কিন্তু বাড়ির সামনে গিয়ে হতবাক। উমিচাঁদ সাহেবের দরোয়ান জগমন্ত সিং সেখানে সবকিছু জড়ো করেছে। উমিচাঁদের বাড়ির জিনিসপত্রগুলো এনে এনে ফেলছে সেখানে।
একী, দরোয়ান সাহেব, তুমি? তুমি একলা এসব কী করছ? কেয়া করতা হ্যায়?
জগমন্ত সিং এসব দু’দিন আগে নিজেই পুড়িয়ে গিয়েছিল। শুধু এই-ই পোড়ায়নি। মালিকের বাড়ির জেনানাদেরও পুড়িয়েছে। আজ আর আগুনে পুড়ে মরবার কেউ নেই। ফিরিঙ্গি সাহেবরা এতদিন কেল্লার মধ্যে জগমন্ত সিংকে আটক করে রেখেছিল। কৃষ্ণবল্লভ, উমিচাঁদ, জগমন্ত সিং সবাই নজরবন্দি হয়ে ছিল কেল্লায়। কিন্তু যখন সবাই পালিয়ে যাবার তোড়জোড় করছিল, জগমন্ত সিংও মালিককে এসে বলেছিল–হুজুর, আপ ভি পালিয়ে চলুন–এই-ই সুযোগ ফিরিঙ্গিলোগ ভাগ যা রাহা হ্যায়
সে রাত্রে সত্যিই কেউ কিছু ঠিক করতে পারেনি কী হবে শেষপর্যন্ত, সে অবস্থায় কী করা উচিত। রাজা রাজবল্লভের ছেলে কৃষ্ণবল্লভ মুখ ভার করে বসে ছিল। নবাবের হাতে তার নিস্তার নেই তা সে জানতই। কিন্তু পাঞ্জাবি মানুষ উমিচাঁদ অত সহজে ভেঙে পড়বার লোক নয়। অনেক ঝড়ঝাপটা তার মাথার ওপর দিয়ে গেছে। উমিচাঁদ সাহেব সুদূর পাঞ্জাব থেকে বাংলাদেশের নরম মাটিতে এসে রসের সন্ধান পেয়ে এইটুকু বুঝে নিয়েছে যে, এ-দেশে নরম হয়ে থাকলে সুনাম হয়তো হয়, কিন্তু বড়লোক হওয়া যায় না। বুঝে নিয়েছে যে টাকার মালিক হতে গেলে সম্মান অপমান জ্ঞান থাকলে চলে না। আর যারা টাকা কামাই করতে চায় তাদের পক্ষে এই-ই উপযুক্ত সময়–যখন দেশের রাজা বদলায়। দেশের রাজা বদলাবার সময়েই যা কিছু উন্নতি করতে হয় করে নাও। এর পর যখন শান্তির সময় আসবে তখন আর ভাগ্য-উন্নতি করবার সুযোগ পাওয়া যাবে না।
উমিচাঁদ সাহেব এক ধমক দিয়ে উঠেছিল–যা, তু ভাগ যা ইহাসে–
এরপর জগমন্ত সিং আর সময় নষ্ট করেনি। কেল্লায় তখন আর পল্টনদের পাহারাও নেই। সোজা পাঁচিল টপকে একেবারে মালিকের বাড়ির সামনে এসে হাজির। আগেই সবকিছু পুড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখনও অনেক কিছু বাকি ছিল পুড়তে। জগমন্ত সিং জানত কোথায় থাকে সাহেবের সিন্দুক, কোথা কোন ঘরের কোন মেঝের তলায় সোনা-রুপো পোঁতা আছে। জগমন্ত সিং সেখানে ঢুকতে যাচ্ছিল হঠাৎ বেভারিজ সাহেবের মুনশিকে দেখে অবাক হয়ে গেল। মুনশিজি, তুমি?
ষষ্ঠীপদ বললে–আমার নোকরি গেছে দরোয়ানজি, আমি এখন কী করব?
বলতে বলতে ষষ্ঠীপদ সেই আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়েই হাউহাউ করে কেঁদে ফেললে।
কাঁদছিস কেন বেল্লিক?
ষষ্ঠীপদ কাঁদতে কাঁদতে বললে–চাকরি গেলে আমি খাব কী দরোয়ানজি?
জগমন্ত সিং ষষ্ঠীপদর দিকে চেয়ে ভেংচি কেটে উঠল। তুই এখন খাবার কথা ভাবছিস, উল্লকা-পাট্টা? দুনিয়া বরবাদ হয়ে যাচ্ছে, জমানা ভি বদল হয়ে যাচ্ছে, এখন কেউ তোর মন খাওয়া নিয়ে ভাবছে? মরতে পারবি?
ষষ্ঠীপদ চমকে উঠল। একবার জগমন্ত সিংয়ের মুখের দিকে চেয়ে দেখলে। আগুনের হলকা লেগে মুখখানা তার যেন বীভৎস হয়ে উঠেছে তখন।
হ্যাঁ, মরতে পারব দরোয়ানজি! খুব মরতে পারব। আর মরেই তো আছি আমি—
তব ইধর আ
বলে সেই বাড়ির মধ্যে ঢুকল। উমিচাঁদ সাহেবের এত সাধের সাজানো বাড়ি। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষের দ্বনাশ করা টাকার জমানো সোনা রুপো-হিরে ভরা বাড়ির মালখানার ভেতরে ঢুকল দু’জনে। তারপর জগমন্ত সিং মালখানার দরজাটা নিজের ব্ল্যাকের চাবি দিয়ে খুলে ফেললে। কী রকম একটা ক্যাচ ক্যাচ শব্দ হল। জগমন্ত এক হঁচকা টানে সিন্দুকের ডালাটাও খুলে ফেললে। খুলে ফেলতেই ষষ্ঠীপদর চোখ দুটোয় ধাঁধা লেগে গেল। এত সোনা, এত রুপো, এত মোহর, এত টাকা! মা মা, পতিতোদ্ধারিণী, তুমি কি আমার মনের কথা শুনেছ তা হলে মা?
আগ জ্বালাও, আগ জ্বালাও
বলে কী জগমন্ত সিংটা। ষষ্ঠীপদ হাঁ করে চেয়ে রইল দরোয়ানজির দিকে! জগমন্ত সিং সত্যি সত্যিই আগুন জ্বালিয়ে দিলে সিন্দুকের চারিদিকে। আগুনটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।
জগমন্ত সিং বলে–এই আগুনের ভেতর লাফিয়ে পড়–আগে তুই ঝাঁপ দে, তারপর হাম ষষ্ঠীপদ কী করবে বুঝতে পারলে না। এমন হবে তা তো ভাবেনি সে। সোনা-রুপো-মোহর-টাকার সঙ্গে একাকার হয়ে যাবার কথা তো সে কল্পনা করেনি। তুমি বাপু প্রভুভক্ত চাকর হতে পারে কিন্তু আমি তো পারব না একাজ। আমার তো এই সব টাকা চাই। আমি যে বড়লোক হব গো! তোমার মালিক উমিচাঁদ সাহেবের চেয়েও বড়লোক।
নে, লাফিয়ে পড় ভেতরে
ষষ্ঠীপদ আর দেরি করলে না। দু’হাতে জগমন্ত সিংকে ধাক্কা দিয়ে সিন্দুকের ভেতরে ফেলে দিয়েই ভারী ডালাটা বন্ধ করে দিয়েছে এক মুহূর্তে। থাক, পুড়ে মরুক ওর ভেতরে। তারপর আগুনটা নিভে গেলেই আবার বার করে নিলে চলবে। তখন সমস্ত সোনা-রুপো-মোহর-টাকার মালিক সে। সেই ষষ্ঠীপদ। ষষ্ঠীপদ আবার মাকে ডাকলে।…
নবাব সিরাজ-উ-দৌল্লাও তখন কেল্লার মালখানার ভেতরে খোলা সিন্দুকটার সামনে দাঁড়িয়ে। রাজা মানিকচাঁদ, মেহেদি নেসার, কৃষ্ণবল্লভ, উমিচাঁদ, সফিউল্লা, ইয়ারজান সবাই পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
আর টাকা? আর টাকা নেই?
হলওয়েল সাহেব হাত বাঁধা অবস্থায় তখন থরথর করে কাঁপছিল। বললে–আর টাকা নেই জাঁহাপনা, এই-ই সব
স্রেফ পঞ্চাশ হাজার টাকা? এতদিনের কারবার তোমাদের, এত আমদানি-রপ্তানি, স্রেফ পঞ্চাশ হাজার টাকা তোমাদের মালখানায়?
