হঠাৎ বাইরে গোকুল এসে দাঁড়াল।
বড় বউরানি এসে জিজ্ঞেস করলেন-কী রে?
কেষ্টনগর থেকে মহারাজার লোক এসেছে চিঠি নিয়ে, ছোটমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে চায়, আমার হাতে চিঠি দেবে না
আচ্ছা, ডেকে নিয়ে আয় ভেতরে।
বলে বড় বউরানি বাইরে চলে গেলেন।
বুড়ো মতন মানুষটা। এসেই মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে উবু হয়ে প্রণাম করলে অনেকক্ষণ ধরে। তারপর নিচু গলায় বললে–আমি মহারাজার চিঠি নিয়ে এসেছি হুজুরের নামে। এ-চিঠি আপনার হাতে ছাড়া আর কারও হাতে দেবার হুকুম নেই হুজুর
ছোটমশাই চিঠিটা নিলেন। বললেন–এর উত্তর চাই?
আজ্ঞে, সে হুকুম নেই আমার ওপর।
আপনি তা হলে অতিথিশালায় গিয়ে বিশ্রাম করুন। তারপর আমার খাজাঞ্চিবাবুকে বলবেন, সে আপনার তদারক করবে। যদি এর উত্তর দেবার দরকার থাকে আমি ডেকে পাঠাব
লোকটা আবার মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে চলে গেল। গোকুল তাকে সোজা অতিথিশালায় নিয়ে গেল।
ওদিকে অতিথিশালায় বহুদিন পরে আবার উদ্ধব দাস এসেছে। সাড়া পড়ে গেছে। আবার বেশ দু’হাতে তাল দিয়ে দিয়ে গান ধরেছে
আর ভুলালে ভুলব না গো!
আমি অভয়পদ সার করেছি
ভয়ে হেলব দুলব না গো।
আশাবায়ুগ্রস্ত হয়ে
মনের কথা খুলব না গো।
সুখ-দুঃখ সমান ভেবে
মনের আগুন তুলব না গো।
মায়াপাশে বদ্ধ হয়ে
প্রেমের গাছে ঝুলব না গো।
এবার আমি দুধ খেয়েছি,
ঘোলে মিশে ঘুলব না গো।
বাহবা, বাহবা! বেড়ে গান গাও তো ভাই তুমি? তুমি কে বট?
উদ্ধব দাস গান থামিয়ে হাতজোড় করে বললে–অধীন উদ্ধব দাস প্রভু, অধীন ভক্ত হরিদাস–তা আপনি কে?
আমি জনার্দন। শোভারামকে চেনো তো? তুমি যার মেয়েকে বিয়ে করেছিলে, তার বদলা চাকরি করি এখেনে। শোভারাম তো পাগল হয়ে গেছে, শুনেছ?
উদ্ধব হাসল। বললে–আমিও তো পাগল প্রভু, খলু সংসারে কে পাগল নয়? আমি পাগল, শোভারাম বিশ্বাস পাগল, সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ পাগল, কান্তবাবু পাগল, নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা পাগল, জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র পাগল–কেউ বিষয়-পাগল, কেউ মেয়েমানুষ-পাগল, কেউ ভগবান-পাগল। কেউ আবার নামের-পাগল, পাগলে পাগলে খলুসংসার যে ছেয়ে গেছে প্রভু! বদনাম শুধু আমার আর শোভারামের।
বলে উদ্ধব দাস যেন একটা মস্ত রসিকতা করেছে এমনি করে হেসে উঠল।
জনার্দন কিন্তু হাসল না। এতদিনে বোধহয় কার্যসিদ্ধি হবে বলে মনে হল। খুব ভাব জমিয়ে উদ্ধব দাসের আরও কাছে সরে বসল। আশেপাশে চারদিকে চেয়ে দেখলে কাছাকাছি কেউ কোথাও নেই। অতিথিশালায় আর যারা আছে তারা সবাই পুকুরে চান করতে গেছে, কেউ কেউ পুঁটলি মাথায় দিয়ে এক কোণে চিতপাত হয়ে শুয়ে।
উদ্ধব দাসের দিকে মুখ নিচু করে বললে–একটা কথা তোমায় জিজ্ঞেস করব দাসমশাই
উদ্ধব দাস বললে–একটা কথা কেন প্রভু, হাজারটা করুন না, অধীনের কাছে কিছু লুকোছাপা নেই। আমার বউ পালিয়ে গেছে কিনা এই কথাটাই তো আমাকে জিজ্ঞেস করবেন প্রভু? প্রভুরা বাই। আমাকে ওই নিয়ে ঠাট্টা করেন। আমি বলি বউ পালিয়েছে, বেশ করেছে। আমার বউ পালাবে না তো কার বউ পালাবে? নবাবের বউ পালাবে?
জনার্দন আবার চারদিকে চেয়ে নিলে, বললে–অত জোরে কথা বোলো না দাসমশাই, সবাই শুনে ফেলবে।
তা শুনে ফেললেই বা প্রভু, আমার তো কিছু গোপন নাই!
জনার্দন বললে–না দাশমশাই, তোমাকে একটা গোপন খবর দিই। তোমার বউকে ছোটমশাই মুর্শিদাবাদে নবাবের হারেমে পাঠিয়ে দিয়েছে, সেখানে মরিয়ম বেগম হয়ে গেছে তোমার বউ; সে খবর রাখো?
অতিথিশালার ভেতর দিকের দরজার আড়ালে আড়ি পেতে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল দুর্গা। আর একটু হলেই হারামজাদা বলে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল দুর্গা জনার্দনের ওপর। কিন্তু নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে নিলে। আর সঙ্গে সঙ্গে বুড়োমতন মানুষটাকে নিয়ে সেখানে কল গোকুল।
গোকুলও অবাক হয়ে গেছে উদ্ধব দাসকে দেখে। জিজ্ঞেস করলে–কী গো, অনেকদিন পরে যে? তোমার শ্বশুর মেয়ের শোকে পাগল হয়ে গেছে, শুনেছ তো? তা তুমি তো বেশ দিব্যি বহাল তবিয়তে আছ? তোমার তো দেখছি বিকার নেই?
উদ্ধব দাস কিন্তু সে কথায় কান দিলে না। বুড়ো মানুষটার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলে কী গো সরখেলমশাই, আপনি মুহুরি মানুষ, কেষ্টনগরের সেরেস্তা ছেড়ে এখেনে কেন?
সরখেল মশাইও বোধহয় অবাক হয়ে গিয়েছিল। বললে–আমি তো সরকারি কাজে এসেছি মহারাজের চিঠি নিয়ে, তা তুমি এখেনেও আসো?
উদ্ধব দাস বললে–আমার গতি বায়ুর মতো সর্বত্র প্রভু
তা কেষ্টনগরে আবার কবে যাচ্ছ? মুগের ডাল খেতে যাবে না?
মহারাজ কেমন আছেন প্রভু?
জনার্দনের এসব কথা ভাল লাগছিল না। আসল কথাটা না বলে দিলে যেন তৃপ্তি হচ্ছিল না তার। উদ্ধব দাসকে আড়ালে ডেকে এনে বললে–তা তোমার বউকে ছোটমশাই যে নিজের বউ বলে চালিয়ে দিয়ে নবাবের কাছে পাঠিয়ে দিলে, তুমি কিছু বলবে না?
উদ্ধব দাস বললে–আমি কী বলব প্রভু?
কেন, তুমি নিজামত-কাছারিতে গিয়ে ছোটমশাইয়ের নামে নালিশ করতে পারো না?
আমি প্রভু নালিশ করব?
নিশ্চয়ই করবে! তুমি নালিশ করলেই দেখবে ছোটমশাইকে কোতোয়াল নাকে দড়ি দিয়ে নিজামত কাছারিতে ধরে নিয়ে যাবে। নিজের বউকে না পাঠিয়ে তোমার বউকে পাঠালে, তাতে তুমি কিছু বলবে না?
সরখেলমশাই দূর থেকে ডাকলে-কী গো দাসমশাই, এসো, দুটো গান শুনি তোমার
