না।
তা হলে আরক?
আরক? আরক আবার কী জিনিস!
নজর মহম্মদ বললে–চকবাজারের সারাফত আলির দোকানের আরক বড় বঢ়িয়া চিজ বেগমসাহেবা, খেলে দিল তর হয়ে যায়, ভাল নিদ ভি আসে, তবিয়ৎ ভি আচ্ছা হয়, হুকুম হয় তো বান্দা এনে দিতে পারে বেগমসাহেবাকে।
মরালী বললে–না দরকার নেই
নজর মহম্মদ কিন্তু ছাড়ার পাত্র নয় তবু। বললে–বান্দার নাম নজর মহম্মদ, বেগমসাহেবার জরুরত হলে বান্দাকে যখন খুশি এত্তেলা দেবেন, বান্দা হাজির থাকবে–
মরালী বললে–আমার কিছু দরকার নেই তুমি যাও এখন
নজর মহম্মদ চলেই যাচ্ছিল হয়তো। কিন্তু মরালী আবার ডাকল। বললে–রাত্তিরে আমি বাতি নিভিয়ে শোব? কেউ বিরক্ত করতে আসবে না তো? দরজায় খিল দিয়ে দেব?
জি হা বেগমসাহেবা। বেগমসাহেবা মজেসে নিদ যাবেন, কেউ ঘরে আসবে না
তারপর কী যে হল। কৌতূহলটা আর চেপে রাখতে পারলে না মরালী। জিজ্ঞেস করলে তোমাদের নবাব? নবাব কোথায় তোমাদের?
নজর মহম্মদ বললে–জাঁহাপনা তো লড়াইতে গেছেন বেগমসাহেবা, ফিরিঙ্গি দুশমনদের সঙ্গে লড়াই করতে গেছেন। লড়াই ফতে করে জাঁহাপনা ফিরে আসবেন–
কবে লড়াই শেষ হবে?
আগে লড়াই ফতে হোক বেগমসাহেবা। দু-তিন রোজ লাগবে ফতে হতে। খবর এসেছে কলকাতা শহর পুড়িয়ে দিয়েছেন জাঁহাপনা। ফিরিঙ্গি দুশমনদের কলকাতা থেকে তাড়িয়ে কালাপানি পার করে দিয়েছেন।
মরালী একটু থেমে বললে–এখানে আর কারও গলা শুনতে পাচ্ছিনা, এখানে কি আর কেউ থাকে? অন্য বেগমরা?
জি থাকে। পেশমন বেগম আছে, নুর বেগম আছে, তক্কি বেগম আছে, গুলসন বেগম আছে, নানিবেগম আছে, সবাই আছে এখানে। এ তত বেগমমহল বেগমসাহেবা। বেগমসাহেবাকে যে-মহলে রেখেছি এটা আলখ মহল, এখানে ফিরিঙ্গিদের মেমসাহেবরা ছিল, ওয়াটস মেমসাহেব, কলেট মেমসাহেব সবাই এখানে নবাবের হেফাজতে ছিল। এর ওধারে ঘসেটি বেগমসাহেবা আছে
মরালী জিজ্ঞেস করলে তা আমাকে আলাদা মহলে রাখলে কেন তোমরা?
সে খোজাসর্দার পিরালি খাঁ জানে বেমসাহেবা। মেহেদি নেসার সাহেবের হুকুম
মেহেদি নেসার সাহেব কে?
আমাদের নবাবের পেয়ারের দোস্ত।
এর পরে আর কিছু কথা জানবার ছিল না। মরালী কী জিজ্ঞেস করবে বুঝতে পারলে না। নজর মহম্মদ দাঁড়িয়ে ছিল চুপ করে।
আচ্ছা, তোমাদের এখানে বাইরের লোক এর ভেতরে আসতে পারে? আসবার নিয়ম আছে?
নজর মহম্মদ জিভ কাটলে। বললে–নেহি বেগমসাহেবা, বাইরের লোক, বাইরের মানা ভেতরে আসা গুনাহ–এলে কোতল হয়ে যায়
মরালী কথাটা শুনে শিউরে উঠল। নজর মহম্মদ আরও বললে–শুধু পাঞ্জা থাকলে জেনানারা আর খোজারা আসতে পারে। নানিবেগম খুব কড়া মালকিন পিরালি ভি বড়া কড়া খোজাসর্দার–
কথাগুলো খুব মোলায়েম করে বললে–বটে নজর মহম্মদ, কিন্তু মনে হল যত মোলায়েম করে বললে–সে, জিনিসটা তত মোলায়েম নয়।
আচ্ছা তুমি যাও এখন।
নজর মহম্মদ কুর্নিশ করে চলে গেল। চলে যাবার পরে মরালী আস্তে আস্তে ঘরটা থেকে বেরোল। মসজিদ থেকে বেরোবার পর ঘরে এসে এদের দেওয়া শাড়ি বদলে নিয়েছে। এরা শাড়ি দিয়েছে, ঘাগরা দিয়েছে, ওড়নি দিয়েছে। বাক্স-ভরতি পোশাকআশাক দিয়েছে। একজন বাদি এসে সব গুছিয়ে দিয়ে চলে গেছে। হাতের কাছে একটা ঘোট ঘণ্টা রেখে দিয়ে গিয়েছে। বলে গিয়েছে-ওটা বাজালেইনাকি বাঁদিটা আসবে। কিন্তু আর কাউকে তখন ভাল লাগছিল না মরালীর। ছোটবেলা থেকে কেবল জীবনে বৈচিত্র্য খুঁজত সে। হাতিয়াগড়ের ছোট গ্রামের মধ্যেই ছাতিমতলার ঢিবিটার ওপর দাঁড়িয়ে দূরের আকাশের দূরত্ব মাপতে চাইত। নদীর জলে সাঁতার দিয়ে জলের তলায় পৌঁছোতে চাইত। রাস্তার লোকদের অকারণে রূঢ় কথা বলে আঘাত দিয়ে মজা দেখত। আজ ঘটনাচক্রে একেবারে বৈচিত্র্যের চুড়ায় এসে পৌঁছিয়েছে সে। এ-বৈচিত্র্যের শেষ দেখতে না পেলে যেন তার আর তৃপ্তি হচ্ছে না।
বাইরে টিমটিম করে একটা আলো জ্বলছে কোণের দিকে। সামনে উঠোনের ওপর জাফরি কাটা একটা দেয়াল। তার ওদিকে কী আছে দেখা যায় না। মাথার ওপর আকাশটা তারায় তারায় ভরে গিয়েছে। হঠাৎ কোন দিক থেকে যেন একটা আর্তনাদের শব্দ কানে এল। কে কাঁদছে এমন করে। যেন অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে কেউ। আবার অন্য দিক থেকে যেন গানের আওয়াজও ভেসে এল। উর্দু কি হিন্দুস্থানি গান বোধহয়।
মরালী আরও এগিয়ে গেল। এদিকটা যেন একটু ছাড়া-ছাড়া। আর ওপাশে যেন বেশ অনেক লোকের বাস। কোথাও বেশ মজলিস বসেছে গানের ফুর্তির আর হল্লার। অস্পষ্ট আওয়াজ বটে। কিন্তু মনে হল আনন্দের ফোয়ারা চলেছে সেখানে। আবার ওদিক থেকে কান্নাটা বড় বুকফাটা হয়ে কানে এল। কেন এত কান্না? কীসের কান্না? কে কাঁদছে?
পায়ে পায়ে আরও এগিয়ে গিয়েছিল মরালী। হঠাৎ সামনে একটা মূর্তি দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল। কিন্তু কাছে আসতেই চেনা গেল। নজর মহম্মদ।
বেগমসাহেবা!
মরালী থমকে দাঁড়াল।
বেগমসাহেবার কিছু দরকার আছে? খানা? সরাব? আরক? পান? শরবত?
মরালী জড়োসড়ো হয়ে বললে–না—
কিছু দরকার থাকলে বান্দাকে এত্তেলা দেবেন বেগমসাহেবা! ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেই বান্দা বাঁদি সবাই হাজির হবে
মরালী আর এগোল না। আস্তে আস্তে পেছিয়ে এসে আবার নিজের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। তারপর বিছানাটার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে বালিশে মুখ গুঁজে দিলে। এ কোথায় এল সে! এখানে কি চিরকাল থাকতে হবে? এমনি করেই কি দিন কাটবে, রাত কাটবে? ওই কান্না শুনবে, আর গান শুনবে? এমনি করেই হাসি, গান, ফুর্তি, কান্না আর খানা, সরাব, আরক, পান,শরবত নিয়েই তার পৃথিবী চলবে? আর তারপর যখন লড়াই শেষ করে নবাব মুর্শিদাবাদে ফিরবে, তখন?
