কেন? মুলাকাত করবি কেন? কী কাম তোর রানিবিবির সঙ্গে?
কান্ত বললে–রানিবিবি পালিয়ে যেতে চেয়েছিল রাস্তায়। তখন আমিও ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, কাটোয়ার ডিহিদারের লোক আসাতে আর পালানো হয়নি। এবার দেখা করে ভাবছি কথাটা তুলব–
বিবিকে নিয়ে পালিয়ে যাবি চেহেল্-সুতুন থেকে?
কান্ত বললে–হ্যাঁ মিঞাসাহেব, আমি বুঝতে পেরেছি আমি পাপ করেছি, আমি সে-পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই মিঞাসাহেব, আমার রাত্তিরে ঘুম হচ্ছে না ক’দিন থেকে
সারাফত আমি এবার মুখ ফিরিয়ে চেয়ে দেখলে কান্তকে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে দেখলো যেন মনে হল কান্তকে পরখ করছে একদৃষ্টে।
তারপর বললে–পারবি তুই কান্তবাবু? তোর কলিজার জোর আছে?
কান্ত বললে–পারব মিঞাসাহেব। রানিবিবি যদি রাজি থাকে তো আমার সাহসের অভাব হবে না। আমি বলছি, আমি পারব
ঠিক পারবি?
সারাফত আলির যেন সন্দেহ হল। পারবি তত ঠিক? ভয় করবে না তো তোর?
হ্যাঁ, বলছি তো পারব মিঞাসাহেব। নিশ্চয় পারব।
চেহেল সুতুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিতে পারবি? ভেঙেচুরে একেবারে গোরস্থান বানিয়ে দিতে পারবি? যেন হাজি মহম্মদের বংশের হাড়টা পর্যন্ত কবরের ভেতরে ভয়ে কেঁপে ওঠে, এমন করে নবাব-হারেমের প্রত্যেকটা ইট গুঁড়িয়ে পিষে ফেলতে পারবি? সত্যি বলছিস, তুই পারবি?
বুডোর গলাটা যেন কেমন করুণ শোনাল বড়।
কান্ত বললে–হ্যাঁ পারব মিঞাসাহেব! আপনি যদি একটু মদত দেন তো নিশ্চয় পারব—
বুড়ো এবার কান্তকে একহাত দিয়ে একেবারে জড়িয়ে ধরলে। এরকম কখনও করে না সারাফত আলি। বুড়োর চোখ দিয়ে এর আগে কখনও জল পড়তেও দেখেনি কান্ত। এ কী হল বুড়োর!
আমি পারিনি রে কান্তবাবু! আমি কোশিস করেছিলুম, কিন্তু পারিনি। আমার কলিজা ভেঙে দিয়েছে ওরা, আমাকে নেশা ধরিয়েছে ওরা, আমাকে দিওয়ানা করেছে ওরা, তাই আজ আমি আফিং মিশিয়ে তাম্বাকুর ধোঁয়া টানি, আফিং খাই, চরস খাই, ওদের পোড়াতে গিয়ে আমি নিজেই পুড়ে আজ খাক হয়ে গেছি কান্তবাবু…
বলতে বলতে সারাফত আলি সাহেব হঠাৎ মাঝপথে থেমে গেল। হয়তো বুঝতে পেরেছে এত কথা বলা কান্তর সামনে উচিত হয়নি। কিন্তু না, সেই লোকটা আবার এসে হাজির। সেই নজর মহম্মদ! নজর মহম্মদকে দেখেই সারাফত আলি সামলে নিয়েছে নিজেকে। নজর মহম্মদও একজন অচেনা লোককে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেছে।
সারাফত আলি কান্তর দিকে চেয়ে বললে–তুই এখন যা কান্তবাবু, আমার খদ্দের এসেছে
কান্ত চলে যেতেই সারাফত নজর মহম্মদকে খাতির করে দোকানের গদিতে বসাল। তাকিয়া এগিয়ে দিলে। বললে–ইলাজ হল নজর মিঞা?
নজর মহম্মদ সে-কথার উত্তর না দিয়ে বললেও কে মিঞাসাহেব? কাফের আদমি মালুম হচ্ছে?
সারাফত আলি বললে–তোমার সঙ্গে একটা বাত আছে নজর মিঞা, একটা কাম করতে পারবে আমার? একটা উপকার?
বলুন মিঞাসাহেব?
তোমাদের চেহেল্-সুতুনে হাতিয়াগড়ের রানিবিবি এসেছে না?
নজর মহম্মদ কথাটা শুনেই শিউরে উঠল। সর্বনাশ। তার পরেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললে–হাতিয়াগড়ের রানিবিবি! কই, না তো মিঞাসাহেব! নইবেগম যে এসেছে সে তো লস্করপুরের তালুকদারের লেড়কি মরিয়ম বেগম
আমার কাছে ঝুট বোলো না নজর মিঞা, আমার সব মালুম আছে–
নজর মহম্মদ একটু বিব্রত হয়ে পড়ল। সারাফত আলি আবার বলতে লাগল আর যার কাছে যা বলো তুমি, আমার সঙ্গে দিল্লাগি করতে যেয়ো না। হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকে যে-আদমি এনেছে সে আমার খুলিতে আছে, আমি সব জানি
নজর মহম্মদ আর কোনও কথা বলতে পারলে না।
সারাফত আলি বললে–আমার একটা কাম করতে হবে তোমাকে নজর
কী কাম?
আমার আদমিকে চেহেল্-সুতুনের হারেমের অন্দরে নিয়ে যেতে হবে একদফে, রানিবিবির সঙ্গে তার মুলাকাত করিয়ে দিতে হবে
নজর মহম্মদ ভয় পেয়ে গেল। চারিদিকে চেয়ে গলা নিচু করে বললে–এ আপনি কী বলছেন মিঞাসাহেব? আমি কি হারেমের মালিক, মালিক তো নানিবেগম
সারাফত আলি বললে–ওকথা তুমি দুসরা কাউকে বোলো নজর, আমাকে বলতে এসো না–আসলি মালিক কে তা আমি জানি
আসলি মালিক তো পিরালি মিঞাসাহেব।
তা হলে এতক্ষণ ঝুটমুট কথা বাড়াচ্ছিলে কেন? আমার এ কাজটা করতেই হবে। পিরালিই মালিক হোক আর যে-ই মালিক হোক, তুমিই তো সব। নজরানা কত লাগবে বলো?
কীসের নজরানা?
সারাফত আলি হেসে উঠল। বললে–ঘুষ, রিশশোয়াত। বেগম-নজরানাতে তো হারেমের খোজারা কিছু করে না, তাই জিজ্ঞেস করছি! কত নেবে তুমি?
নজর লজ্জায় পড়ল। বললে–আপনার কাছে কী নেব মিঞাসাহেব?
না, তোমাকে নিতে হবে। তোমার যা মামুলি পাওনা আছে, তা আমি আমার নিজের ভবিল থেকে দেব। এক মোহর?
নজর বললে–সে আপনার যা খুশি দেবেন—
কথাটা শুনেই সারাফত আলি চিৎকার করে ডাকলে কান্তবাবু, ইধর আ–
এতক্ষণ পেছনের ঘরে দাঁড়িয়ে কান্ত সবই শুনছিল। এবার সামনে এসে দাঁড়াতেই সারাফত আলি তাকে দেখিয়ে নজর মহম্মদকে বললে–এই আমার আদমি, এ যাবে
নজর মহম্মদ ভাল করে দেখে নিলে কান্তকে। তারপর বললে–ঠিক আছে মিঞাসাহেব, আপনি যখন বলছেন, তখন ঠিক আছে, লেকিন কেউ যেন জানতে না পারে–
সারাফত বললে–কেউ জানবে না, কৌয়া-চিড়িয়া ভি জানবে না–
নজর মহম্মদ বললে–তা হলে আমি সামকা বখত আসব মিঞাসাহেব, বাবুজিকে মেরে সাথ লিয়ে চলব–বলে সেলাম করে নজর মহম্মদ চলে গেল।
