তা হলে আর কদ্দিন এরকমভাবে থাকব এখানে?
দুর্গা বললে–আর ক’টা দিন, নবাব তো কলকাতায় ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই করতে গেছে, যদি বেটা সেখানেই ফিরিঙ্গিদের গোলা লেগে মরে যায় তো বুড়ো শিবের মন্দিরে পুজো দেব বউরানি, মানত করে রেখেছি; তখন আবার তোমাকে ওপরে নিয়ে গিয়ে ছোটমশাইয়ের পাশে শুইয়ে দিয়ে আসব, আর ক’টা দিন সবুর করো না
ছোটমশাই আমার কথা বলে না আর?
দুর্গা বললে–বলেন না আবার? তোমার জন্যে দাঁতে একটা কুটো পর্যন্ত কাটছেন না এ কদিন। নীচেয় পর্যন্ত নামছেন না। শুনেছেন তো তোমাকে খুন করে ফেলা হয়েছে, সেই কথা শোনার পর থেকেই শয্যাশায়ী
তারপর একটু থেমে আবার বললে–এদিকে এই নতুন ঝাটে আবার মাথাটা গরম হয়ে গেছে আমার। এ-মিনসেকে না শায়েস্তা করলে আর চলছে না। দাঁড়াও না, এ-বেটাকে এবার উচাটন করবই–তুমি দেখে নিয়ো, ঠিক করব, তেমন বাপের জম্মিত আমি নই, না-যদি করি তো আমার নাম দুগ্যাই নয়
*
নবাবের সেপাইরা সেদিন হুড়মুড় করে কেল্লার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। একদিন যে জেনারেল ড্রেককে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে নতুন এম্পায়ার গড়বার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই জেনারেল তখন গঙ্গায় জাহাজ ভাসিয়ে ভাগীরথীর বুক বেয়ে অনেক দূর চলে গেছে। শুধু ড্রেক নয়, মিস্টার মার্কেট, মিস্টার বেভারিজ মিনুচিন, ক্যাপ্টেন গ্র্যান্ট সবাই। কেল্লার মধ্যের ফিরিঙ্গিরা, যারা পালাতে পারেনি, তারা কান্না জুড়ে দিয়েছে হাউমাউ করে। হলওয়েল সাহেব দৌড়ে গিয়ে হাজির হল উমিচাঁদের কাছে। হলওয়েল থরথর করে কাঁপছে। গলার আওয়াজ বেরোচ্ছে না। এখন কী হবে উমিচাঁদজি?
উমিচাঁদ বললে–দাঁড়াও সাহেব, আমি উপায় করছি
বলে সেখানে বসেই একটা চিঠি লিখলে নবাবের জেনারেল রাজা মানিকচাঁদের নামে। লিখলে ফিরিঙ্গিরা আপনার পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে প্রস্তুত। আপনি যা শাস্তি তাদের দেবেন, তাই-ই তারা মাথা পেতে নেবে। এখনই যুদ্ধ বন্ধ করুন। নইলে আমরা সবাই সদলবলে ধ্বংস হয়ে যাব।’
চিঠিটা কেল্লার পাঁচিলের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হল। অনেকক্ষণ ধরে সবাই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। এইবার হয়তো চিঠির উত্তর আসবে। হয়তো এইবার। শেষপর্যন্ত সে-উত্তর এল সশরীরে। ভোরবেলা সশরীরে হাজির হল রাজা মানিকচাঁদ, মিরজাফর, মোহনলাল, আর সকলের শেষে সশরীরে এসে হাজির হলেন নবাব। নবাব মনসুর-উল-মুলক শা কুলি খান মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌল্লা হেবাৎ জঙ আলমগির…
কান্নার রোল পড়ে গেল চারদিকে।
নবাব ফিরিঙ্গি কেল্লার ভেতরে ঢুকে অবস্থা দেখে অবাক হয়ে গেলেন। এত বড় কেল্লা বানিয়েছে ফিরিঙ্গি বাচ্চারা। এত তাদের ষড়যন্ত্র!
বললেন–উমিচাঁদ কোথায়? রাজা রাজবল্লভের ছেলে কৃষ্ণবল্লভ!
ভয়ে ভয়ে দু’জনে এসে হাজির হল সামনে। ফিরিঙ্গিদের কেল্লায় তারা বন্দি হয়ে ছিল এ ক’দিন। এবার বোধহয় মুর্শিদাবাদের কেল্লায় তাদের বন্দি করা হবে।
আর হলওয়েল? মিস্টার হলওয়েল কোথায়?
কান্নায় তখন ভারী হয়ে এসেছে কলকাতার বাতাস। অষ্টাদশ শতাব্দীর এক অস্বস্তিকর বিচারশালায় আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাবের অনুগ্রহের আশায় মাথা নিচু করে নিঃশব্দে ক্ষমা চাইতে লাগল। আমাদের ক্ষমা করুন জাঁহাপনা। আমরা অপরাধী। এবার থেকে আপনার আশ্রয়ে থেকে আপনার হুকুম তামিল করে আপনার মসনদের মর্যাদা রাখব কথা দিলাম।
.
আর ওদিকে সেইদিন সন্ধেবেলাই সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানে ঠিক সময়েই এসে হাজির হয়েছে খোজা নজর মহম্মদ। নজর মহম্মদ তার কথা রেখেছে। মোহরের মর্যাদা সে লঙ্ঘন করতে পারেনি।
কান্তও তৈরি ছিল।
কান্তকে দেখে নজর মহম্মদ বললে–চলিয়ে জনাব চলিয়ে
*
রোজ রাত্রে যে-শব্দগুলো চেহেল্-সুতুনের ভেতরে তোলপাড় করে বেড়ায়, যে-ভাবনাগুলো হারেমের হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে, তার খবর একদিনেই পেয়ে গেছে মরালী। নজর মহম্মদ যতই পাহারা দিক, পিরালি খাঁ যতই তদারকি করুক, মরালীকে আর কেউ আটকে রাখতে পারেনি চারটে দেয়াল আর একটা ছাদের জেলখানায়।
মরালী জেনে গেছে সে হাতিয়াগড়ের রানিবিবি আর নয় আজ, সে এখন লস্করপুরের তালুকদার কাশিম আলির লেড়কি মরিয়ম বেগম। তাকে সবাই জিজ্ঞেস করেছে–তুমি কেন মরতে এলে ভাই এখেনে?
মরালী বলেছে–এখানে এলে খুব যে আরাম শুনেছিলুম
ছাই, ছাই, ছাই আরাম-নবাবের নিজের মাসি, তার দুর্দশা যদি দেখো
ঘসেটি বেগম?
হ্যাঁ, ওর ডাকনাম মেহেরুন্নিসা, আমাদের এখানে পিরালি খাঁ আছে খোজা সর্দার, সে বলে মতিঝিলের বেগম
কেন?
মতিঝিল তো ঘসেটিবিবিই বানিয়েছিল কিনা। নবাব মতিঝিল থেকে গ্রেফতার করে এনে এখানে নজরবন্দি করে রেখেছে তাকে। আমাদের কারও সঙ্গে দেখা করতে দেয় না, আমাদের কারও সঙ্গে মিশতে দেয় না ঘসেটিবিবি বড় কষ্টে আছে ভাই–
মরালী জিজ্ঞেস করে–তুমি বুঝি হিন্দু? তুমি কী করে এখেনে এলে?
গুলসন বেগম বলে–আমি কি ভাই নিজে সাধ করে এসেছি তোমার মতো? আমাকে প্যায়দায় টেনে এনেছে। ওই যে মেহেদি নেসার সাহেব, চেনো তো?
না।
সেকী, মেহেদি নেসার সাহেবের নামই শোনননি? ওই বেটাই তো সব। নবাব শুধু নামে নবাব। নবাবের ইয়ারবকশিরাই তো ছারখার করে দেবে সব। আমার বর ভাই আমাকে নিত না আমি বরকে সেই বিয়ের রাত্তিরে যা একটুখানি দেখেছিলুম, তারপর আর আসেনি আমাদের বাড়িতে, কেবল বাবার কাছে টাকা চাইত। আমার বাবা টাকা কোথায় পাবে টাকা তো চাইলেই কেউ দিতে পারে না। বাবা তো পুজোরি বামুন–যজমানরা টাকা দিলে তবে তো বাবা হাতে পাবে
