জনার্দম বললে–যদি আমার কথা শোনো দাসমশাই তো তোমায় ভাল হবে, তা বলে দিচ্ছি
উদ্ধব দাসকে যেন তবু উত্তেজিত করা গেল না। উদ্ধব দাসের যেন বিকার নেই, বিরাগ নেই, বললে–আমি নালিশ করলে কি আমার বউকে আমি ফিরিয়ে পাব প্রভু? তাকে নিয়ে কি আমি। ঘরসংসার করতে পারব?
কেন পারবে মা দাসমশাই? তোমার ভো অগ্নিসাক্ষী রেখে বিয়ে করা ইস্ত্রী!
উদ্ধব দাস বলে বউ যদি আমার ঘরই করবে তো সে পালিয়ে গেল কেন? ধরে-বেঁধে কি পিরিত হয় প্রভু?
আলবত হয়। যদি ঘরসংসার না করে তো চুলের মুঠি ধরে তাকে বশে রাখবে। মেয়েমানুষের আবার অত তেজ কেন গো?
উদ্ধব দাস বললে–তাকে অত গাল দিয়ো না গো।
বলেই গান গেয়ে উঠল
শ্যামা তো সামান্য নয় গো।
মহাকাল কুন্তল-জাল।
শঙ্কর পদতলে, মগনা রিপুদলে,
তনুরুচি তরুণ তমাল।
উদ্ধব দাস হয়তো আরও অনেকক্ষণ গান গাইত, কিন্তু জনার্দন থামিয়ে দিলে। বললে–থামো তুমি, পাগলের মতো গান গেয়ো না। যদি কিছু টাকা কামাতে চাও তো ডিহিদারের কাছে খবরটা দিয়ে এসো যে, তোমার বউকে ছোটমশাই নাম ভাড়িয়ে চেহেলসূতুনে পাঠিয়ে দিয়েছে।
এবার সরখেল মশাই এসে হাজির, বললে–কী গো উদ্ধব বাবাজি, কেষ্টনগরে যাবে আমার সঙ্গে আমি আজ যাচ্ছি
উদ্ধব দাস সবতাতেই রাজি। বললে–~চলুন, আমার কাছে হাতিয়াগড়ও যা, কেষ্টনগরও তাই
জনার্দনের আর কথা বলা হল না। আস্তে আস্তে বেরোল অতিথিশালা থেকে। তারপর পায়ে পায়ে একেবারে চলতে লাগল উত্তর দিকে। সেখান থেকে দক্ষিণে। তারপর পুবে, তারপর পশ্চিমে।
দুর্গা এতক্ষশ সব ছিল। জনার্দন বেরোতেই সেও বেরোল, পেছন পেছন চলতে লাগল। প্রথমে উত্তর দিকে, সেখান থেকে দক্ষিণে। তারপর পুবে। তারপর পশ্চিমে। তারপর যেই ডিহিদারের দফতরখানা এসেছে অমনি টুপ করে সেখানে ঢুকে পড়ল জনার্দন। দুর্গা দূর থেকে দাঁড়িয়ে সব নজর করে দেখলে। হারামজাদা মিনসে। ভূতের কাছে মামদোবাজি ফলাতে এসেছে।
.
বড় বউরানি ছোটমশাইয়ের ঘরে ঢুকতেই হোমশাই মুখ তুললেন একবার।
কার চিঠি?
ছোটমশাই বিছানায় শুয়ে শুয়েই চিঠিটা পড়ছিলেন। বারবার পড়েও যেন মানে বুঝতে পারছিলেন না। আবার পড়তে লাগলেন মনে মনে।
শ্রীল শ্রীযুক্ত হিরণ্যনারায়ণ রায়,
বরাবরেষু— অত্র পত্রে সবিশেষ সংবাদ আপনার বাহক মারফত বিজ্ঞাপন করিতেছি। লোকপরম্পরায় জ্ঞাত হইলাম আপনার আপন প্রাণাধিকা পত্নীকে লোকলজ্জা অগ্রাহ্য করতঃ চেহেল্-সুতুনে পাঠাইয়া হিন্দুধর্মীয়দের মস্তক অবনত করাইয়া দিয়াছেন। জগৎশেঠজি, মিরজাফর আলি সাহেব প্রমুখাৎ যেসংবাদ সংগ্রহ করিয়াছি তাহা সবিশেষ বেদনাদায়ক। নবাব সম্প্রতি ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়লাভ করতঃ উদ্ধত আচরণ করিয়া ধরাকে সরা জ্ঞান করিতেছেন। এমত সময়ে আপনার ন্যায় বিচক্ষণ ব্যক্তির এমন করিয়া স্বমর্যাদার মূলে কুঠারাঘাতকরণ অতীব ঘৃণাহ। ইহাপেক্ষা আপনার প্রাণাধিকা পত্নীকে হত্যা করা অনেকগুণে শ্ৰেয় ছিল। আপনি প্রাণভয়ে ভীত পীড়িত হইয়া নিজ-পত্নীর ধর্মনাশে সহায়তা করিয়া সমগ্র হিন্দুরপতিকুলে কলঙ্ক লেপন করিয়াছেন। অধিক কী লিখিব। আমাদিগের সমস্ত প্রচেষ্টা এমনভাবে নষ্ট করিয়া আপনি সকলের ক্ষতিসাধন করিয়াছেন। ইহার প্রতিকার সত্বর আবশ্যক। আশু কর্তব্য সম্বন্ধে স্থিরমস্তিষ্কে বিবেচনা করিবার মানসে আমি যথাবিহিত ব্যবস্থা করিতেছি। আপনার সাক্ষাৎ প্রয়োজন জানিবেন। কবে আসিতে পারিবেন পত্রবাহকের হস্তে পত্র দ্বারা জ্ঞাত করিবেন। ইতি—ভবদীয়
বড় বউরানি আবার জিজ্ঞেস করলেন–কার চিঠি?
ছোটমশাই বললেন–মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের।
কী লিখেছেন?
লিখেছেন আপনি আপনার স্ত্রীকে কেন পাঠালেন চেহেল্-সুতুনে? তাকে খুন করতে পারলেন না? আমাকে যেতে লিখেছেন–
বড় বউরানি বললেন–তুমি যাবে নাকি?
তাই তো ভাবছি। অতিথিশালায় লোক অপেক্ষা করছে
বড় বউরানি বললেন–তুমি যেন আবার বলে দিয়ো না সব। জিজ্ঞেস করলে বোলো কোনও উপায় না পেয়ে বউকে পাঠিয়ে দিয়েছিলে। বোলো ভয় পেয়েই এমন কাজ করে ফেলেছ, বুঝলে? নইলে সব মাটি হয়ে যাবে
*
নজর মহম্মদ কান্তকে পৌঁছিয়ে দিয়েই আড়ালে সরে পড়েছিল। কিন্তু মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কান্ত বা মরালী কারও মুখেই কোনও কথা ছিল না। ওদিকে নহবতখানায় তখনও ইমনকল্যাণের রাগিনী মীড়ে-মূর্ঘনায় সমস্ত আবহাওয়াটা উদ্দাম করে তুলেছে।
মরালী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অধৈর্য হয়ে উঠেছিল। বললে–আপনি কেন এলেন এখানে? কী করে এলেন? কোন সাহসে এলেন?
ওই নজর মহম্মদকে একটা মোহর দিতে হল।
মোহর? মোহর কোথায় পেলেন? কে দিলে?
কান্ত তখনও হাঁফাচ্ছে। কোনওরকমে বললে–সারাফত আলি দিলে। তার অনেক টাকা। তার গন্ধতেলের দোকান আছে চকবাজারে, তার বাড়ির একটা ঘরে আমাকে থাকতে দিয়েছে, আমার কাছে। ভাড়া নেয় না।
সারাফত আলির নামটা শুনেই মরালীর মনে পড়ল গুলসনের কথা। লোকটা আরক বেচে বেগমদের জন্যে।
সে কেন আপনার হয়ে মোহর দিলে?
তা জানি না। বোধহয় তার রাগ আছে হাজি আহম্মদের বংশের ওপর। সে চায় এই চেহেল্-সুতুন ভেঙে গুঁড়িয়ে পিষে গোরস্থান করে দিতে!
কিন্তু আপনাকে সে এখানে পাঠালে কেন? নজর মহম্মদকে দিয়েই তো সেকাজ হত!
না, তা হলে তাই-ই করত সারাফত আলি। আমি সারাফত আলিকে বলেছিলুম আপনার সঙ্গে দেখা করবার ব্যবস্থা করে দেবার জন্যে। আমার খুব দেখা করবার ইচ্ছে হয়েছিল আপনার সঙ্গে।
