নজর মহম্মদ চলে যেতেই সারাফত আলি কান্তর দিকে ফিরল। বললে–তা হলে তৈয়ার থাকবি কান্তবাবু, কিন্তু যা বললুম তা পারবি তো? চেহেল-সুতুন ভেঙে গুঁড়িয়ে পিষে গোরস্থান বানাতে পারবি তো? আমি যা পারিনি তুই তা পারবি তো?
মনে আছে কান্ত সেদিন বুড়োর এই কথাগুলো শুনে বড় অবাক হয়ে গিয়েছিল। চেহেল্-সুতুনের ওপর বুড়ো সারাফত আলির কীসের এত রাগ? কেন এত অভিযোগ! কী করেছে বুড়োর চেহেল-সুতুন? কী এমন অপরাধ করেছে যার জন্যে নিজের গাঁটের মোহর খরচ করে কান্তকে হারেমের ভেতরে যাবার ব্যবস্থা করে দিলে?
*
হাতিয়াগড়ের রাজবাড়িতে জনার্দন আসার পর থেকেই জগা খাজাঞ্চিমশাই বলে দিয়েছিল–দেখো বাপু, তুমি নতুন লোক, তোমাকে বলে রাখাই ভাল, ছোটমশাইয়ের মেজাজ বড় কড়া। ভাল করে কাজ চাই কিন্তুক, নইলে অন্য লোক দেখব
কিন্তু জনার্দনের কাজকর্ম দেখে সবাই অবাক। বরাবর শোভারামই একাজ করে এসেছে। সেই গদাইলশকরি চালে আসত। তারপরে গোকুল তেল এনে দেবে, গামছা এনে দেবে, শোভারাম তখন ছোটমশাইকে তেল মাখাতে শুরু করবে। তারপর সোহাগের মেয়ে মরালী। মেয়ের খেদমত করবে, না ছোটমশাইয়ের খেদমত করবে! মেয়ের জন্যে কাজে মনই ছিল না শোভারামের। তারপর শোভারামের নিজের কোফা জমি ছিল। তাতে জন খাঁটিয়ে বেগুনটা উচ্ছেটা চাষ করত। তারপর আছে কান্নাকাটি। জগা খাজাঞ্চিবাবুর কাছে এসে প্রায়ই হাত পাতত। বলত–খাজাঞ্চিবাবু, দুটো টাকা হাওলাত দ্যান, আর পারিনে
এই রকম হাওলাত নিয়ে নিয়ে যে কত টাকা বাকি পড়েছিল তার আর হিসেব ছিল না। একদিন জগা খাজাঞ্চিবাবু আর পারলে না। সোজা গিয়ে ছোটমশাইকে বললে–শোভারামের কাছে কাছারির ছ’টাকা তেরো গণ্ডা দামড়ি বকেয়া পাওনা, তাগাদা দিয়ে দিয়েও আর পাচ্ছি না, কী করব তাই হুকুম দেন
ছোটমশাইও যেমন। আদর দিয়ে দিয়ে একেবারে মাথায় তুলেছিলেন। বললেন–ওর কি আর দেবার ক্ষমতা আছে খাজাঞ্চিমশাই, ওটা আমার নামেই খয়রাত দেখিয়ে দাও খাতায়–
কিন্তু এবার জনার্দন আসতেই জগা খাজাঞ্চিবাবু আগেভাগে কথা বলে নিয়েছিল দেখো বাপু, তোমার আবার শোভারামের মতো সোহাগের মেয়েটেয়ে নেই তো?
জনার্দন হাতজোড় করে বলেছিল–না
আগে কোথাও কাজকাম করেছ?
আজ্ঞে না, হুজুর।
দেশ কোথায়?
ছিন্নাথপুর।
শুধু ছিন্নাথপুর বললে–আমি কী বুঝব। কোন ছিন্নাথপুর? নদের ছিন্নাথপুর না ঝিনেদের ছিন্নাথপুর।
আজ্ঞে ঝিনেদের ছিন্নাথপুর।
জগা খাজাঞ্চিবাবু জনার্জনের নাম-ধামকুলজি লিখে নিলে খাতায়। যদি তেমন মন দিয়ে কাজ করতে পারো তো তোমাকেও কোফা প্রজা করে নেব। ছোটমশাইকে তেল মালিশ করে চান করিয়ে দিতে হবে রোজ। তারপর ফাইফরমাশটাও খাটতে হবে। ছোটমশাইয়ের সঙ্গে দরকার পড়লে মহলে যেতে হবে।
সবতাতেই জনার্দন রাজি। যে-কোনও মাইনে, যে-কোনও কাজ, কিছুতেই না বলেনি জনার্দন। ছোটমশাই তখন নিজের মহলে বেরোনই না। শরীরটা খারাপ। নীচে নামাও তার বারণ। কবিরাজ মশাই আসেন, ভেতরে গিয়ে তাকে দেখে আসেন, তারপর চলে যান ওষুধ দিয়ে।
একদিন জনার্দন গোকুলকে জিজ্ঞেস করলে–হ্যাঁগো, কী ব্যামো ছোটমশাইয়ের?
গোকুল বললে–বড় ভারী ব্যামো গো, বড় ভারী ব্যামো
তা কবিরাজ মশাই কী বলছেন? কদ্দিন লাগবে সারতে?
তা লাগবে অনেকদিন। এ তো তোর-আমার মতো গরিবের ব্যামো নয়,
জনার্দন তবু যেন খুশি হল না। জিজ্ঞেস করলে ব্যামোটা হল কেন হঠাৎ?
গোকুল রেগে উঠল।–তা মানুষের ব্যামো হবে না? রোগ ব্যামো না হলে কবিরাজ-বদ্যি-হাকিম কী করতে আছে? তারা কী খাবে?
তা বটে। কথাটা বোধহয় বুঝল জনার্দন। কিন্তু বুঝেও সময় পেলেই অকারণ প্রশ্ন করা স্বভাব জনার্দনের।
গোকুল রেগে যায়। বলে–তোর অত কথা জানবার ইচ্ছে কেন বল তো জনার্দন? তোর খেতে পাওয়া নিয়ে কথা। দু’বেলা অতিথিশালায় খাবি আর কাজ করবি। আর কাজ না থাকে তো পায়ের ওপর পা দিয়ে আয়েশ করে বসে থাকবি। তোর সব কথায় থাকার দরকারটা কী?
জনার্দন বললে–তা যা বলেছ গোকুল, আমার কীসের মাথাব্যথা। দু’বেলা দুটো খাব আর কাজ থাকে পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করে বসে থাকব। কী বলে?
কিন্তু তবু চুপ করে থাকতে পারে না জনার্দন। দরকার না থাকলেও কানুনগো কাছারিতে গিয়ে বসে। এটা ওটা জানতে চায়। জগা খাজাঞ্চির ওপর অগাধ ভক্তি আবার। দেখলেই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে মাথায় হাত ঠেকায়।
জগা খাজাঞ্চিবাবু বলে লোকটার দেবদ্বিজে ভক্তিটক্তি আছে দেখছি, শোভারামের মতো নয়
জনার্দন বলে শুধু বসে বসে ভাত গিলছি খাজাঞ্চিমশাই, একটা কিছু কাজকাম দেন, আর ভাল্লাগছে না–
কী কাজ করবি তুই? কী কাজ জানিস?
আজ্ঞি হুজুর, সব কাজ জানি। জল তুলতে জানি, বাটনা বাটতে জানি। ঘর ঝাড় দিতে জানি, পা টিপে দিতে জানি। জানি সব কাজই খাজাঞ্চিবাবু, ছোটমশাই যদ্দিন ব্যায়োতে আছেন, তদ্দিন না হয় অন্য কাজ করি। কাজ না করে করে যে গায়ে-গতরে ব্যথা হয়ে গেল আমার
এমন উৎসাহী লোক জগা খাজাঞ্চিবাবু জীবনে দেখেনি আগে। একটু অবাক হয়ে গেল। তারপর বললে–আচ্ছা ঠিক আছে, আমার পা দুটো একটু টিপে দে দিকিনি, দেখি তোর কেমন কেরামতি
তা সেদিন থেকে সেই কাজই করতে লাগল জনার্দন। যতদিন ছোটমশাই না নীচেয় নামেন ততদিন জনার্দনকে দিয়ে নিজের পা টিপিয়ে নিতে লাগল জগা খাজাঞ্চিবাবু। তারপর সময় পেলেই অতিথিশালায় গিয়ে ঢোকে। গোকুলের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেয়। গোকুলের সঙ্গে বারবাড়ি পেরিয়ে ভেতরবাড়ি পর্যন্ত যাবার চেষ্টা করে। ভেতরবাড়িতে একলা গিয়ে গোকুলের নাম করে এদিক-ওদিক উঁকি মেরে দেখে।
