জনার্দন ততক্ষণে দৌড়োত দৌড়োতে একবারে রেজা আলির বাড়ির সামনে গিয়ে হাজির হয়েছে। রেজা আলির সঙ্গে জনার্দনের রোজকার দেখাশোনা চলে। রোজই এসে খবর দিয়ে যায় আড়ালে। শুধু হাতিয়াগড়ের রাজবাড়িরই খবর নয়, এ ডিহির সব খবরই রাখতে হয় রেজা আলিকে। কে কোথায় কখন যাচ্ছে, কার কী রকম অবস্থা ফিরছে কে দালান-কোঠা বানাচ্ছে, কার রিস্তাদার বাড়িতে এল কী উদ্দেশ্য নিয়ে, এসব খবর না রাখলে ডিহিদারের কাজ চালানো যায় না। নিজামত সরকারকে ওয়াকিবহাল করতে হয় দেশের অবস্থা কেমন। কোথায় কোন লোক ষড়যন্ত্র করছে সরকারের বিরুদ্ধে তারও হদিশ রাখতে হয় তাকে।
কী দেখলি জনার্দন?
জনার্দন বললে–হুজুর, কেল্লা ফতে হয়ে গেছে
তার মানে?
মানে ওরাই লুকিয়ে রেখেছে রানিবিবিকে, হাতেনাতে ধরা পড়ে গিয়েছে কাল রাত্তিরে। একতলার একটা কুঠুরিতে তাকে লুকিয়ে রেখেছে ওই কুটনি মাগিটা। ও বেটিকে আমি জব্দ করব তবে ছাড়ব হুজুর! ও হারামজাদি আমার পেছনে লেগেছে কাল থেকে।
সঙ্গে কাউকে নিবি?
জনার্দন বললে–না হুজুর, মেয়েমানুষের সঙ্গে লড়তে হলে একলাই যথেষ্ট, দু’জন হলে লজ্জার। কথা। আপনার শুধু একটু মদত চাই হুজুর।
কী মদত?
সে তো আপনাকে আমি বাতলেছি আজ্ঞে, শুধু নজর রাখবেন গরিবের ওপর। বড় গরিব আমি হুজুর, তিনটে মেয়ের বিয়ে দিলুম, তিনটেই রাড় হয়েছে, একফোঁটা জমিজিরেত নেই যে চাষবাস করে খাই। দশ সন আগে হলে এমন করে বলতুম না আজ্ঞে, কিন্তু কী যে বিষনজরে পড়ে গেলাম পাট্টাদারের, সব কেড়ে নিলে!
কেন, পাট্টাদারের বিষ-নজরে পড়লি কেন?
জনার্দন বললে–হুজুরের দেখছি কিছু মনে থাকে না, হুজুরকে তো সব খুলে বলেছিলুম। সোমত্ত মেয়েদের তো তা বলে ঘরে আটকে রাখতে পারিনে, পুকুরঘাটে যায়, বাগানে ছোলা-মটর খেতে যায়, কোন ফাঁকে দেখে ফেলেছে। তা আমি বাপ হয়ে কি তাতে রাজি হতে পারি হুজুর? তাই গা ছেড়ে পালিয়ে এলুম একদিন। তারপর আমার শ্বশুরবাড়িতে তাদের রেখে এখেনে এলুম কাজের চেষ্টায়, তখন হুজুর দয়া করে এই কাজটা দিলেন।
রেজা আলি গড়গড়া টানতে টানতে বললে–তা কী মদত চাস তুই বল না!
হুজুর, খুনোখুনি যদি বাধে তো তখন যেন আমার চাকরিটা না চলে যায়
খুননাখুনি বাধবে কেন?
হুজুর, মাধব ঢালিকে দিয়ে দুগ্যা আমাকে কোতল করবে বলে শাসিয়েছে যে!
রেজা আলি বললে–ঠিক আছে, যা ভাল বুঝিস তাই কর, চারদিক বুঝেসুঝে করবি, তারপর যদি ফৌজদার হই তো তোর আর ভাবনা নেই, তুই যা এখন
জনার্দন আর দাঁড়াল না সেখানে। কুর্নিশ করে ঘুরপথে আবার গিয়ে রাজবাড়ির দেউড়ি দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। বিশু নাপিত ছোটমশাইকে খেউরি করবার জন্যে তখনও বসে ছিল। জনার্দনকে দেখেই জিজ্ঞেস করলে কী রে জনার্দন, এত দেরি হল যে তোর?
জনার্দনের মুখটা শুকিয়ে গেল। কেন? ছোটমশাই খুঁজছিলেন নাকি আমাকে?
ছোটমশাই খুঁজুন আর না-খুঁজুন, কিংবা দরকার থাক আর না-থাক, যার যার কাজ সকলের সমস্ত করে যাওয়াই এ-বাড়ির নিয়ম। জনার্দন বললে–অনেকদিন মেয়ে তিনটের খবর পাইনি কিনা তাই একবার খবর নিতে গিয়েছিলুম বামুনপাড়ার দিকে। জগদীশ বাঁড়ুজ্যের বেয়াই থাকে কিনা জনাইতে। তা ছোটমশাই আজ নীচেয় নামবেন নাকি?
হঠাৎ অতিথিশালার দিক থেকে কার গান ভেসে এল।
বিশু পরামানিক বললে–ওই এসেছে রে–
কে গো? কে এসেছে?
তখন গানটা বেশ স্পষ্ট ভেসে আসছে–
আর ভুলালে ভুলব না গো।
আমি, অভয়পদ সার করেছি।
ভয়ে হেলব দুলব না গো ॥
আশাবায়ুগ্রস্ত হয়ে
মনের কথা খুলব না গো।
মায়াপাশে বদ্ধ হয়ে
প্রেমের গাছে ঝুলব না গো ॥
এখন আমি দুধ খেয়েছি।
ঘোলে মিশে ঘুলব না গো ॥…
জনার্দন আবার জিজ্ঞেস করলে ও কে গো? কে গান গাইছে?
ওই তো পাগলা উদ্ধব দাস।
উদ্ধব দাস কে?
উদ্ধব দাসের নাম শুনিসনি? শোভারামের মেয়েকে যে বিয়ে করেছিল রে? অনেকদিন পরে আবার আমাদের অতিথশালায় এয়েছে–আবার জ্বালাবে
জনার্দন আর দাঁড়াল না। বললে–দাঁড়াও, অতিথশালায় গিয়ে গানটা শুনে আসি।
বলে উঠে ভেতরের দিকে গেল।
.
বড় বউরানি ঘরে গিয়ে দেখলেন ছোটমশাই বিছানায় তেমনি করে শুয়ে আছেন। পাশে গিয়ে পঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন–ডাকছিলে নাকি আমাকে?
ছোটমশাই আরও দুর্বল হয়ে গেছেন তখন। জিজ্ঞেস করলেন–তোমার পুজো করা শেষ হয়েছে?
কেন? তোমার কিছু দরকার?
ছোটমশাই বললেন না, তা নয়, বেশিক্ষণ একলা থাকতে ভাল লাগে না তাই
বড় বউরানি আরও কাছে ঘেঁষে দাঁড়ালেন। বললেন–তোমার ভালর জন্যেই তো পুজো করি! পুজো কি আমি আমার নিজের জন্যে করি ভেবেছ?
ছোটমশাই কিছু কথা বললেন না। তারপর একটু পরে বললেন–এত পুজো করে কী এমন ভাল হল আমার?
বড় বউরানি বললেন–নিশ্চয় ভাল হবে, দেখো! তুমি অত ভাবো কেন?
ছোটমশাই বললেন–তা ভাবব না! তুমি বলছ কী? সারা দিনরাতই তো ভাবি! সমস্ত পুরনো কথাগুলো যে মনে পড়ে যায়!
একটু চেষ্টা করো, নিশ্চয়ই ভুলতে পারবে।
ছোটমশাই চোখ বুজলেন। এমনি ক’দিন ধরেই চলছে। সেই কৃষ্ণনগর থেকে আসার পর সেই যে বিছানা নিয়েছেন আর ওঠেননি। হাতিয়াগড়ের সমস্ত প্রজারা কেবল রোজ খবর নিচ্ছে ছোটমশাই কেমন আছে! ছোটমশাই যদি এতদিন ধরে বিছানায় পড়ে থাকে তো জমিদারি চলে কেমন করে। প্রজা-পাঠকদেরই কষ্ট। কত আর্জি, কত আবেদন-নিবেদন পেশ করতে হয় ছোটমশাইয়ের কাছে। জগা খাজাঞ্চিবাবুর কাছে গেলে তো খেঁকিয়ে ওঠে। বলে–যা যা, খাজনা দিবিনে তার আবার মায়া-দয়া কী রে? সবাই আশা করে আছে কবে ছোটমশাই আবার উঠে হেঁটে কানুনগো কাছারিতে এসে বসবে। কবে তার পা দুটো ধরে খাজনা মকুব করিয়ে নেবে!
