তোমরা বামুন নাকি?
অদ্ভুত মেয়ে ওই গুলসন বেগম। বামুনের মেয়ে, কিন্তু চেহারা দেখলে আর চেনাই যায় না। বেশ নাকে বেশর, কানে কনকচুড়, মাথায় মুসলমান মেয়েদের মতো জরির ফিতে বাঁধা বেড়ি, চোখে সুরমা, ঠোঁটে আর আঙুলের নখে মেহেদি রং, বুকে কঁচুলি, পরনে বুটিদার ঘাগরা। বোঝাই যায় না যে গুলসন। বামুনের মেয়ে।
তারপর পুকুরঘাটে একদিন চান করছিলুম ভাই, হঠাৎ কোত্থেকে কে একজন এসে মুখে গামছা পুরে দিয়ে একেবারে চ্যাংদোলা করে তুলে এখানে নিয়ে এল। এসে কলমা পড়িয়ে জাত নিয়ে নিলে। তারপর কোথায় রইল বাবা, আর কোথায়ই বা রইল মা, ছোট ছোট বোনগুলোর জন্যে বড় মন কেমন করে ভাই
বলতে বলতে হয়তো গুলসনের বাড়ির কথা মনে পড়ে যায়। চোখ দুটো মুছে নেয় ওড়না দিয়ে। বলে–এই তো জষ্টি মাস, জষ্টি মাসে আমরা ভাই-বোনেরা মিলে আম কুড়োতে যেতুম, সে যে কত আম ভাই, তোমাকে কী বলব। এক-একটা আম কী মিষ্টি যে কী বলব। পাথরবাটিতে আম আর কাঠালের রস করে সেই খেতাম পান্তা ভাত দিয়ে, এখানে কত কালিয়া কাবাব-কোপ্তা খাচ্ছি, কিন্তু সেরকম তার আর পেলাম না।
তারপর বলে–এতদিন রইছি ভাই এখেনে, কিন্তু তবু সেসব কথা ভুলতে পারিনি। আচ্ছা তুমিই বলল না ভাই, ভাই-বোন বাপ-মা’র কথা কেউ কখনও ভুলতে পারে? তাই সেদিন যখন শুনলুম যে আর একজন মেয়ে আসছে এখেনে, শুনে ভাবলুম, আবার বুঝি কোন মেয়ের কপাল ভাঙল। তখন থেকে তোমার সঙ্গে দেখা করবার চেষ্টা করছি
কার কাছে শুনলে আমি আসছি?
গুলসন বললে–এখেনে ভাই কেউ কি কিছু বলে? কেউ কাউকে কিছু বিশ্বাস করে না, সবাই ভাই সবাইকে সন্দেহ করে। নানিবেগম পর্যন্ত…
নানিবেগম কে?
ওমা, নানিবেগমকেই চেনো না? নানিবেগমই যে এখানকার বেগমদের মাথা। নবাবের নানি কিনা, তাই তাকে সবাই নানিবেগমসাহেবা বলে ডাকে।
নবাবের নানি মানে?
নানি বলে এরা দিদিমাকে। আমরা যাকে বলি দিদিমা, তাকেই এরা বলে নানি। প্রথম প্রথম ভাই আমিও এদের কথাবার্তা বুঝতে পারতুম না। যা খেতুম গা বমিবমি করত। এত ঝাল-গরমমশলা তেল-ঘি দিয়ে রাঁধে যে মুখে কিছু রুচত না। শেষকালে আস্তে আস্তে সব অব্যেস হয়ে গেল। তা তুমি খেতে পারছ?
মরালী বললেন–না
তা এখন তো পারবেই না, কিন্তু কেমে কেমে সব সহ্য হয়ে যাবে।
মরালী হঠাৎ বললে–আচ্ছা, এখানে গান গায় কে?
ওমা, গান তো সব্বাই গায়। গান যে শিখতে হয় আমাদের। তোমাকেও শিখতে হবে। গানের ওস্তাদজি আসে যে গান শেখাবার জন্যে
কিন্তু আমি তো গান কখনও গাইনি।
গান না পারলে বাজনা শেখাবে। সেতার শেখাবে। বীণ শেখাবে। ওস্তাদজি যে সব বাজনা বাজাতে পারে ভাই। তারপর নাচতে পারলে আরও ভাল হয়–নাচ যদি একবার শিখতে পারো ভাই তো তখন তুমি একেবারে নবাবের পেয়ারের বেগম হয়ে যাবে তখন আর তোমাকে পায় কে! এখানে তো সব্বাই তাই নবাবের পেয়ারের বেগম হতে চাইছে–
গুলসন বেগমের কথা বেশি বলা স্বভাব। যখন বকে যায় তখন আর রাশ থাকে না মুখের।
মরালী বললে–আর রোজ কাঁদে কে? রাত্তিরে যে প্রায়ই কান্না শুনতে পাই
ও পেশমন, ওর কথা আর বোলো না
কেন? কী হয়েছে ওর? কেন কাঁদে?
ও ভাই তোমার মতোই মুসলমানের মেয়ে। ওরা পাঠানি মুসলমান। ওর এক বিচ্ছিরি রোগ হয়েছে
রোগের নাম শুনেই মরালী চমকে উঠল। আহা গো!
সে বড় বিচ্ছিরি রোগ ভাই। দেখলে তোমারও মায়া হবে। যন্তরনা যখন হয় তখন আর চেপে রাখতে পারে না, খুব চেঁচায়–
তা কবিরাজকে দেখায় না কেন?
কবিরাজকে দেখায় না ভাই। এরা হেকিমি দাওয়াই এনে দেয়। কিন্তু আমি বলছি ভাই ও-রোগ ওর সারবে না। ও-রোগ একবার হলে আর সারে না।
রোগটা কী?
গুলসন বলে–এরা বলে সুজাক। এরা বলে মালেখুলিয়া দিমাগি। ওসব মুসলমানি রোগের মাথামুণ্ডু কিছু বুঝিনে ভাই। তুমি যদি তাকে দেখো তা হলে তোমারও কান্না পাবে। আমি বলি আসলে ভাই ওরই দোষ!
কেন?
দোষ নয়? তোর সকলকে টেক্কা দেবার দরকার কী ছিল? এতগুলো বেগম রয়েছে, তারা আগে না তুই আগে? ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খেতে যাওয়ার দরকার কী ছিল শুনি? তা ছাড়া ভাই নবাবের নিজের শাদি করা বউও তো রয়েছে। তার মনে কষ্ট দিলে তোর কি ভাল হয় কখনও? বলো ভাই, তুমিই বলো।
মরালী এসব কথা অবাক হয়ে শোনে। এ এক বিচিত্র জগৎ। এ-জগতের খবর একদিন সে জানতই একেবারে। এই জগতের মধ্যে এতগুলো মেয়ে এসে জমা হয়েছে। এদের সুখ-দুঃখ-হাসি কান্না সমস্তই যেন একজন পুরুষকে কেন্দ্র করে। সেই মানুষটির কাছে কে কেমন করে সকলের চেয়ে প্রিয় হবে সেইটেই এদের একমাত্র সমস্যা। কে গান শুনিয়ে তাকে মুগ্ধ করবে, কে নেচে তাকে নিজের তাবে আনবে, তারই প্রতিযোগিতা চলে দিনরাত। গুলসনের কাছে সব গল্প শুনে শুনে এই ক’দিনের মধ্যেই মরালীর সব চেহেল-সুতুনটা যেন দেখা হয়ে গিয়েছিল? সে যেন চোখ বুজেই বলে দিতে পারে কোন দিকে নানিবেগম থাকে, কী করে। বলে দিতে পারে লুৎফা বেগমের রাত কাটে কেমন করে। পেশমন বেগম কেন কাঁদে। বব্বু বেগম কেন অত মন দিয়ে গান শেখে, তক্কি বেগম কেন নাচ শেখে মনপ্রাণ দিয়ে। একদিন এমনি করেই যদি নবাবের নজরে একবার পড়ে যেতে পারে কেউ তো তখন তাকে আর কে পাবে? তখন মতিঝিলের মতো তার একটা বাড়ি হবে, তখন তার জন্যে সাজাহানাবাদ থেকে হিরের গয়না আসবে, জয়পুর থেকে সাচ্চা মোতির মালা আসবে। তখন রুপোর বদলে সোনার গেলাসে সে শরবত খাবে। তখন তার খেদমত করবে দশটা খোঁজা, বিশটা বাঁদি। তখন আর তাকে নানিবেগমের ধমক খেতে হবে না, তখন সে পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে হুকুম করবে সবাইকে।
