কেন?
আমি এ’কদিন ঘুমোতে পারিনি রাত্তিরে। কেবল মনে হয়েছে আমি পাপ করেছি। আমি সে-পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। কটা টাকার জন্য আমি আপনার সর্বনাশ করেছি। আপনার ধর্ম নষ্ট করেছি। আপনি কাটোয়ার সেই সরাইখানাতেই পালিয়ে যেৰ্তে চেয়েছিলেন আমার সঙ্গে। শেষপর্যন্ত ডিহিদারের লোক এসে পড়াতে তা আর হয়ে ওঠেনি। এখন যদি বলেন তো আমি তার ব্যবস্থা করতে পারি। আপনি এখান থেকে পালিয়ে চলুন–
মরালী চমকে উঠল–এ আপনি বলছেন কী? এখান থেকে কেউ পালাতে পারে?
পারে, পারে! সারাফত আলির অনেক টাকা আছে, সে সব ব্যবস্থা করে দিতে পারে। আপনি শুধু বলুন যে আপনি রাজি, তা হলে আমি সব বন্দোবস্ত করব। আপনার কিছু ভাবনা নেই।
মরালী বললে–আপনার কি প্রাণের ভয়ও নেই? জানেন না যে এখানে এসে কেউ দেখে ফেললে। সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে কোতল করে ফেলবে!
তা করুক, আপনাকে উদ্ধার করার পর আমার যা হয় হোক, তার জন্যে আমি ভাবিনে–
মরালী খানিকক্ষণ কী যেন ভাবলে। তারপর বললে–আমি বলছি আপনি এখান থেকে চলে যান। এখানে আর কখনও আসবেন না এমন করে। এখানকার সব খবর আপনি জানেন না। আমি একদিনে সব শুনেছি, এরা মানুষ নয়, পশু। এদের মায়া-দয়া কিছু নেই–
সেই জন্যেই তো আপনাকে আমি নিয়ে যেতে এসেছি! নবাব ফিরে আসছে, এসেই আপনার ধর্ম নষ্ট করবে। তার আগেই আপনাকে আমি এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাই
মরালী কী যেন ভাবলে। বললেন, আমি যাব না—
কেন? যাবেন না কেন? এখনও তো উপায় আছে?
না, তবু যাব না, তাতে হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইয়ের ক্ষতি হবে! আমি পালিয়ে গেলে তাদের ওপর অত্যাচার হবে।
এর পর আর কান্তর কী বলবার থাকতে পারে! তবু কান্ত খানিকক্ষণ ভাবতে লাগল সেইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
মরালী বললে–আর দাঁড়িয়ে থাকবেন না আপনি, আমাকেও বিপদে ফেলবেন আপনিও বিপদে পড়বেন, আপনি যান
কান্ত চলেই আসছিল। এত কষ্ট করে এত চেষ্টা করে এখানে এসেছে অথচ এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে ইচ্ছে করছিল না। বললে–একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করব?
কী?
আমাকে সেই বশির মিঞা বলছিল আপনি নাকি হাতিয়াগড়ের রানিবিবি নন, অন্য কেউ!
অন্য কেউ? হাতিয়াগড়ের রানিবিবি নই তো কে আমি?
কান্ত বললে–আমার অবিশ্যি বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু অবিশ্বাস করতেও ইচ্ছে হচ্ছে না। বশির মিঞার কথাই যদি সত্যি হয় তা হলে আমার কিন্তু আর আফশোসের শেষ থাকবে না–
কেন বলুন তো? বশির মিঞা কী বলেছে?
কান্ত বললে–কে নাকি বশির মিঞাকে বলেছে আপনি আসলে হাতিয়াগড়ের শোভারাম বিশ্বাস মশাইয়ের মেয়ে মরালী, যার সঙ্গে আমারই বিয়ে হবার কথা ছিল। আমি তো তাকে দেখিনি, তাই আমি কিছু বলতে পারলুম না–
কিন্তু এ আজগুবি খবরটা কে দিলে তাকে?
কান্ত বললে–হাতিয়াগড়ের ডিহিদার এখানে খবর পাঠিয়েছে–আমিও তাকে বলেছি এটা একেবারে আজগুবি খবর
তারপর একটু থেমে বললে–আচ্ছা, তা হলে আমি চলি-যদি কখনও আপনার কিছু দরকার হয় ওই নজর মহম্মদকে বলবেন, তা হলেই আমি আসব আপনার যদি কখনও এখান থেকে চলে যাবারও ইচ্ছে হয়, তাও জানাবেন
অন্ধকারের আড়ালে কোথায় নজর মহম্মদ পঁড়িয়ে ছিল। কান্ত চলে যাবার জন্যে পা বাড়াতেই সে সঙ্গ নিলে।
শুনুন!
মরালী পেছন থেকে অস্ফুট স্বরে আবার ডাকলে। শুনুন।
কান্ত ফিরতেই মরালী জিজ্ঞেস করলে আর একটা কথা জানবার ছিল, আপনি কি হাতিয়াগড়ে আর গিয়েছিলেন?
না, কেন?
যদি যান তো একটা কাজ করতে পারবেন? যে-মেয়েটা বিয়ের রাত্তিরে পালিয়েছিল তার বাবা শোভারাম বিশ্বাস ছিল আমাদের নফর। তিনি কেমন আছেন একবার দেখে এনে আমায় জানানে?
নহবতখানায় ইনসাফ মিঞা ইমন থামিয়ে এবার বেহাগে আলাপ শুরু করল। কোথায় দূর থেকে আবার নাচের ঘুঙুর বেজে উঠল। আর হঠাৎ কে যেন বড় করুণ একটা আর্তনাদ করে কান্নায় ফেটে পড়ল। সমস্ত চেহেল্-সুকুন যেন একটা নতু রোমাঞ্চে রিনরিন করে উঠল।
একবার খবরটা জানাবেন আমায়?
কান্ত অবাক হয়ে গেল অনুরোধটা শুনে। আরও কাছে সরে এল। বললে–তা হলে আমি যা শুনেছি তাই-ই সত্যি? আপনিই কি মরালী?
মরালী ভয়ে দু’পা পিছিয়ে এল। তারপর শিউরে উঠে পেছন দিকে সরে গেল। বললে–না না, আমি মরালী নই, আমি লস্করপুরের তালুকদার কাশিম আলির মেয়ে মরিয়ম বেগম
বলতে বলতে দৌড়ে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকে পড়ল।
নজর মহম্মদের কথায় কান্তর চমক ভাঙল। বললেচলিয়ে জনাব–চলিয়ে
*
ঝাঁঝাঁ করছে রোদ। বর্ষা আসার আগে এই সময়টাই বাংলাদেশে টেকা দায় হয়ে ওঠে। সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানের পেছনে তখন আগুনের মতো গরম। না আছে একটু হাওয়া, না আছে একটু ঠান্ডা। তবু রাস্তায় চলতে চলতে পুঁটলি থেকে গামছাটা বার করে ঘাড়-মুখ-মাথা মুছে নিয়েছে। বোশেখ মাসে জায়গায় জায়গায় জলসত্র থাকে। জমিদারবাবুদের কাছারিঘরের লাগোয়া একটা চালাঘরে বড় মাটির জালা মাটিতে পোঁতা থাকে। রাস্তার লোক জল-তেষ্টা পেলে এসে জল খেতে চাইলেই কাছারির লোক জল দেয়, বাতাসা দেয়। এক মুঠো বাতাসা চিবিয়ে এক ঘটি জল খেয়ে সেখানেই বাঁশের মাচার ওপর বসে জিরিয়ে নেয়। তারপর রোদটা একটু পড়লে আবার হাঁটা দিতে শুরু করে।
এমনিতে একা একা হাঁটা উচিত নয়। রাস্তায় যেতে যেতে এক-একটা দল গড়ে ওঠে। দলের সঙ্গে চললে বিপদ কম। নইলে কোথায় কখন কী ঘটে বলা যায় না। ঠ্যাঙাড়ে আছে, ঠগিরা আছে। বেশ ভাবসাব করে তোমার সঙ্গে মিলেমিশে চলতে লাগল। একসঙ্গে চিড়ে-মুড়ি খেয়ে তোমাকে আপন করে নিলে। তারপর কখন তোমায় খুন করে তোমার টাকাকড়ি নিয়ে পালিয়ে যাবে তার ঠিক নেই। এ হামেশাই চলছে। তাই অন্ধকার হবার পর রাস্তায় আর কেউ বেরোয় না। দিনমানে-দিনমানে কোথাও অতিথিশালায় উঠে পড়লে আর ভয় নেই। কিংবা কোনও দোকানে।
