কেউ দেখলে জিজ্ঞেস করে–কে গো তুমি?
আজ্ঞে আমি জনার্দন।
তা ভেতরবাড়িতে কেন?
আজ্ঞে গোকুলকে ডাকতে যাচ্ছি
তারপর আর কেউ তেমন আপত্তি করে না। শোভারামও এমনি মাঝে মাঝে ভেতরে যেত। দু’-একদিন ভেতরে গিয়ে গিয়ে রাস্তাঘাটও চিনে নিলে। বাড়ির ভেতর বিরাট মহল। এক মহল পেরিয়ে আর এক মহলের সামনে গিয়ে এদিক-ওদিক উঁকি মারে। তারপর পাছে কারও সন্দেহ হয় তাই ডাকে–গোকুল, ও গোকুল
কে গা?
তরঙ্গিনী একদিন দেখতে পেয়েছে। নতুন মুখ দেখে ঘোমটা দিয়ে দিয়েছে মাথায়।
আমি জনার্দন মা, গোকুল আছে ইদিকে?
না বাবা, গোকুল এ-মহলে তো থাকে না, ও-মহলের ভেতর-দরজায় গিয়ে ডাকো
এমনি করে ক’দিনের মধ্যেই জনার্দনের বেশ চেনাশোনা হয়ে গেল সব। অন্ধকারে চোখ বেঁধে ছেড়ে দিলেও বেশ অনায়াসে বেরিয়ে আসতে পারে। দুপুরবেলা যখন সবাই খাওয়াদাওয়ার পর গা-আলগা দিয়েছে, জনার্দন তখনও চুপচাপ থাকে না। রেজা আলির কাছেও মাইনে নিচ্ছে, ছোটমশাইয়ের কাছেও মাইনে নিচ্ছে। কিছু কাজ না দেখাতে পারলে রেজা আলি আর কতদিন চাকরিতে রাখবে!
গোকুলকে জিজ্ঞেস করলেহ্যাঁগা, তা তোমাদের শোভারাম পাগল হয়ে গেল কেন গা?
গোকুল বলে–মেয়ের শোকে আর কীসে?
তা মেয়ে গেল কোথায়?
মেয়েছেলের চরিত্তিরের কথা কে বলতে পারে বল! ভগবানও বলতে পারে না, আমি তো কোন ছার
তার পরেই হঠাৎ জনার্দন জিজ্ঞেস করে বসে–ছোটমশাইয়ের বুঝি দুটো বিয়ে গো গোকুল?
গোকুল চাইলে জনার্দনের দিকে। সন্দেহ করলে নাকি!
জনার্দন বলে কিছু মনে করলে না তো ভাই! শুনেছি কিনা যে ছোটমশাইয়ের দুটো বিয়ে, তাই জিজ্ঞেস করলুম
তারপর নিজেই আবার বলে–তা দুটো বিয়েই হোক আর তিনটে বিয়েই হোক, আর ছ’টা বিয়েই হোক, আমরা চাকর-মনিষ্যি, আমাদের ওসব খোঁজ নিয়ে কী দরকার বলো না! খেতে পাচ্ছি পেট ভরে, তাই বলে বাপের ভাগ্যি
তারপর রাত যখন গম্ভীর হয়, যখন সব নিশুতি, তখনও জনার্দন জেগে থাকে। জেগে বসে কানটা খাড়া করে রাখে। কোথায় যেন একটা শব্দ হল না? কে যেন ফিসফিস করে কোথায় কথা বলছে না? কোথায় যেন ঝনঝন শব্দে শেকল খুলে গেল। আস্তে আস্তে অতিথিশালাটা পেরিয়ে ভেতরবাড়ির খিলেনের তলা দিয়ে টিপি টিপি পায়ে এগিয়ে গেল। মনে হল ওদিকের বারান্দায় যেন একটা কার পায়ের শব্দ হচ্ছে। শব্দটা আরও কাছের দিকে আসছে। ভূতের বাড়ি নাকি?
কে র্যা?
একেবারে দুর্গার মুখোমুখি পড়ে গেছে জনার্দন। অন্ধকারে ভাল দেখা যাচ্ছে না। দূরে এককোণে একটা আলো জ্বলছিল। তার আলোটা মুখে এসে পড়তেই একেবারে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে। দুর্গা এসেই একেবারে জনার্দনের হাতটা চেপে ধরেছে।
কে র্যা তুই মুখপোড়া?
জনার্দন বলে উঠল–আমি মা, আমি
দুর্গা তবু ছাড়বার পাত্রী নয়। আমি কে? আমি-র নাম নেই রে মুখপোড়া? একেবারে ভেতরে এসে ঢুকে পড়েছ? ডাকব মাধব ঢালিকে?–অ মাধব, মাধব
দুর্গার চিৎকারে সবাই জেগে উঠেছে। ঝি-চাকর সবাই এসে হাজির। গোকুলও এসে হাজির। দুর্গা তখন চিৎকার করে উঠেছে–ডাক তো গোকুল মাধব ঢালিকে ডাক তো
জনার্দনের মুখখানা দেখে গোকুল অবাক। আরে, তুই জনার্দন? তুই এত রাত্তিরে ভেতরবাড়িতে কী করতে?
জনার্দন তখন কেঁদে ফেলেছে একেবারে। কাঁদতে কাঁদতে বললে–আমি অন্ধকারে ঠাওর করতে পারিনি মা, আমাকে ছেড়ে দেন
গোকুল বললে–ও দুগ্যা, এ যে আমাদের জনার্দন গো
তা জনার্দন তোক আর গোবর্ধন হোক, ভেতরবাড়িতে মেয়েমহলে কী করতে আসে হারামজাদা। বড় বউরানিকে ডাকব?
গোকুল বললে–ছেড়ে দাও দুগ্যা ওকে, ও নতুন লোক, মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে বাইরে গিয়েছিল, আর ফিরে এসে পথ চিনতে পারেনি, ভেতরে ঢুকে পড়েছে ছেড়ে দাও
দুর্গা জনার্দনের হাতটা ছেড়ে দিয়ে বললে–যা এখান থেকে, আর যদি কখনও ভেতরমহলে ঢুকবি তো তোকে খুন করে ফেলব হারামজাদা, আমার কাছে ছেনালিপনা করতে এসেছ?
গোকুল বুঝিয়েসুঝিয়ে আবার জনার্দনকে বাইরে নিয়ে গেল। ঝি-চাকর আবার যে-ার জায়গায় শুতে চলে গেল। দুর্গা আস্তে আস্তে সিঁড়ির তলার ঘরখানার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আবার সব নিঃঝুম। হয়ে গেছে। সিঁড়ির তলার ঘরখানার কুলুপ খুলে ভেতরে ঢুকতেই ছোট বউরানি কথা বলতে যাচ্ছিল।
দুর্গা ফিসফিস করে বললে–চুপ করে বউরানি, চুপ করো–
ছোট বউরানি গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলে–অত চেঁচাচ্ছিলি কেন রে? কী হয়েছিল?
শয়তান ঢুকেছে গো বাড়ির মধ্যে।
শয়তান? কী বলছিস তুই?
হ্যাঁ ছোট বউরানি, পিরের কাছে মামদোবাজি করতে এসেছে। মর মুখপোড়া। দুগ্যাকে এখনও চেনেনি, হারামজাদা মিনসে।
ছোট বউরানি বুঝতে পারছিল না কিছু। বললে–কার কথা বলছিস তুই? কে?
দুর্গা বললে–আমি কদিন থেকে দেখছি মিনসেকে, শোভারামের বদলা কাজ করতে এসেছে, কেবল ভেতরবাড়ির দিকে উঁকিঝুঁকি মারে। আজ রাত্তিরে একেবারে খালি পেয়ে এ-মহলের ভেতরে ঢুকে পড়েছে
ছোট বউরানি জিজ্ঞেস করলে–কেন রে? ঢুকে পড়েছে কেন?
ও নির্ঘাত চর, ডিহিদারের চর। আমার চোখকে ভোলাবে মিনসে তেমন বাপের জম্মিত নই আমি। আমি মিনসের চোদ্দপুরুষের মুন্ডু ঘুরিয়ে দেব না!
ছোট বউরানি হঠাৎ বললে–ওকথা থাক, আর কিছু খবর পেলি তুই? মরালী গিয়ে মুর্শিদাবাদে পৌঁছেছে?
দুর্গা বললে–হ্যাঁ, ভালয় ভালয় পৌঁছে গেছে, কেউ টের পায়নি
