নজর মহম্মদ চলে যাবার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ নহবতখানা থেকে অসময়ে নবৃত বেজে উঠল।
মরালী অবাক হয়ে গেল। এসময়ে তো কোনওদিন নবত বাজে না। জিজ্ঞেস করলে–নবত বাজছে কেন এই অসময়ে?
খবর এসেছে, জাঁহাপনা কলকাতার লড়াই ফতে করে দিয়েছে। কলকাতার নাম বদলে আলিনগর–রাখা হয়েছে। কলকাতায় আগ লাগিয়ে দিয়েছে জাঁহাপনা। ফিরিঙ্গি লোগ ভি কলকাতার কেল্লা ছেড়ে ভেগে পালিয়েছে।
মরালী জিজ্ঞেস করলে–তাই বুঝি খুব খুশি হয়েছে মুর্শিদাবাদের লোক?
জি বেগমসাহেবা! মেহেদি নেসার সাহেব হুকুম ভেজিয়েছে আলিনগর থেকে মুর্শিদাবাদের লোককে খবরটা ওয়াকিবহাল করতে।
ও!
নজর মহম্মদ তবু নড়ল না। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল তবু
মুরালী জিজ্ঞেস করলে–সঁহাপনা কি এইবার মুর্শিদাবাদে ফিরে আসছেন?
জি বেগমসাহেবা! ঔর তিন-রোজের ভেতরেই ফিরে আসছেন–
এবার মরালীর বুকটা যেন কেমন কেঁপে উঠল। এতদিন বেশ ছিল মরালী। কিন্তু এবার? এবার যদি নবাবের সামনে যেতে হুকুম করে? এবার যদি পরীক্ষা দিতে হয় তাকে।
বেগমসাহেবা, একটা কথা ছিল।
মরালী মুখ তুলে তাকাল।
একঠো জওয়ান ছোকরা বেগমসাহেবার সঙ্গে মুলাকাত করতে চায়—
কে সে? আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়? কেন?
বান্দা তা কিছু জানে না বেগমসাহেব! তার বড় জরুরি কাম আছে বেগমসাহেবার সঙ্গে।
আমার সঙ্গে কাজ আছে? আমার সঙ্গে তার কী কাজ থাকতে পারে? কে সে?
বান্দা তা জানে না বেগমসাহেবা। জওয়ান নাছোড়বান্দা। বেগমসাহেবার সঙ্গে তার জান-পছান আছে। বেগমসাহেবাকে হাতিয়াগড় থেকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল এখানে।
মরালী নিজেকে সামলে নিলে। মুখে বললে–কে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল আমি জানি । কারও সঙ্গে আমার চেনা-জানা নেই। আমি কারও সঙ্গে দেখা করব না এখন। তুমি তাকে বলে দিয়ো। বলে দিয়ে এখানে পুরুষমানুষদের আসা-যাওয়ার নিয়ম নেই।
জি, বেগমসাহেবা। আমি তা হলে তাকে তাই-ই বলে দেব।
হ্যাঁ, তাই বলে দিয়ো
নজর মহম্মদ তবু পঁড়িয়ে রইল। ফিরতে গিয়েও তার ফেরা হল না। তারপর সোজা ফিরে দাঁড়িয়ে বললে–বেগমসাহেবা, আপনি যদি তার সঙ্গে মুলাকাত করতে চান তো কেউ জানতে পারবে না। কৌয়া-চিড়িয়া ভি টের পাবে না। আমি খুদ এখানে দাঁড়িয়ে পাহারা দেব, কোনও গুণাহ হবে না
মরালী কী বলবে বুঝতে পারলে না। নজর মহম্মদ কি তাকে পরীক্ষা করছে। শেষকালে যদি কোনও বিপদ হয়। গুলসনকে জিজ্ঞেস করলে ভাল হত। সে কিছু পরামর্শ দিতে পারত। মরালীর সমস্ত শরীরটা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। এমন যে হবে তা তো ভাবতে পারেনি সে। সে যদি ধরা পড়ে। যদি কোতল হয়ে যায়। মরালীর জন্যে কান্তর যদি কোনও ক্ষতি হয়।
মনের কথাও যেন নজর মহম্মদ বুঝতে পারলে। বললে–কোনও ডর নেহি বেগমসাহেবা, বান্দা তো জিম্মাদার রইল
বলেই চলে যাচ্ছিল। যাবার সময় বললে–বান্দা এখুনি তাকে এত্তেলা দিচ্ছে
এখুনি? এত রাত্তিরে?
কিন্তু নজর মহম্মদ ততক্ষণে ঘরের বাইরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। এখুনি হয়তো কান্তকে ডেকে নিয়ে আসবে। এলে কী বলবে মরালী! কী বলে কথা আরম্ভ করবে।
লুকিয়ে লুকিয়ে আবার গুলসন এসে হাজির।
কী বলছিল ভাই নজর তোমাকে? আরক খেতে বলছিল বুঝি? খবরদার খবরদার, আরক খেয়ো না যেন ভাই তুমি! ও একেবারে সর্বনেশে বিষ। একবার ধরেছ কি আর তোমার ছাড়ান-ছোড়ন নেই। কিছুতেই খেয়ো না তুমি। যে খেয়েছে, সে-ই পস্তাচ্ছে। যদি জোর করে খাওয়াতে আসে তো নানিবেগমকে বলে দেবে, বুঝলে? নানিবেগম ওসব পছন্দ করে না মোটে!
মরালী বললে–না, আরক নয়…।
আরক নয় তো কী? পান? পানও খেয়ো না তুমি ওদের হাত থেকে। পানের খিলি নিজে সেজে খাবে, নইলে পানের খিলির ভেতরেও ওইসব বিষ পুরে দেয় পোষ মানাবার জন্যে।
না, পানও নয়। আমি বুঝতে পারছি না ভাল করলাম কি মন্দ করলুম।
কেন? কী হয়েছে কী?
নজর মহম্মদ বলছিল কে-একজন নাকি দেখা করতে চায় আমার সঙ্গে। তাকে এখানে নিয়ে আসবে। আমি প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম। বলেছিলুম-না, আনতে হবে না। কিন্তু আমার কথা শুনলে না, তাকে ডেকে আনতে গেল
সর্বনাশ করেছ। লোকটা কে? কী জন্যে দেখা করবে?
তা জানি না।
তা হলে এক্ষুনি গিয়ে মানা করে এসো ভাই। তোমাকে বিপদে ফেলবে। ওরা ওইরকম করে প্রথম প্রথম পরখ করে নেয়। ওরা দেখে কী রকম চরিত্তিরের মেয়ে তুমি। তুমি যদি একবার বলে দাও হ্যাঁ, তখন পেয়ে বসবে, তখন তোমাকে যা-তা করবে। তুমি এক্ষুনি গিয়ে মানা করে এসো
মরালী বললে–কিন্তু ও যে চলে গেল–
তুমি দৌড়ে যাও না! এখনও সময় আছে। যাও যাও–ওসব ওদের ছল, ওই করে ওরা পোষ মানায়, একবার ওদের হাতের কবজার মধ্যে পড়ে গেলে তখন তুমি একেবারে মরবে যাও
মরালী কী করবে বুঝতে পারলে না। তারপর বেরোল ঘর থেকে। যে-দিকে নজর মহম্মদ গেছে সেই দিক লক্ষ করেই বেরোল। তারপর অন্ধকার পেরিয়ে একবার চিৎকার করে ডাকতে চেষ্টা করলে–নজর মহম্মদ-নজর মহম্মদ
কিন্তু মরালীর গলা দিয়ে এতটুকু শব্দ বেরোল না। তার মনে হল কে যেন তার গলা টিপে ধরেছে। সেই অন্ধকার চেহেল্-সুতুনের ভুলভুলাইয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে সে যেন দিশেহারা হয়ে গেল।
২.০৪ কলকাতার অন্ধকার কেল্লা
কলকাতার অন্ধকার কেল্লার ভেতরে দাঁড়িয়েও নবাব সিরাজ-উ-দৌল্লাও যেন দিশেহারা হয়ে গেছেন। পেছনে রাজা মানিকচাঁদ, মিরজাফর, তারাও দাঁড়িয়ে। হাতে হাতকড়া বাঁধা হলওয়েল সঙ্গে। হলওয়েল সাহেব পালাতে পারেনি শেষপর্যন্ত। ফিরিঙ্গি মেমসাহেবরা ভয়ে গিয়ে লুকিয়ে ছিল একটা গুদামঘরের মধ্যে। ওদিকে লুঠপাট চলেছে, কেউ পেয়েছে ঘড়ি, কেউ বোতাম, কেউ বগলশ। কিছুই বাদ দেয়নি সেপাইরা। চাপা কান্নার শব্দে সমস্ত কেল্লাটা যেন গুমগুম করছে। এতদিন যে-আক্রোশ বাংলার ইতিহাসের দরজায় মাথা কুটছিল দিন-রাত, তা যেন আজ চৌচির হয়ে ফেটে পড়ে আকাশ বাতাসে ছড়িয়ে গেল। ফিরিঙ্গিদের সাধের কলকাতা তখন পুড়ছে। বির্জিতলা, দর্জিপাড়া, গোবিন্দপুর, বাদামতলা থেকে শুরু করে ক্যাপ্টেন পেরিন সাহেবের বাগানের পাশের বারুদখানাটাও বাদ যায়নি। সেই আগুনের মধ্যে ষষ্ঠীপদ এধার থেকে ওধার দৌড়োচ্ছে। উমিচাঁদ সাহেবের বাড়িতেই বেশি টাকা থাকা সম্ভব। সেদিকটাতেই দৌড়ে গেল ষষ্ঠীপদ।
