সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানে নজর মহম্মদ কি বরকত আলিরা যখন আরক কিনতে আসে তখন লুকিয়ে লুকিয়ে আসে। বাইরে খুশবু তেলের কারবার। আড়ালে আরক। সারাফত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে কী রোগ, কার রোগ। নাম কী রোগীর। ওষুধকেই সারাফত আলি আরক বলে। হাকিমের কাছে গেলে বাইরের লোকের কাছে জানাজানি হবে বলে, নজর মহম্মদরা সারাফত আলির দোকানে আসে। লোকে ভাবে খুশবু তেল কিনতে এসেছে। অনেক রকম আরক আছে সারাফত আলির। সুজাকের আরক, আতশকের আরক।এমন আরক আছে যা একবার খেলে রোজ খেতে ইচ্ছে করে।
নজর মহম্মদরা নতুন বেগমদের সেই আরকই খাওয়াবার চেষ্টা করে। একবার ধরাতে পারলে তখন আর ছাড়বার উপায় নেই, তখন খোজাদের খোশামোদ করতে হয়। কাছে এসে বলে-নজর, আরক ফুরিয়ে গেছে, আর চারটে গুলি এনে দে তুই
সারাফত জিজ্ঞেস করে কী হয়েছে বেগমসাহেবার?
নজর মহম্মদ বলে–কী জানি মিঞাসায়েব, বেগমসায়েবার দেমাগ খারাপ হয়ে গেছে, বিড়বিড় করছে হরবখত–
বুঝেছি, মালেখুল্লিয়া-দেমাগি হয়েছে
কী করে এমন হল মিঞাসায়েব?
সারাফত বলে–সওদা ধাতুতে দেমাগ ভারী হয়ে গেছে–এই আরকেই আরাম মিলবে–যা
কী কয়েকটা বড়ি দেয় সারাফত আলি, আর দাম দিয়ে ভেতরে নিয়ে চলে যায় নজর মহম্মদ। তারপর সে-রোগ সারল কি সারল না তার আর কেউ খবর রাখে না।
মরালী যেদিন প্রথম এল তার পরদিন নজর মহম্মদ দোকানে আসতেই সারাফত জিজ্ঞেস করলে কাল কোন বেগম এল রে তাঞ্জামে করে?
নজর মহম্মদ বললে–তুমি কী করে জানলে মিঞাসায়েব?
আমি সব জানি। আমার খুলিতে যে একটা কাফেরবাবু থাকে, সেই তো সঙ্গে করে নিয়ে এল দেখলুম
নজর মহম্মদ বললে–লস্করপুরের তালুকদার কাশেম আলির ছোটি লেড়কি। বাপ মরে যাবার পর হারেমের বেগম কনবার শখ হয়েছে
কী নাম হল বেগমসাহেবার?
মরিয়ম বেগম।
আরক খাবে না?
নজর মহম্মদ বললে–না মিঞাসায়েব, এখনও নয়া কিনা, আরক খেতে শেখেনি, আমি পুছেছিলাম, বললে–না, আরক খাই না
সারাফত আলি পাকা গোঁফদাড়ির মধ্যে একটু হাসল। বললে–প্রথম প্রথম তো কেউই খায় না, পরে আবার ওই মরিয়ম বেগমই আরকের খাতিরে তোকে খুশামুদ করবে, দেখে নিস
কথাটা নজর মহম্মদ জানে। ওই পেশমন বেগম, গুলসন বেগম, কেউই আরক খেতে চায়নি প্রথমে। এখন সবাই সারাফতের আরকের বাদি হয়ে গেছে। আর না হলে বেগমসাহেবাদের রাতই কাটে না। প্রথম প্রথম মরালী এসব কিছুই জানত না। প্রথম দিন একটু কৌতূহল ছিল, একটু ভয়ও ছিল। কোথায় কী রকম অবস্থায় কাটাতে হবে, কী করবে, কেমন করে দিন কাটবে, কিছুই জানা ছিল না। হাতিয়াগড় একরকম আর মুর্শিদাবাদ আর এক রকম। নিজামত-হারেম, সে আরও নতুন জায়গা। পালকিটা চেহেল্-সুতুনের মধ্যে ঢুকে পড়তেই মনে হল যেন সবকিছু থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কোথায় এতক্ষণ সে বউ হয়ে বড়চাতরায় যাবে, তা না একেবারে চন্দ্র-সূর্যের চোখের আড়ালে এখানে এসে ঢুকল। পালকির দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরের দিকে দেখবার চেষ্টা করেছিল। যতক্ষণ কাটোয়ার রাস্তায় পালকি চলেছে ততক্ষণ কান্ত পাশে পাশে ছিল। ফাঁক দিয়ে যেটুকু দেখা যায়, চেয়ে চেয়ে দেখছিল। হয়তো রানিবিবি মনে করে কথা বলতে সাহস করেনি। তা ছাড়া ফৌজি-সেপাইরা ছিল সঙ্গে। তারাও কড়া পাহারা দিতে দিতে চলছিল। কেউ যেন না দেখে রানিবিবির দিকে। অথচ পালিয়ে যাবার কথা শুনেও বেশ খুশি হয়েছিল।
চল্লিশটা থামের নীচে চেহেল্-সুতুনের দরবার। এ-রাস্তাটা সেদিকে নয়। একেবারে কোথা দিয়ে ঢুকে কোন সুড়ঙ্গ দিয়ে একটা মসজিদের সামনে এসে থামল পালকিটা। তারপর কয়েকজন অচেনা লোক সামনে এসে মাথা নিচু করে কুর্নিশ করলে। পিরালিই ছিল খোজা সর্দার। সে-ই আসল। সে মসজিদের ভেতরে নিয়ে গেল। বুড়ো দাড়িওয়ালা একজন মৌলবিসাহেব বিড়বিড় করে কী সব উর্দু মন্তর পড়তে লাগল। মরালীর গায়ে দু-একবার জল ছিটিয়ে দিলে। তারপর পিরালিই নিয়ে গিয়ে একটা ঘরের মধ্যে পৌঁছিয়ে দিয়ে গেল।
তারপর?
তারপর তাকে কী করতে হবে তাও জানা ছিল না। এত বড় চেহেল্-সুতুন, কিন্তু কোথাও কোনও সাড়াশব্দ যেন নেই। সমস্ত বাড়িটা যেন নিঃঝুম হয়ে আছে। ঘরের ভেতর একটা বিছানা। মস্ত বড় বিছানা। পাশেই আতরদান, পানদান, গোলাপদান সাজানো। একটা আয়না। নিজের চেহারার ছায়া পড়েছে তাতে। এত বড় আয়না ছোটমশাইয়ের বাড়িতেও নেই। চৌকির ওপর একটা মস্ত রুপোর পিকদান। দেয়ালে কতকগুলো ছবি। মেঝের ওপর গালচে পাতা। পা রাখবার জন্যে বিছানার নীচেয় মখমলের পাপোষ। একটা খোঁজা এসে আতরদানে আতর সাজিয়ে দিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে গন্ধে ভুরভুর করে উঠল ঘরখানা। গোলাপদানে গোলাপফুল দিয়ে গেল। পানদানে পানের খিলি, এলাচ লবঙ্গ ডালচিনি দিয়ে গেল।
বেগমসাহেবা!
মরালী এতক্ষণ চুপ করে সব দেখছিল। এবার মুখ তুলে চাইলে।
বেগমসাহেবের খেদমতির জন্যে বান্দা হাজির। বেগমসাহেবা যখন মেহেরবানি করে যা হুকুম করবেন, বান্দা সব তামিল করতে তৈয়ার বলে লোকটা মাথা নিচু করে তিনবার মাথায় ডান হাতটা ঠেকিয়ে কুর্নিশ করলে।
মরালী বললে–আমার কিছু দরকার নেই
খানা?
মরালী বললে–না, আমার এখন খিদে নেই—
সরাব?
সরাব কী?
নজর মহম্মদ বললে–যাকে মদ বলে বেগমসাহেবা
