন—বিশেষতঃ পদব্রজে ভ্রমণ কালে চাকচিক্যময় বা জাঁকজমক-বিশিষ্ট কিছু ব্যবহার করা তাহদের উচিত নহে।(১)
নিমন্ত্রণ ইত্যাদি রক্ষা করিতে যাইলে মহিলাগণ সচরাচর উৎকৃষ্ট পরিচ্ছদ ও বহুমূল্য অলঙ্কার ব্যবহার করিয়া থাকেন। গাড়ী হইতে নামিবার সময় ঐ পরিচ্ছদ রূপ আভরণ কোচম্যান্ দ্বারবান প্রভৃতির দৃষ্টি হইতে গোপন করিবার জন্য একটা সাদাসিধা (simple) বোরকার আবশ্যক হয়। রেলওয়ে ভ্রমণ কালে সাধারণের দৃষ্টি (public gaze) হইতে রক্ষা পাইবার জন্য ঘোমটা কিম্বা বোরকার দরকার হয়।
সময় সময় ইউরোপীয়া ভগ্নীগণও বলিয়া থাকেন, “আপনি কেন পর্দা ছাড়েন না (Why don’t you break of purdah) ?” কি জ্বালা ! মানুষে নাকি পর্দা ছাড়িতে পারে? ইহাদের মতে পর্দা অর্থে কেবল অন্তঃপুরে থাকা বুঝায়। নচেৎ তাঁহারা যদি বুঝিতেন যে তাঁহারা নিজেও পর্দার (অর্থাৎ privacyর) হাত এড়াইতে পারেন না, তবে ওরূপ বলিতেন না। যদিও তাহাদের পোষাকেও সম্পূর্ণ পর্দা রক্ষা হয় না, বিশেষতঃ সান্ধ্য-পরিধেয় (evening dress) ত নিতান্তই আপত্তিজনক। তবু তাহা বহু কামিনীর একহারা মিহি সাড়ী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।
তারপর অন্তঃপুর ত্যাগের কথা—অন্তঃপুর ছাড়িলে যে কি উন্নতি হয়, তাহা আমরা ত বুঝি না। প্রকারান্তরে উক্ত স্বাধীন রমণীদেরও ত শয়নকক্ষরপ অন্তঃপুর আছে।
মোটের উপর আমরা দেখিতে পাই সকল সভ্যজাতিদেরই কোন না কোন রূপ অবরোধ প্রথা আছে। এই অবরোধ-প্রথা না থাকিলে মানুষ ও পশুতে প্রভেদ কি থাকে? এমন পবিত্র অবরোধ-প্রথাকে যিনি “জঘন্য” বলেন, তাঁহার কথার ভাব আমরা বুঝিতে অক্ষম।
সভ্যতা (civilization) ই জগতে পর্দা বৃদ্ধি করিতেছে! যেমন পূৰ্ব্বে লোকে চিঠিপত্র কেবল ভাজ করিয়া পাঠাইত, এখন সভ্য (civilized) লোকে চিঠির উপর লেফাফার আবরণ দেন। চাষারা ভাতের থালা ঢাকে না ; অপেক্ষাকৃত সভ্য লোকে খাদ্য সামগ্রীর তিন চারি পাত্র একখানা বড় থালায় (trayতে) রাখিয়া উপরে একটা “খানপোষ” বা “সরপোষ” ঢাকা দেন ; যাঁহারা আরও বেশী সভ্য র্তাহাদের খাদ্য বস্তুর প্রত্যেক পাত্রের স্বতন্ত্র আবরণ থাকে। এইরূপ আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাইতে পারে, যেমন টেবিলের আবরণ, বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড়—ইত্যাদি !
আজিকালি যে সকল ভগ্নী নগ্নপদে বেড়াইয়া থাকেন, তাহাদেরই আত্মীয়া সুশিক্ষিতা (enlightened) ভগ্নীগণ আবার সভ্যতার পরিচায়ক মোজা জুতার ভিতর পদযুগল আবৃত করেন। ক্রমে হাত ঢাকিবার জন্য দস্তানার সৃষ্টি হইয়াছে। তবেই দেখা যায়—সভ্যতার (civilization এর) সহিত অবরোধ—প্রথার বিরোধ নাই।
তবে সকল নিয়মেরই একটা সীমা আছে। এদেশে আমাদের অবরোধ-প্রথাটা বেশী কঠোর হইয়া পডিয়াছে। যেমন অবিবাহিতা বালিকাগণ স্ত্রীলোকের সহিতও পর্দা করিতে বাধ্য থাকেন । কখন কোন প্রতিবেশিনী আসিয়া উপস্থিত হইবে, এই ভয়ে নবম বর্ষীয়া বালিকা প্রাঙ্গণে বাহির হয় না। এই ভাবে সৰ্ব্বদা গৃহকোণে বন্দিনী থাকায় তাহদের স্বাস্থ্য ভঙ্গ হয়। দ্বিতীয়তঃ তাহাদের সুশিক্ষার ব্যাঘাত হয়। যেহেতু খুব ঘনিষ্ঠ সম্পকীয়া আত্মীয়া ব্যতীত তাঁহারা অন্য কাহাকেও দেখিতে পায় না, তবে শিখিবে কাহার নিকট? নববধূদের অন্যায় পর্দাও উল্লেখযোগ্য। তাঁহারা বিবাহের পর প্রথম দুই চারি মাস কেবল “জড় পুত্তলিকা” সাজিয়া থাকিতে বাধ্য হন। ঐরাপ কৃত্রিম অন্ধ ও বোবা হইয়া থাকায় কেমন অসুবিধা ভোগ করিতে হয়, তাহা যে সশরীরে ভোগ করে, সেই জানে!! কথিত আছে, কোন সময় একটি সম্প্রান্ত পরিবারের নববধূর পৃষ্ঠে ঘটনাক্রমে বৃশ্চিক দংশন করে—তিনি সে যন্ত্রণা নীরবে সহ্য করিয়াছিলেন। তৃতীয় দিবস “চৌথী”র স্নানের সময় অন্য স্ত্রীলোকেরা তাঁহার পৃষ্ঠের ক্ষত দেখিয়া দুঃখিত হইয়াছিল! আজি কালি বৃদ্ধাগণ খুব প্রশংসার সহিত ঐ বধুটির উপমা দিয়া থাকেন। বোধ হয় বৃশ্চিকটা খুব বিষাক্ত ছিল না!
