না না, ওকথা বলিসনি এখন, অন্য কথা বল। তোকে এবার অন্য একটা কাজ দেব
কী কাজ?
একটা চিঠি দেব, সেই মহারাজ কিস্টোচন্দরকে গিয়ে দিয়ে আসতে হবে
কার চিঠি?
ওসব পুছিসনি। তোকে যা কাম দেব তাই করবি–তা তার দেরি আছে, বখত হলেই বলব
বলে বশির মিঞা চলে গেল। কান্ত অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকেও কী করবে তার কূল-কিনারা করতে পারলে না। আবার ফিরে এল সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানে। ক’দিন থেকেই এই দোকানের পেছনে থেকে থেকে কান্ত একটা জিনিস বুঝে নিয়েছিল যে, সারাফত আলির কাছে। মুর্শিদাবাদের নানান ধরনের লোক নানান কাজে আসে। সারাফতকে সবাই যেন একটু মান্যগণ্য করে। মিঞাসাহেবের টাকাও আছে বেশ। আসলে টাকা উপায় করবার জন্যে কারবার করলেও সারাফত আলির যেন অন্য আর-একটা দিকও আছে। সেটা যে কী তা কান্ত এতদিন মিশেও বুঝতে পারেনি। মাঝে মাঝে বুড়ো কান্তকে ডাকে। জিজ্ঞেস করে-কাস্তর সংসারে কে কে আছে। কেন মুর্শিদাবাদে চাকরি করতে এসেছে। দিনেরবেলা যখন নেশা থাকে না মিঞাসাহেবের তখন ভাল ভাল উপদেশ দেয়। বলে–এ বড় আজব শহর, এখান থেকে ভাগ তুই কান্তবাবু। নবাব একদিন ডুববেই, মুর্শিদাবাদও একদিন ডুববে, তখন তুইও ডুববি
কান্ত বসে বসে বুড়োর কথাগুলো শুনত। দুপুরবেলা যখন খদ্দের থাকত না দোকানে, চকবাজারের রাস্তাটা যখন খাঁখাঁ করত, তখন বুড়ো নেশা করত না। ওই শুধু গড়গড়াটা টানত ভুভুক ভুড়ুক করে। কান্ত থাকবার জন্যে ঘরখানার ভাড়া দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বুড়ো নেয়নি। কান্ত জোর করে বুড়োর হাতে কড়ি খুঁজে দিতে চেয়েছিল। বুড়ো সেকড়ি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল চকবাজারের রাস্তায়। বলেছিল–তোর কাছ থেকে আমি কেরায়া নেব? তুই কি ভেবেছিস আমি রুপিয়ার কাঙাল?
তারপর থেকে আর কেরায়ার কথাও ওঠেনি, কান্তও কেরায়া দেয়নি। কিন্তু মনে হত কী যেন একটা রহস্য লুকিয়ে আছে সারাফত আলির জীবনের পেছনে। নইলে নিজামতকে অত গালাগালি দেয় কেন দিনরাত। কেন উঠতে বসতে নবাবকে গালমন্দ করে?
কান্ত জিজ্ঞেস করত–চাকরি না করলে আমি খাব কী? বাঁচব কী করে?
সারাফত আলি বলত–যারা চাকরি করে না তারা খেতে পায় না? তারা বেঁচে নেই?
কিন্তু আমার যে কেউ নেই, কিছু নেই মিঞাসায়েব।
বুড়ো বলত–আমার কে আছে? আমাকে কে খিলাচ্ছে? খিলানোর মালিক যদি খিলায় তো নবাবের চৌদ্দহ-পুরুষের সাধ্যি আছে তোকে মারে?
তারপর কান্ত বুঝি আর কৌতূহলটা চেপে রাখতে পারত না। জিজ্ঞেস করত–মিাসায়েব, আপনি কেন বুড়ো বয়সে এত খাটছেন? এত কারবার করে পরশান হচ্ছেন? কার জন্যে? আপনার এত টাকা খাবে কে?
একথার উত্তর দিতে বুড়ো বুঝি একটু থতমত খেয়ে থমকে যেত। উত্তর দিতে গিয়েও থেমে যেত। তারপর গড়গড়ার নলটা নিয়ে ভুড়ভুড় করে টানতে শুরু করত। আর কোনও কথার জবাব দিত না। অন্য কথা বলত।
সেদিন দোকানের ভেতরে চুপি চুপি কার সঙ্গে বুড়োর কথা হচ্ছিল। কান্ত পেছনের ঘর থেকে সব শুনছিল।
মিঞাসাহেব জিজ্ঞেস করলে–কী রে নজর মহম্মদ, বিবিজানের দিমাগ কিসতরহ হ্যায়?
লোকটা বললে–ওইসাহি হ্যায়, বহোত রো রাহি হ্যায় খুব কাঁদছে মিঞাসাহেব-ইলাজ করছি, তবু কিছু আরাম হচ্ছে না
মিঞাসাহেব বললে–আরাম হবে না
নজর মহম্মদ বললে–কেও মিঞাসাহেব?
সরাফত আলি সাহেব চিৎকার করে উঠল মালেখুল্লিয়া দিমাগি কভি আচ্ছা নেহি হোনেওয়ালি, আরাম ভি নেহি হোগা, ঔর ইলাজ ভি কোই নেহি বানানে সেকেঙ্গে, তুমহারা হারেম ভি জাহান্নমমে যানেওয়ালা–যাও, আরক নেহি মিলেগা মেরে পাস, যাও-নিকাল যাও ইহাসে
বুড়ো সারাফত আলি যখন রেগে যায় তখন কাউকেই আর পরোয়া করে না। তখন যাকে-তাকে যা-তা বলতে শুরু করে। নজর মহম্মদও তা জানে। জানে বলেই হয়তো কিছু বললে–না। সওদা নিয়ে চলে গেল হাসতে হাসতে।
কথাটা মনে ছিল কান্তর। সেদিন যখন সারাফত আলির নেশা কেটে গেছে, তখন আবার ডেকে পাঠিয়েছে কান্তকে। কান্ত কাছে যেতেই বুড়ো জিজ্ঞেস করলে-কাল তাঞ্জামে কাকে নিয়ে এলি তুই, কান্তবাবু? কোন বিবিজানকে?
কান্ত চুপ করে আছে দেখে বুড়ো আবার জিজ্ঞেস করলে বল, কাকে নিয়ে এলি? আমি সব জানি। আমার কাছে লুকোসনি। আমি কাউকে বলব না–
কান্ত বললে–হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকে।
কথাটা শুনেই বিনা নেশাতেই সারাফত আলির চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল–উল্লুকা-পাট্টা
কান্ত বুঝল মিঞাসাহেব রেগে লাল হয়ে গেছে। কথা না বলে মিঞাসাহেব ঘন ঘন গড়গড়ার নলে খুব টান দিতে লাগল। তারপর অনেকক্ষণ পরে বললে–কেন নিয়ে এলি?
কান্ত বললে–আমি শুধু হুকুম তামিল করেছি মিঞাসাহেব, আমার কোনও দোষ নেই
দোষ নেই? তোরই তো দোষ। কেন তুই হিন্দুর বিবিকে মুসলমানের হারেমে আনলি? চেহেলসূতুনে জেনানার ইজ্জত থাকবে? তুই তো জাহান্নমে যাবি, তোদের কাফেরদের তো নরক আছে, সেখানে যাবি তুই বেশক
কান্ত চুপ করে রইল। বুড়োও খানিকক্ষণ গড়গড়া টানতে লাগল একমনে।
কান্ত একবার হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে–আচ্ছা মিঞাসাহেব, ওই যে কাল আপনার কাছে এসেছিল, নজর মহম্মদ নাম, ও কে? ও কি চেহেল্-সুতুনের লোক?
হ্যাঁ, খোঁজা মহম্মদ।
আচ্ছা, ওকে বললে–আমাকে একবার চেহেল্-সুতুনে ঢুকিয়ে দিতে পারে না? হাতিয়াগড়ের রানিবিবির সঙ্গে মুলাকাত করিয়ে দিতে পারে না?
