ইতর শ্রেণীর লোকদের মত যেমন-তেমন ভাবে গৃহস্থালী করিলেও সংসার চলে বটে, কিন্তু সেরূপ গৃহিণীকে সুগৃহিণী বলা যায় না; এবং ঐ সব ডোম চামারের পুত্রগণ যে কালে “বিদ্যাসাগর” “বিদ্যাভূষণ” বা “তর্কালঙ্কার” হইবে এরূপ আশাও বোধ হয় কেহ করেন না।
আমি আমার বক্তব্য শেষ করিলাম। এখন সাধনাদ্বারা সিদ্ধিলাভ করা আপনাদের কর্ত্তব্য। যদি সুগৃহিণী হওয়া আপনাদের জীবনের উদ্দেশ্য হয়, তবে স্ত্রীলোকের জন্য সুশিক্ষার আয়োজন করিবেন।
————————————-
১
কেহ আবার প্রতিবাদ করিতে যাইয়া সগর্ব্বে বলিয়াছেন “ভারতে হিন্দুর আরাধ্য দেবতা নারী, তাঁহারা নারীরই উপাসক।” বেশ! বলি হিন্দুর আরাধ্য দেবতা কোন জিনিষটা নহে? পূজনীয় বস্তু বলিতে চেতন, অচেতন, উদি্ভদ ইহার কোন পদার্থটিকে বাদ দেওয়া যায়? হনুমান এবং গোজাতিও কি উপাস্য দেবতা নহে? তাই বলিয়া কি ঐ সকল পশুকে তাঁহাদের “উপাসক মানুষ” অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলা হইয়া থাকে?
২
উর্দ্দু ভাষায় “সলিকা” manner, taste নিপুণতা যোগ্যতা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। সলিকা শব্দের ন্যায় মেয়েলী ভাষায় “কাজের ছিরি” কথা চলিত আছে বটে, কিন্তু তাহাতে সলিকার সমুদয় ভাব প্রকাশ হয় না। তাই সুবিধার নিমিত্ত এ শব্দটাকে বাঙ্গালায় প্রবেশ করাইতে চাই। “আরজী” “তহবিল” “মাহসুল” (মাশুল) ইত্যাদি শব্দ বহুকাল হইতে বাঙ্গালায় প্রচলিত আছে। “সলিকা”ও চলুক। “সাহেবে সলিকা” অর্থে যাহারা সলিকা আছে (person of taste) বুঝায়।
৩
“কালাই” শব্দের বাঙ্গালা কি হইবে? ইংরাজীতে Tinningবলে।
৪
হোসেন-আরার বাল-সুলভ ঔদ্ধত্যের বর্ণনা বেশ আমোদপ্রদ। পাঠিকাদিগকে একটু নমুনা উপহার দিইঃ হোসেন-আরা, পিতা মাতা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ভগিনী-কাহাকেই ভয় করিত না। সমস্ত বাড়ি সে মাথায় তুলিয়া রাখিত! একদিন তাহার বড় মাসী শাহজামানী বেগম তাহাদিগকে দেখিতে আসিয়াছেন। পরিচারিকার দল হয় ত ভাবিল, ছোট বেগমের (হোসেন-আরার মাতার) নিকট অভিযোগ বিশেষ কোন ফল হয় না; বড় বেগম নবাগতা, ইহাকে দেখিয়া হোসেন-আরার চপলতা কিঞ্চিৎ দমিয়া যাইবে। শাহজামানী বেগম শিবিকা হইতে অবতরণ করিবা মাত্র ক্রমান্বয়ে দুই চারি অভিযোগ উপস্থিত হইল।
নরগেস কাঁদিয়া আসিয়া বলিল, “দেখুন, ছোট সাহেবজাদী (হোসেন-আরা) এমন পাথর ছুড়িয়া মারিয়াছেন ভাগ্যক্রমে আমার চক্ষু নষ্ট হয় নাই।”
সোসন আসিয়া বলিল, “দেখুন, ছোট সাহেবজাদী আমায় বলিলেন, ‘দেখি সোসন তোর জিহবা,’ যেই আমি জিহবা বাহির করিলাম অমনি তিনি আমার চিবুকে এমন জোরে মুষ্ট্যাঘাত করিলেন যে আমার সমস্ত দাঁত রসনায় বিদ্ধ হইয়াছিল!”
গোলাপ চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, “হায়! আমার কাণ রক্তাক্ত করিয়া দিলেন!”
রন্ধনশালা হইতে পাচিকা উচ্চৈঃস্বরে বলিল, “এই দেখুন ছোট সাহেবজাদী তরকারির হাঁড়িতে মুঠা ভরিয়া ছাই দিতেছেন!”
ঐ সব শুনিয়া বড় বেগম ডাকিলেন, “হোসনা! এখানে আইস!” হোসনা তৎক্ষণাৎ আসিল ত; কিন্তু আসিয়া, মাসীকে নমস্কার করিবে ত দূরের কথা,-হাতে ছাই পায় কাদা-এই অবস্থায় সে হঠাৎ মাসীর গলা জড়াইয়া ধরিল। তিনি সাদরে বলিলেন, “হোসনা! তুমি বড় দুষ্ট হইয়াছ।”
হোসনা তখন উপস্থিত দাসীকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, “এই সম্বেল পেত্নী বুঝি কোন কথা আপনাকে লাগাইয়াছে?” এই বলিয়াই সে মাসীর ক্রোড় হইতে লাফাইয়া উঠিয়া নির্দ্দোষ সম্বেলের কেশাকর্ষণ করিয়া প্রহার আরম্ভ করিল! “আঁ! ও কি কর! কি কর!” বলিয়া বড় বেগম বারম্বার নিষেধ করিলেন, কিন্তু সে কিছুই শুনিল না।
পরে হোসেন-আর জেনানা মকতবে (পাঠশালায়) প্রেরিত হইয়া সুশিক্ষা প্রাপ্ত হইয়াছিল। এতদ্বারা লেখক মহোদয় দেখাইয়াছেন যে অমন অবাধ্য অনম্য বালিকাও শিক্ষার গুণে ভাল হয়।
আমাদের বিশ্বাস সুশিক্ষা স্পর্শমণি যাহাকে স্পর্শ করে সেই সুবর্ণ হয়।
৫
“মাশুক”- যাহাকে ভালবাসা যায়; beloved object·
০৭. বোরকা
আমি অনেক বার শুনিয়াছি যে আমাদের “জঘন্য অবরোধ প্রথা”ই নাকি আমাদের উন্নতির অন্তরায়। উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত ভগ্নীদের সহিত দেখা সাক্ষাৎ হইলে তাঁহারা প্রায়ই আমাকে “বোরকা” ছাড়িতে বলেন। বলি, উন্নতি জিনিষটা কি ? তাহা কি কেবল বোরকার বাহিবেই থাকে? যদি তাই হয় তবে কি বুঝিব যে জেলেনী, চামারনী, ডুমুনী প্রভৃতি স্ত্রীলোকেরা আমাদের অপেক্ষা অধিক উন্নতি লাভ করিয়াছে ?
আমাদের ত বিশ্বাস যে অবরোধের সহিত উন্নতির বেশী বিরোধ নাই। উন্নতিব জন্য অবশ্য উচ্চশিক্ষা চাই। কেহ কেহ বলেন যে ঐ উচ্চশিক্ষা লাভ করিতে হইলে এফ,এ, বি,এ, পরীক্ষার জন্য পর্দা ছাড়িয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (University Hall এ) উপস্থিত হইতে হইবে। এ যুক্তি মন্দ নহে! কেন ? আমাদের জন্য স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় (University) হওয়া এবং পরীক্ষক স্ত্রীলোক হওয়া কি অসম্ভব ? যতদিন এইরূপ বন্দোবস্ত না হয়, ততদিন আমাদের পাশকরা বিদ্যা না হইলেও চলিবে।
অবরোধ-প্রথা স্বাভাবিক নহে——নৈতিক। কেননা পশুদের মধ্যে এ নিয়ম নাই। মনুষ্য ক্রমে সভ্য হইয়া অনেক অস্বাভাবিক কাজ করিতে শিখিয়াছে। যথা— পদব্রজে ভ্রমণ করা স্বাভাবিক, কিন্তু মানুষে সুবিধার জন্য গাড়ী, পান্ধী প্রভৃতি নানাপ্রকার যানবাহন প্রস্তুত করিয়াছে। সাতার দিয়া জলাশয় পার হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু মানুষে নানাবিধ জলযান প্রস্তুত করিয়াছে। —তাঁহার সাহায্যে সাতার না জানিলেও অনায়াসে সমুদ্র পার হওয়া যায়। ঐরাপ মানুষের “অস্বাভাবিক” সভ্যতার ফলেই অন্তঃপুরের সৃষ্টি।
