আর কোনও কথা নয়। রাজা মানিকচাঁদ সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। নবাব বললেন–হলওয়েলকে গ্রেফতার করে মুর্শিদাবাদ পাঠিয়ে দাও আর কৃষ্ণবল্লভ, উমিচাঁদ ওরাও আমার সঙ্গে যাবে…
ষষ্ঠীপদর আর দেরি সহ্য হল না। সিন্দুকের ডালাটা খুলে ফেললে একটা শাবল দিয়ে। ভেতরের আগুন তখন নিভেছে। কিন্তু কালো কালো জমাট ধোঁয়া শুধু গুমিয়ে গুমিয়ে নিঃশব্দে কুণ্ডলী পাকিয়ে ওপরে ওঠবার চেষ্টা করছে। ষষ্ঠীপদ নাকে কাপড় দিয়ে নিচু হয়ে দেখলে একবার। জগমন্ত সিং তখন বেগুনপোড়া হয়ে পড়ে আছে ভেতরে। মা পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গে, তা হলে আমাকে সত্যি-সত্যিই রাজা করে দিলে মা–সত্যিই রাজা হলুম
*
চেহেল্-সুতুনের ভুলভুলাইয়ার মধ্যে যদি কোনও রহস্য থাকে তো সে রহস্য ইতিহাসের। ইতিহাসের অমোঘ নির্দেশেই সেখানে নারীসুরা আর রোমাঞ্চের আমদানি হয়েছে। তার জন্যে যদি কাউকে দায়ী করতে হয় তো সে মোগলবাদশা সুলতান আকবর নয়, সুলতান শাহজাহান নয়, সুলতান জাহাঙ্গির নয়, সুলতান আরঙ্গজেবও নয়। এমনকী মুর্শিদকুলি খাঁ, সরফরাজ খাঁ, আলিবর্দি খাঁ-ও নয়। নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলাও নয়। চকবাজারের সারাফত আলি যতই বলুক, হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই যতই কষ্ট পাক, শোভারাম বিশ্বাস যতই পাগল হোক, ইতিহাসের পথ নির্মম নিষ্ঠুর গতিতে এগিয়ে চলবে। তার গতি কেউ থামাতে পারবে না।
১৭৩০ সালে যে-ছেলেটির জন্ম হয়েছিল, সে দেখে এসেছে এমনি করেই বাংলার নবাবিয়ানা চালাতে হয়, এমনি করেই মারাঠাদের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। আলিবর্দি খাঁর বড় পেয়ারের নাতি সে। সে জানে লড়াই কাকে বলে, সে জানে মেয়েমানুষকে কেন সৃষ্টি করেছে খোদাতালা, সে জানে নবাব হলে তার দুশমনি করবার লোকের অভাব হয় না। এই ফিরিঙ্গি, এই মিরজাফর, এই জগৎশেঠ, এই মেহেদি নেসার, এদের সকলকে নিয়েই তার চলতে হবে। ক্ষমতা যতদিন থাকবে ততদিন তার বন্ধুও থাকবে, দুশমনও থাকবে। এদের বাদ দিয়ে যে ক্ষমতা চায় সে উজবুক, সে আনাড়ি!
তাই চেহেল্-সুতুনের ভেতরের চেহারাটাও কোনওদিন বদলায়নি। বদলাতও না। কিন্তু কেন যে বদলাল সেই কাহিনীই বলতে বসেছি।
অন্ধকারে তখনও মরালী আর একবার গলা ছেড়ে ডাকবার চেষ্টা করলে নজর মহম্মদ, নজর মহম্মদ
হয় সে স্বপ্ন দেখছে, নয়তো সে বোবা হয়ে গেছে। তখনও নহবতটা বাজছে। নবাব ফিরে আসছে। হয়তো কাল, কিংবা পরশু, কিংবা হয়তো তার পরদিন, তারপর? তার আগে যদি নজর মহম্মদ সত্যিই তাকে নিয়ে আসে।
সামনেই যেন কার পায়ের শব্দ হল। অস্পষ্ট ঝাপসা আলোয় ভাল দেখা যায় না। তবু নজর মহম্মদ ভুল করেনি চিনতে। নজর মহম্মদরা সাধারণত ইচ্ছে করে কখনও ভুল করে না।
বেগমসাহেবা!
মরালী যেন নিজের চোখ দুটোকেও বিশ্বাস করতে পারলে না। পেছনেই কান্ত।
মরালী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে তুমি?
কান্তর তখন বোধহয় বাকরোধ হয়ে গেছে। তার মুখে তখন সব কথা যেন ফুরিয়ে গিয়েছে। খানিকটা ভয়ে, খানিক আনন্দে, খানিকটা রোমাঞ্চে, আর খানিকটা হয়তো বা বিস্ময়ে।
*
দুর্গা সহজে ছাড়বার পাত্রী নয়। এই যে হাতিয়াগড়ের রাজবাড়ি, এর বাইরে তো খাজাঞ্চিবাবু আছে, সরকারবাবু আছে, প্রজা-পাঠক, পাইক, বরকন্দাজ সবই আছে। অতিথিশালার রান্নাবাড়ি, চাকর-ঝি-ঠিকে লোক, বুড়োশিবের মন্দিরের পুরুত, জোগানদার, কিছুই বাদ নেই। কিন্তু রাজবাড়ির মধ্যে দুর্গার মাথার ওপরে কেউ নেই। সে-ই সর্বেসর্বা। দুর্গার কথার ওপর কথা বলার ক্ষমতা কারওই নেই।
পরদিন সকালবেলাই সোজা বড় বউরানির ঘরে গিয়ে হাজির।
রানিমা!
ভেতরে আয়
খাজাঞ্চিবাবু শোভারামের বদলা যাকে রেখেছে সে সুবিধের লোক নয়। জনার্দন না কী তার নাম, লোকটা সেদিন রাত্তিরে একেবারে ভেতরবাড়ির মহলের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল।
তা মাধব ঢালিকে বললিনে কেন? কেটে ফেলে নদীতে ভাসিয়ে দিত!
দুর্গা বললে–আমি অত সাহস করিনি রানিমা, এমনিতে সময়টা খারাপ চলছে, তখন বাঁ-নাক দিয়ে নিশ্বেস পড়ছিল, আমি তাই সামলে গেলুম। হইচই করলে আবার যদি ডিহিদার মিনসের কানে যায়! তই ধমক দিয়ে সাবধান করে দিয়েছি, বলেছি, আর যদি মিনসেকে এ-দিগরে দেখি তো ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব
তা মতলব কী তার? কেন ভেতরবাড়িতে এসেছিল?
দুর্গা বললে–আমার তো রানিমা সন্দেহ হয় ও ঠিক ডিহিদার মিনসের লোক, খবর নিতে পাঠিয়েছে ছোট বউরানিকে ঠিক মুর্শিদাবাদে পাঠিয়েছি কিনা!
তা শোভারামের মেয়েটা তো ভালয় ভালয় সেখানে পৌঁছে গেছে। তার পরেও আবার এ মিনসের এত সন্দেহবাই কেন?
দুর্গা বললে–কে জানে রানিমা কার কী মতলব। আমি তো দিনরাত আগলে আগলে রাখছি, কিংবা হয়তো সে মুখপুড়ি চাপে পড়ে সব বলে দিয়েছে। সেসব হালচাল তো সেখানকার আলাদা। যে-তেজি মেয়ে, ভেবেছে এখন তো যা হবার হয়ে গেছে, এখন আর বললে–ক্ষেতিটা কী!
বড় বউরানি বললেন–তা হলে চোখে চোখে রাখ লোকটাকে, দেখ দু-চার দিন কী করে, তারপর আমাকে বলিস, আমি মাধব ঢালিকে বলে দেব না হয়
দুর্গা বললে–তার দরকার নেই, তার চেয়ে বরং তুমি জগা খাজাঞ্চিবাবুকে ডেকে ওকে ছাড়িয়ে দিতে বলো
হঠাৎ গোকুল এসে সামনে দাঁড়াল।
বড় বউরানি গোকুলকে দেখেই বললেন–ছোটমশাই বুঝি ডাকছেন আমাকে? চল, যাচ্ছি
তারপর যাবার সময় দুর্গার দিকে চেয়ে বললেন–তুই যা ভাল বুঝিস কর, চারদিক বুঝেসুঝে করবি বাছা, আর কী বলব–
