নজর মহম্মদ ফিরে আসতেই পিরালি খাঁ জিজ্ঞেস করলে–কী রে, কী খবর?
নজর মহম্মদ বললে–বড়ি দিমাগি জেনানা খাঁসাহেব, বড়ি একলোখখি ছুকরি। ভয়-ডর বিলকুল নেই–বেগমসাহেবা খাসমহলের দিকে আসছিল, সামলে নিয়েছি
কেন? খাসমহলের দিকে আসছিল কেন? ঘণ্টা রেখে দিসনি?
ওই যে বললুম দিমাগি জেনানা। ঘণ্টা রেখে দিয়েছি, তবু বাইরে আসছিল। খানা ভি খাবেনা, সরাব ভি খাবে না, পান ভি খাবে না, আরক ভি খাবে না, শরবত ভি খাবে না–
পিরালি খাঁ বললে–সবে নয়া এসেছে, চেহেলসুতুন দেখে তাজ্জব বনে গেছে আর কী! তা হোক, পোষ মানাতে কোশিস কর,নইলে নেসার সাহেব গোসসা করবে, খুব হুশিয়ার
নজর মহম্মদ বললে–আলবত পোষ মানবে, জরুর পোষ মানবে, দুনিয়ার জেনানাকে পোষ মানালুম, আর এ তো নয়ি ছুকরি খাঁ সাহেব
বলে নজর মহম্মদ নিজের কাজে চলে গেল।
*
১৭৫৬ সালের ১৫ জুন। ষষ্ঠীপদর স্বপ্নটাই শেষপর্যন্ত বুঝি সত্যি হল। নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার ফৌজি-সেপাই বাগবাজারের মুখে হুড়হুড় করে ঢুকে পড়েছিল। নবাবের ফৌজ যে এমন করে সত্যি সত্যিই কলকাতায় এসে পড়বে তা হয়তো কেউই ভাবেনি। পেরিন-পয়েন্ট থেকে শুরু করে সমস্ত সুলতানুটি গোবিন্দপুরের লোকই তখন আবার পালাতে শুরু করেছে। একদিন যে কলকাতা জঙ্গল ছিল, একদিন বর্গির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গঙ্গা পেরিয়ে যারা ফিরিঙ্গিদের আওতায় এসে নিরাপদ নিশ্চিন্তে বসবাস শুরু করেছিল, বাড়িঘর বানিয়ে যে কলকাতাকে শহর বানিয়ে ফেলেছিল, সেই কলকাতা ছেড়েই আবার তারা গঙ্গা পেরিয়ে প্রাণ বাঁচাবার দায়ে বক্সবন্দরের দিকে পাড়ি দিলে।
ষষ্ঠীপদ আর বসে থাকতে পারল না চুপ করে। খানা-খন্দ পেরিয়ে একেবারে সোজা নবাবি ফৌজের তাবুর কাছে গিয়ে হাজির। তখন তিন দিন ধরে কেবল কামান দাগা আর গোলাগুলি চলছে।
হুজুর।
একেবারে সশরীরে গিয়ে হাজির সেপাইদের সামনে। বুকটা দুরদুর করে কাঁপছে। কিন্তু টাকা উপায় করতে গেলে এত ভয়-ভীত থাকলে চলে না।
হুজুর, আপনারা এখানে কেন মিছিমিছি কামান দাগছেন, এদিক দিয়ে তো কিছু সুবিধে হবে না হুজুরদের। শহরে ঢোকবার অন্য রাস্তা আছে, বাদামতলা দিয়ে ঢুকলেন না কেন? ডানকান সাহেবের বস্তির দিকটায় পল্টন ফল্টন কিছু নেই–একেবারে ফাঁকা
তুমি কে?
আমি হুজুর বেভারিজ সাহেবের খাস মুনশি ষষ্ঠীপদ আমরা বাহাত্তরে কায়েত
রাজা মানিকচাঁদের কাছে খবরটা গেল। নবাবের সঙ্গে তখন শলা-পরামর্শ চলছিল ভেতরে। মিরজাফর, মিরমদন, মোহনলাল সবাই মিলে আলোচনা চলছে। নবাব ফৌজের সামনের দিকের চার হাজার সেপাই, আর চারটে কামান বিকেল তিনটে থেকে রাত পর্যন্ত কেবল গুলিগোলা ছুড়ছে। কিন্তু কিছুই ফল হয়নি। ফিরিঙ্গিরাও সমানে গোলাগুলি ছুঁড়েছে। এরপর কী করা হবে সেই কথাই হচ্ছিল। এমন সময় ষষ্ঠীপদ গিয়ে হাজির।
রাজা মানিকচাঁদ বাইরে এসে লোকটার দিকে চেয়ে দেখলেন ভাল করে।
বললেন–তা তুমি তো ফিরিঙ্গি কোম্পানিতে চাকরি করো, ওদের তোড়জোড় কী রকম দেখেছ?
আজ্ঞে নস্যি নস্যি, কিচ্ছু নেই, আমার সাহেব তো ভয়ে একেবারে কাপড়েচোপড়ে হয়ে গেছে, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তাই খবরটা আপনাদের দিতে এসেছি হুজুর, আপনি যেন আমার নাম ফাস করে দেবেন না, তা হলে হুজুর আমাকে ওরা কেটে দু’খানা করে ফেলবে
রাজা মানিকচাঁদ বললেন–ঠিক আছে, তোমার কথা সত্যি হলে বকশিশ পাবে
হুজুর, তা হলে এক কাজ করুন, আমার ভয় করছে বড়, আমাকে একজন সেপাই দিয়ে একটু নিরাপদ জায়গায় পৌঁছিয়ে দিন, আপনাদের জয় নির্ঘাত
কথাটা বললে–বটে, কিন্তু মনে মনে ভয়ও ছিল। কেউ যদি দেখে ফেলে তা হলেই কর্ম ফতে। খানিক দূর এসেই বললে–সেপাইজি, তুমি এবার যাও, আমি এবার নিজেই ঠিক রাস্তা চিনে নেব
রাস্তা চেনার কথাটা বাজে। ওরকম বলতে হয়। সেপাইটা চলে যেতেই ষষ্ঠীপদ উলটোপথ ধরলে। কলকাতায় তখন নিশুতি। যে যেখান দিয়ে পারছে গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে। পালাক, সবাই পালাক। তাতেই ষষ্ঠীপদদের সুবিধে। সেখান থেকে সোজা একেবারে ফিরিঙ্গিদের কেল্লার গেটে এসে হাজির।
স্যার, বেভারিজ সাহেবের সঙ্গে একবার দেখা করতে দেবেন?
হু আর ইউ? তুমি কে?
কেল্লার গোরা পাহারাদাররা বড় কড়া পাহারা লাগিয়েছে তখন। ষষ্ঠীপদ বললে–আমি স্যার ষষ্ঠীপদ, ব্রাহ্মণ–গরিব বামুনের ছেলে, বেভারিজ সাহেবের সোরার গদির খাসমুনশি বড় বিপদে পড়ে আমার সাহেবকে একটা খবর দিতে এসেছি
কেল্লার ভেতরে তখন ক্যাপ্টেন ড্রেক, কুটস, ম্যানিংহ্যাম, হলওয়েল সবাই সলাপরামর্শ চালাচ্ছে। নবাবের ফৌজি সেপাই কত, তাই নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। হোমে ডেসপ্যাঁচ পাঠিয়ে দিয়েছে হলওয়েল সাহেব। হয়তো এই-ই শেষ। হয়তো চিরকালের মতো ক্যালকাটার কুঠি উঠিয়ে দিতে হবে। শেষপর্যন্ত ম্যাড্রাস গিয়েই সেটেল করতে হবে। ঠিক এমন সময় ষষ্ঠীপদ গিয়ে হাজির।
কী মুনশি? এত রাত্তিরে তুমি? আমি ভাবলুম, তুমিও পালিয়ে গেছ?
সেকী হুজুর, আপনার নুন খাই, আপনার সঙ্গে আমি নিমকহারামি করতে পারি কখনও? আপনাকে তো বলেছি হুজুর, আমি খাঁটি বামুন, আমার পইতে আছে। রোজ গঙ্গামাটি দিয়ে সে-পইতে পরিষ্কার করি, আমি কি আপনাকে ছেড়ে পালাতে পারি হুজুর কখনও?
কিন্তু কী খবর? এখন আমরা খুব ব্যস্ত আছি…।
