বড় বউরানি রোজই আশা দেন–ভেবো না কিছু, তুমি নিশ্চয়ই ভাল হয়ে যাবে
ছোটমশাই বলেন কিন্তু তুমিই তো ভাল হতে দিলে না আমাকে! কেন তুমি আমার এ সর্বনাশ করলে বলো তো? আমি তোমার কী করেছিলুম?
এসব কথায় বড় বউরানি চুপ করে থাকেন। তারপর অনেকবার একই কথা বলে বলে যখন কোনও সুরাহা হয় না তখন ছোটমশাই চুপ করে যান। শুধু চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে টপটপ করে। বড় বউরানি নিজের আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দেন চোখ দুটো!
বলেন–দেখো, আমার ওপর রাগ কোরো না তুমি! আমি যা করেছি তোমার ভালর জন্যেই করেছি, এ বংশের ভালর জন্যেই করেছি। এ-বংশের বউ হয়ে মুসলমানের হারেমে গিয়ে থাকলে তাতে তোমার আমার ছোটর কারওই সম্মান বাড়ত না। তার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভাল হয়েছে
ছোটমশাইয়ের গলাটায় যেন ব্যথা করে আসে। বলেন–তা তুমি মেরে ফেলবে তাই বলে? আর কোনও উপায় ছিল না?
তা তোমার চেয়ে আমি কি তাকে কম ভালবাসতুম মনে করো? আমার বুঝি মেরে ফেলতে কষ্ট হয়নি? আমি বুঝি তাকে নিজে পছন্দ করে এ বাড়ির বউ করে নিয়ে আসিনি? আমি বুঝি তোমাদের দু’জনের মুখ দেখে সুখ পাইনি? আমি বুঝি চাইনি যে এবংশের একটা ছেলে হোক। বড়মশাইয়ের বংশে বাতি দিতে কেউ থাকুক?
অনেকক্ষণ ছোটমশাইয়ের উত্তর দেবার আর কিছু থাকে না।
বলেন–মরবার সময় সে কিছু বলেনি? কিছু বলে যায়নি তোমাকে?
বড় বউরানি বলেন–তুমি আগে আমার কথার উত্তর দাও যে সম্মান বড় না প্রাণটা বড়?
ছোটমশাই বলেন–তুমি যদি জানতে পারতে আমার বুকের মধ্যে কী তোলপাড়টা চলেছে
তা সম্মান কি তার চেয়েও বড় নয়? আর এ তো শুধু তোমার একলার সম্মান নয়, সমস্ত হাতিয়াগড়ের সম্মানের প্রশ্ন যেখানে, সেখানে তুমি নিজের কষ্টটার কথাই ভাবলে?
কিন্তু ডিহিদারকে তুমি এখন কী বলে জবাবদিহি করবে? মেহেদি নেসার সাহেবকে কী বলে ঠেকাবে? তারা যদি আবার পরওয়ানা পাঠায়, তখন?
সে ব্যবস্থা আমি করেছি।
ছোটমশাই উত্তেজিত হয়ে ওঠেন বিছানায় শুয়ে শুয়েই।
বলেন–সেকী? কী ব্যবস্থা করলে?
সে সব তোমায় ভাবতে হবে না। যে ব্যবস্থা করলে সব কুল রক্ষে হয়, সেই ব্যবস্থাই করেছি।
বলো না, কী ব্যবস্থা করলে? আমার যে জানতে বড় ইচ্ছে হচ্ছে। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র আমাকে বারবার বারণ করে দিয়েছিলেন এমন সর্বাশ আপনি করবেন না। জগৎশেঠজি, মিরজাফরসাহেব সবাই আমাকে বারণ করেছিল। আমি কিছুতেই কিছু উপায় খুঁজে পাচ্ছিলুম না।
বড় বউরানি বলেন আমিও কি ভাবিনি মনে করেছ! ভেবে ভেবে আমার রাতে ঘুম হত না জানো। সেই যেদিন থেকে ডিহিদারের লোক এল পরোয়ানা নিয়ে, আমি একদিনও রাত্তিরে ঘুমোইনি। কেবল ভেবেছি এর কী প্রতিকার! কেবল মন্দিরে গিয়ে ঠাকুরকে ডেকেছি, বলেছি, আমাকে একটা উপায় বলে দাও ঠাকুর! আমার স্বামী, আমার শ্বশুরের বংশ, আমার হাতিয়াগড়ের প্রজাদের সম্মান কেমন করে রক্ষে করব বলে দাও!
তারপর একটু থেমে বলেন–তুমি ভাবতে আমি বুঝি কেবল ঠাকুরপুজো নিয়ে মেতে আছি। কিন্তু আমার যে কী যন্ত্রণা হত তা যদি তুমি বুঝতে! ছোটর সামনে গিয়ে মুখোমুখি চাইতে পারতুম না। বুক। ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইত–তবু সংসারের রোজকার কাজ হাসিমুখে করে যেতুম! তখন তুমিও জানতে না আমার বুকের মধ্যে কী আগুন জ্বলছে! তোমাকে তো তখন ডিহিদারের সে-চিঠি আমি দেখাইনি। আমি জানতুম তুমি সে চিঠি পড়ে ভেঙে পড়বে ।
এর পরে আর ছোটমশাইয়ের কিছু কথা বলবারও থাকে না। সত্যিই তো, বড় বউরানি যা করেছে, তা ছাড়া আর কী উপায়ই বা ছিল। সেই কত পুরুষ আগে থেকে এমনি একটার পর একটা বড়ঝাপটা চলে আসছে। বড়মশাইয়ের কাছে ছোটবেলায় সব শুনেছেন ছোটমশাই। বখতিয়ার খিলজির আমল থেকেই মোগল-পাঠানের লড়াই শুরু হল। এই হাতিয়াগড়ই কি সামান্য ছিল তখন? এই হাতিয়াগড়েরই নিজের সৈন্য ছিল সামন্ত ছিল। টোডরমল যখন এলেন আকবর বাদশার সনদ নিয়ে, তিনি পর্যন্ত হাতিয়াগড়কে দলে টানতে পারেননি। তারপরে এল ওমরাহ আজিম খা–আর ওদিক থেকে পাঠান সর্দার কতলু খাঁ দলবল নিয়ে হাজির হয়ে তছনছ করে দিলে সমস্ত বাংলাদেশ। তখনও। হাতিয়াগড় মাথা খাড়া করে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর এলেন মানসিংহ। তিনিই পাঠানদের প্রথম মূলোচ্ছেদ করে দিলেন চিরকালের মতো। তারপর এল পর্তুগিজরা। তারা এখানকার নীচজাতের মেয়েদের সঙ্গে থেকে নিজেদের বংশবৃদ্ধি করতে লাগল হুউঁহুড় করে। পর্তুগিজে ছেয়ে গেল দেশ। তাদের অত্যাচারে আর কেউ টিকতে পারে না। বিশেষ করে সমুদ্রের কাছাকাছি গ্রামগুলোতে। যাকে পারে ধরে নিয়ে যায়, ধরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয় বাইরের সব দেশে। তারপর বাদশা হলেন শাহানশা শাহজাহান। সব দেশটা মোগলের হাতে চলে গেল। চট্টগ্রামের নাম হল ইসলামাবাদ। কিন্তু বাদশার শেষ বয়েসে আবার আরম্ভ হল লড়াই-মারামারি। সুজা, মিরজুমলা, সবাই এক-একজন ডাকাত। কেবল বাংলাদেশে এসেছে আর চাকরি করেছে, লুঠপাট করেছে। তারপর এলেন বাদশা আওরংজেব। হাতিয়াগড়ের অবস্থা সেই সময় থেকেই খারাপ হতে শুরু হয়েছে। সেই আওরংজেবের শিষ্য শায়েস্তা খাঁ এসেও শান্তি দেয়নি কাউকে। হাতিয়াগড়ের গৌরব গেছে, প্রতিষ্ঠা গেছে, মান-সম্ভ্রম সব গেছে। এখন নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার আমলে এসে হিরণ্যনারায়ণ রায়কে আজ চরম অপমানের ডালা মাথা পেতে নিতে হল! আজ বড়মশাই থাকলে কী করতেন কে জানে। দিনকাল বদলে গেছে। হয়তো বড়মশাইকেও এই অপমান মাথা পেতেই নিতে হত। এ-অপমানের জ্বালা যেন হাজার চেষ্টা করলেও দূর হবে না। তাই শুধু শুয়ে থাকেন আর ভাবেন। ভেবে ভেবেই কূল কিনারা হারিয়ে ফেলেন।
