এই যে তোমার সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে গল্প করতে আসি-না, নজর মহম্মদ যদি জানতে পারে তো আমাকে আর আস্ত রাখবে না ভাই, তাই রাত্তিরবেলা লুকিয়ে-ছুপিয়ে আসি!
কেন? আমি কী দোষ করেছি? আমাকে মিশতে দেয় না কেন তোমাদের সঙ্গে?
গুলসন বলে–ও প্রথম প্রথম আমাদেরও ওইরকম কারও সঙ্গে মিশতে দিত না, পোষ মানাবার চেষ্টা করত। তা এখেনে পোষ না-মেনে তো উপায়ও নেই ভাই। পোষ না-মেনে করবই বা কী! আর তো করবারও কিছু নেই আমাদের সারাজীবন যখন এখেনেই কাটাতে হবে তখন সবকিছু মেনে নেওয়াই ভাল
সারাজীবন কাটাতে হবে? সারাজীবন আর কোথাও বেরোতে পারব না?
গুলসন বলে-না, সেই জন্যেই তো এখেনে এলে সব্বাই নেশা করে
তুমিও নেশা করো?
হ্যাঁ, নেশা না করলে যে ভাই থাকা যায় না। দম আটকে আসে। আমরা যে বেঁচে আছি এটা যে ভুলতে পারিনে। সেটা ভোলবার জন্যেই তো নেশা করি। তুমিও ভাই দেখো, ঠিক নেশা ধরবে, তুমিও একদিন নেশা না করে থাকতে পারবে না আমাদের মতো
কী নেশা করো?
গুলসন বললে–নেশা কি আর একরকমের ভাই। হাজার রকমের নেশা আছে। আফিম, চরস, কত কী! একরকম সাপের বিষ আছে…
সাপের বিষ?
সে-সাপের বিষ খেলে মরবে না, কিন্তু অসাড় হয়ে পড়ে থাকবে দু’দিন। সেটা খেলে খুব আরাম, আমি একবার খেয়েছিলুম–
মরালী জিজ্ঞেস করলে–এসব নেশার জিনিস কোত্থেকে আসে?
এসব খোজারা এনে দেয়। নানিবেগম জানতেও পারে না। জানলে অনাচ্ছিষ্টি করবে। পিরালি খাঁ, নজর মহম্মদ, বরকত আলি ওরা লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের সব জোগায়
ওরা কোত্থেকে পায়?
সে ভারী মজার ব্যাপার। চেহেল্-সুতুনের বাইরে চকবাজার বলে নাকি একটা জায়গা আছে, সেখানে সারাফত আলি বলে এক বুড়োর দোকানে ওগুলো কিনতে পাওয়া যায়। আসলে গন্ধতেলের দোকান, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এইসব বিষ বেচে সে। নজর মহম্মদ তোমাকে আরকের কথা বলেনি?
মরালী বললো, প্রথম দিনেই তো বলেছিল আরক চাই কিনা–
ওই তো! ওর নামই তো বিষ। ওই বিষ খাইয়ে খাইয়েই তো আমাদের পোষ মানায়। নইলে তো কান্নাকাটি করে প্রথম প্রথম সবাই ভাসিয়ে দেয়। তারপরে যখন নেশাটা ধরে তখন যা বলবে তাই। করতে হয়। তাই করতে ভালও লাগে। প্রথম প্রথম ভাই আমারও লজ্জা করত। লজ্জা লাগবে না? তুমিই বলো? সবে গা ছেড়ে এসেছি, গায়ের কাপড় টানাটানি করলে লজ্জা লাগবে না? চেনা নেই শোনা নেই অচেনা পরপুরুষের সামনে খালি-গা হওয়া যায়?
মরালী জিজ্ঞেস করলে কে? পরপুরুষ কে?
গুলসন উত্তর দিতে যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ ওদিকে বোধহয় কার পায়ের শব্দ হল। শব্দ হতেই গুলসন ফস করে সরে গেছে। যাবার সময় বলে গেল–বোধহয় নজর মহম্মদ আসছে, আমি ভাই পালাই, কাল আসব–আবার
অন্ধকারে বাইরে সত্যিই পায়ের শব্দ হয়েছিল। মরালী অতটা টের পায়নি। কিন্তু গুলসনের কান সজাগ।
সে এমন করে পালিয়ে গেল যে, মরালীও যেন হঠাৎ বুঝতে পারলে না কখন পালাল। আর ঠিক তার পরেই নজর মহম্মদ ঘরে ঢুকেছে–কসুর মাফ কিজিয়ে বেগমসাহেবা।
বলে তিনবার কুর্নিশ করলে মাথা নিচু করে করে।
মরালী কোনও উত্তর দিলে না। নজর মহম্মদ নিজেই জিজ্ঞেস করলে বেগমসাহেবার কিছু তকলিফ হয়েছে কিনা। শরবত পান কিমাম জর্দা কিছু দরকার কিনা। আরক জরুরত আছে কিনা। বাঁদি কিছু কসুর করেছে কিনা। হাজারো রকমের বাঁধা প্রশ্ন। এ কদিন ধরে মরালী দেখে আসছে, এমনি করে কথা বলাই এদের রেওয়াজ। এর উত্তর তারা চায় না, এর উত্তর তারা হয়তো আশাও করে না। এতদিন ধরে এখানে এই একঘেয়ে দিন কাটানোর সময়ে কারও সঙ্গে মরালী কথাও বলেনি। ঘর ছেড়ে বাইরে যাবার চেষ্টাও করেনি। চেষ্টা করলেই কোত্থেকে নজর মহম্মদের আবির্ভাব হয়েছে, আর অন্য কোথাও যেতে মানা করেছে। ভোরবেলা সূর্য ওঠাটা টের পাওয়া যায় রোদ দেখলে। তারপর কোথাকার কোন মসদিজ থেকে আজানের টানা টানা সুর কানে এসেছে। আর কানে এসেছে নহবতের রাগরাগিনী। ছোটমশাইয়ের বাড়িতেও আগে নহবত বাজানো হত। পরে আর হত না। তারপর একটা বাদি আসে। বেশি কথা বলে না বাঁদিটা। হয়তো বোবা। সোজা নিয়ে যায় গোসলখানায়। সে মরালীর গায়ে কী রকম। তেল মাখিয়ে দেয়। প্রথম প্রথম লজ্জা করত মরালীর। কিন্তু বাঁদিটার লজ্জাশরম কিছু নেই। সে তেলটা, মাখিয়ে গা-শরীর-পা সর্বাঙ্গ মালিশ করে দেয়। তারপর গরম জল দিয়ে ঘষে ঘষে গা-হাত-পা পরিষ্কার করে দেয়। তারপর চুলে তেল মাখায়। চুলটা নিয়ে কসরত করতেই বেশি সময় লাগে তার। তারপর শরীরটা আগাপাশতলা মুছিয়ে দিয়ে নতুন কাঁচা পোশাক পরিয়ে দিয়ে ঘরে আনে। চুলটা হাওয়া দিয়ে দিয়ে শুকোয়। তখন আসে নাস্তা। ফল, বাদাম, দুধ, মাখন। ওসব খেতে ভাল লাগে না মরালীর। এরা মুড়ি-চিঁড়ে দিলে বোধহয় বেশি ভাল লাগত তার। কিন্তু কে বলে সেসব কথা। তারপর সেই খাওয়ার পরই আসে পান, জর্দা, কিমাম, তাম্বুল-বিহার, এলাচ, লবঙ্গ। তারপর পাশার ছকটা নিয়ে এসে মরালীকে পাশা খেলায় ভুলিয়ে রাখতে চায়। মরালী বলে না, তুমি যাও এখন, আমি পাশা খেলব
এমনি করেই দিন কাটাতে কাটাতে হঠাৎ একদিন ওই গুলসন মেয়েটা এসে আলাপ করে গিয়েছিল লুকিয়ে লুকিয়ে। তারপর থেকে ফাঁক পেলেই চলে আসে। এসে নানারকম গল্প শোনায়। এই চেহেল্-সুতুনের গল্প। এই নবাব আর নবাবজাদিদের গল্প। শুনতে বেশ লাগত মরালীর। আর হঠাৎ কারও পায়ের শব্দ শুনলেই কোথায় কোন সুড়ঙ্গপথ দিয়ে সুড়ত করে পালিয়ে যেত।
