ষষ্ঠীপদ বললে–হুজুর, সেই কথাই তো বলতে এসেছি, আমি আমার মামার বাড়ি থেকে আসছিলুম, হঠাৎ পেরিন-পয়েন্টের কাছে দেখি নবাব ফৌজটৌজ নিয়ে হাজির, লড়াই করতে এসেছে হুজুরদের সঙ্গে —
সে আর নতুন কী, সে তো সবাই জানে! ওসব বাজে কথা শোনবার এখন সময় নেই আমাদের
হুজুর, বাজে কথা নয়, আমি যে লুকিয়ে লুকিয়ে ওদের সব দেখে এলুম
বেভারিজ সাহেব এতক্ষণে যেন একটু সজাগ হল। বললে–কী দেখলে? ক’হাজার সোলজার আছে কিছু জানতে পারলে? ওদের তোড়জোড় কী রকম দেখলে?
ষষ্ঠীপদ বললে–আজ্ঞে, নস্যি নস্যি—
নস্যি মানে?
ওই যা নাকে দেন আপনারা! তামাকের গুঁড়ো–তাই। একেবারে ফাঁকা আওয়াজ, নবাব তো শুনলুম ভয়ে একেবারে কাপড়েচোপড়ে হয়ে গেছে। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তাই খবরটা আপনাকে দিতে এলুম হুজুর দেখবেন যেন কথাটা ফাস না হয় হুজুর, নইলে আমাকে ওরা কেটে একেবারে দুখানা করে ফেলবে–আমাদের সেই কাতাবু, আপনার মুনশি ছিল, সেনবাবের চরের চাকরি করছে কিনা–আমার ওপর তার রাগ আছে–
কান্তর নাম শুনেই বেভারিজ সাহেবের মুখ দিয়ে একটা শব্দ বেরোল–স্কাউড্রেল—
ষষ্ঠীপদ বললে–শুধু স্কাউড্রেল নয় হুজুর, আবার রাসকেল
বেভারিজ সাহেব কী যেন ভাবতে লাগল।
ষষ্ঠীপদ বললে–মিছিমিছি ভাববেন না হুজুর, আমি বলছি আপনাদের জয় নির্ঘাত
সাহেব আর দাঁড়াল না। কথাটা ক্যাপ্টেন ড্রেককে বলতে হবে। তাড়াতাড়ি ভেতরে চলে গেল। ষষ্ঠীপদও সোজা আবার অন্য পথ ধরলে। অন্ধকার রাত। সব লোজন পালাচ্ছে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে। ষষ্ঠীপদ একেবারে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে হাজির। ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে নীচেয় নেমে গঙ্গাজল নিয়ে নিজের মাথায় ছিটোতে লাগল। মা, লড়াইটা বাধিয়ে দাও মা, সর এলোমেলো করে দাও–একবার প্রাণ ভরে লুটপাট করে নিই–তখন মা এই কলকাতার ৫৭৮৬ বিঘে ১৯ কাঠা জমির মালিক হতে পারব–তখন আর কাউকে পরোয়া করব না মা, তখন আর পরের চাকরি করতে হবে না মা-মা তুমি পতিতোদ্ধারিণী, পতিতকে উদ্ধার করে দাও মা আমাকে রাজা করো–রাজা করে দাও মা আমাকে–
তখন অল্প অল্প ভোর হচ্ছে।
হঠাৎ পুব দিক থেকে যেন একটা গুমগুম শব্দ হতে লাগল। ষষ্ঠীপদ সেইদিকে কান পেতে রইল। তা হলে মা তার ইচ্ছে পূর্ণ করেছেন। এই বাদামতলার দিক দিয়ে, ডানকান সাহেবের বস্তির দিক দিয়ে, নবাবি ফৌজ কলকাতায় ঢুকছে! জয় মা কালী! মা, তা হলে পতিতকে উদ্ধার করলে–আমাকে রাজা করলে—
*
চকবাজারের সারাফত আলির দোকানের ভেতরে তখন সবে কান্ত ঘুম থেকে উঠেছে। হঠাৎ বশির। মিঞা এসে হাজির। বললে–উঠেছিস, তোকে খবরটা দিতে এলুম–আমি এখনই কলকাতা থেকে এলুম–লড়াই ফতে রে–লড়াই ফতে হয়ে গেছে
সেকথায় কান্ত বিশেষ কান দিলে না। বললে–তোর বাড়িতে তোকে খুঁজতে গিয়েছিলুম
কেন? আমি তো ছিলুম না, কলকাতায় গিয়েছিলুম
সেই জন্যেই তো ভাবনায় পড়েছিলুম খুব।
কীসের ভাবনা?
কান্ত বললে–তোকে একটা কাজ করতে হবে ভাই, যে করে তোক করতেই হবে, আমাকে একবার রানিবিবির সঙ্গে হারেমের ভেতরে দেখা করিয়ে দিতেই হবে। তোর পায়ে পড়ি ভাই, দেখা করিয়ে দিতেই হবে, কাল সারারাত ভাই ভেবে ভেবে আমার ঘুম হয়নি।
বশির মিঞা অবাক হয়ে গেল। বললে–তুই বলছিস কী? তুই কি মস্তানা হয়ে গেছিস? দেখছিস শহর এখন মিরবকশির তাবে। ওদিক থেকে নবাবের ভাইরা এসে কোনদিন মসনদ লুটে নেবার তাল করছে। এখন চেহেল্-সুতুনে কড়া পাহারা বসে গেছে। খবরদার, ও-আবদার করিসনি। তুইও ফাটকে ঝুলবি আমাকেও ফাটকে ঝোলাবি ওসব আবদার ছাড় তুই
কান্ত বললে–তুই একটু চেষ্টা করে দেখ না—
ওরে বাবা, কেউ যদি জানতে পারে তো আমার জান নিকলে যাবে
বলে বশির মিঞা বাইরে চলতে আরম্ভ করল। বললে–সে জমানা আর নেই রে, নইলে তোকে ঢুকিয়ে দিতুম, এখন নানিবেগম খুব হুঁশিয়ার হয়ে গেছে। পিরালি খাঁ, নজর মহম্মদ, বরকত আলিরা এখন নিজেদের জান নিয়ে পাগল।
কিন্তু ভেতরে কোনও রকমেই যাওয়ার উপায় নেই? আমি একবার শুধু যাব, রানিবিবির সঙ্গে শুধু একটা কথা বলে চলে আসব শুধু একবার।
কেন, রানিবিবির সঙ্গে তোর কীসের কারবার?
কান্ত বললে–শুধু একটা কথা বলে আসব রানিবিবিকে
কী কথা?
কান্ত বললে–কাটোয়ার সরাইখানায় আমাকে রানিবিবি একটা খবর জানতে বলেছিল, সেটা বলা হয়নি আর। কোতোয়াল আর কথা বলতে দেয়নি
কী কথা?
বলেছিল একটা পাগলের নাম জেনে আসতে। পাগলটা গান গাইছিল সরাইখানার সামনে।
বশির বললে–উদ্ধব দাস? উদ্ধব দাসের কথা বলছিস?
তুই চিনিস উদ্ধব দাসকে?
খুব চিনি। আরে, লোকটা বেকাম লোক। আমি ওকে কাম দিতে চেয়েছিলুম। ও তো দুনিয়া টহল দিয়ে বেড়ায়, বলেছিলুম জাসুসি কাম করতে। তামাম বাংলা-মুলুকে এখন আমাদের জাসুস দরকার, ঘসেটি বেগমসাহেবাকে তো পাকড়ে রাখা হয়েছে, কিন্তু তবু দুশমনের তো কমতি নেই–
কান্তর ওসব কথা শুনতে ভাল লাগছিল না। ছোটবেলা থেকে কান্ত দেখে এসেছে ওসব দুশমন সকলেরই আছে। টাকাপয়সা প্রতিষ্ঠা-প্রতিপত্তি থাকলেই দুশমন থাকবে। যত বেশি টাকা থাকবে, তত বেশি দুশমন থাকবে। বড়চাতরার নায়েব নাজিমবাবুদের মালখানা পাহারা দিত পাহারাদাররা বন্দুক নিয়ে।
কান্ত হঠাৎ কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বললে–তা হলে দেখা করা হবে না রানিবিবির সঙ্গে?
