কিন্তু রানিবিবি না হয়ে সত্যি সত্যি যদি সেই মরালীই হয়, তখন? আর যদি মরালীই হয় তো আসল রানিবিবি কোথায়? হাতিয়াগড়ের জমিদারের সেই ছোট বউরানি? তাকে কোথায় রেখে দিয়েছে? তাকে তো আর বাড়িতে রাখতে পারবে না। তা হলে সবাই তো জেনে ফেলবে। তাকে তো নাটোরের রানি ভবানীর মতো কোনও আশ্রমে কি আখড়ায় লুকিয়ে রাখতে হবে। নইলে ডিহিদার রেজা আলি তো টের পেয়ে যাবে। টের পেয়ে গেলেই আবার ধরে আনবে। তখন তো মরালীকে ছেড়ে দিতে হবে। কিংবা এও হতে পারে, দুজনকেই ধরে রাখবে। দু’জনকেই চেহেল্-সুতুনে আটকে রাখবে।
হঠাৎ দূরে কোথায় ঘণ্টা বাজতে লাগল। ঢং ঢং করে দু’বার বাজল।
কেমন যেন সন্দেহ হল। তবে কি রাত দুটো বাজল নাকি! তবে কি ভোর হয়নি? সন্দেহ হতেই আবার নিজের আস্তানার দিকে ফিরল। নিজের ঝুপড়িতে আসতেই বুঝি শব্দ হয়েছে। শব্দ হতেই পাশের ঘর থেকে বাদশা চেঁচিয়ে উঠেছে কৌন?
আমি বাদশা, আমি কান্তবাবু
কোথায় গিয়েছিলেন বাবুজি?
বেড়াতে। আমি ভেবেছিলাম রাত বুঝি কাবার হয়ে গেছে। ঘণ্টা শুনে এখন খেয়াল হল।
বাদশা আর কিছু বলল না। কিন্তু খানিক পরে কান্ত আবার ডাকলে–বাদশা
জি!
কান্ত জিজ্ঞেস করলে–আচ্ছা বাদশা, তুমি চেহেল-সুতুনের অন্দরে কখনও গেছ?
এত রাত্রে এ-প্রশ্ন শুনে বাদশা বোধহয় অবাকই হয়ে গিয়েছিল। বললে–নেহি জি–নেহি গয়া কাহে?
মানে, তুমি কিছু জানো, ভেতরে কেমন করে জীবন কাটায় বেগমরা? মানে যে-সব হিন্দু বেগম ভেতরে যায় তাদের কি গোরুর মাংস খেতে হয়? ঘাগরাটাগরা পরিয়ে দেয়? মানে তাদের কি খুব কষ্ট?
বাদশার বোধহয় তখন খুব ঘুম পাচ্ছিল। কিংবা হয়তো কান্তর প্রশ্নটা বুঝতে পারল না।
কান্ত এ-ঘর থেকে আবার জিজ্ঞেস করল–মানে, ধরো হিন্দু সধবাদের জন্যে তো আর আলাদা রান্না করবে না তারা! তাই জিজ্ঞেস করছি। শেষ পর্যন্ত বোধহয় মদও খেতে হতে পারে, কী বলে?
কিন্তু ওদিক থেকে বাদশার আর কোনও উত্তর এল না।
কান্ত আবার জিজ্ঞেস করলে–ঘুমুলে নাকি? ও বাদশা, ঘুমিয়ে পড়েছ?
কোনও সাড়াশব্দ নেই। আর খানিক পরেই বাদশার নাক ডাকতে লাগল। তার পাশের ঘরে নেশার ঘঘারে সারাফত আলিরও নাক ডাকছে। দু’জনের নাক ডাকার শব্দে যদিই বা কান্তর একটু ঘুম আসার আশা ছিল, সেটুকুও চলে গেল। কান্ত পাশ ফিরে শুয়ে প্রাণপণে ঘুমোবার চেষ্টা করতে লাগল। প্রাণপণে সব ভুলে যাবার চেষ্টা করতে লাগল। রানিবিবির কথা, মরালীর কথা, নিজের দুর্দশার কথা–সমস্ত সমস্ত—
*
মেহেদি নেসার সাহেবের বন্দোবস্ত কিন্তু সব পাকা। পিরালি খাঁ-ও পাকা ওস্তাদ। বহুকাল থেকে কাজ করে করে আজ খোজাসর্দার এমনিতে হয়নি। বেশ কিছু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। নবাবের পর নবাব এসেছে, বেগমের পর বেগম এসেছে, তাদের সকলের মেজাজ-মর্জি বুঝে অনেক কষ্টে ঘাড়ের ওপর শিরটা খাড়া রাখতে হয়েছে। নইলে চেহেল্-সুতুনে শির খাড়া রাখতে পারা সোজা কথা নয়।
যখন নবাবরা লড়াই করতে যায়, তখনও হারেমের নিয়মকানুনের কোনও ইতরবিশেষ হয় না। তখনও ঘড়ির কাঁটায় কাজ চলে। মসজিদে আজান হাঁকে মৌলবি সাহেব। বাঁদিরা ঘুম থেকে উঠে গোসলখানায় গিয়ে মুখ হাত ধুয়ে তৈরি হয়ে নেয়। তখন বেগমদের নাস্তার বন্দোবস্ত করতে হয়। পেছন দিকের ঝিলের জলে ধোবিখানার ধোবারা তখন ঘাগরা শাড়ি-ওড়নিকাচুলি কাঁচতে শুরু করে। ইনসাফ মিঞা নহবতে আশোয়ারির তান ধরে। তারপর যত বেলা বাড়তে শুরু করে ততই সরগরম পড়ে যায় হারেমের ভেতরে। তোষাখানায়, মশালচিখানায়, বাবুর্চিখানায় হাঁকডাক পড়ে যায়। শহর মুর্শিদাবাদের ভেতরই আর এক শহরের ছোট্ট সংস্করণ গড়ে ওঠে তখন। সেখানেও কেনা-বেচা শুরু হয়, লেন-দেন আরম্ভ হয়। সেখানেও দেনা-পাওনা নিয়ে দর-কষাকষি চলে। জীবন, জন্ম, মৃত্যু, অর্থ, ঐশ্বর্য, বিলাসের দর কষাকষি। সেখানেও কেউ হারে কেউ জেতে। কেউ বেচে কেউ কেনে। কেউ জন্মায় কেউ মরে।
নবাবের জন্যে সবাই এখানে বিকেল থেকে সাজতে শুরু করে। দামি ঘাগরা পরে, কানে আতর দেয়, পায়ে ঘুঙুর বাঁধে, মাথায় বেণী ঝোলায়, আর লুকিয়ে লুকিয়ে আরক খায়। চকবাজারের সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকান থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে আরক কিনে আনে নজর মহম্মদ। সে-আরক খেলে সমস্ত শরীর চাঙ্গা হয়ে ওঠে। মনে হয় বুঝি একেবারে বেহেস্তে চলে গেছি সশরীরে। মনে হয় হারেমের মধ্যে আর বন্দি নই আমি, আমার পাখা গজিয়েছে দুটো, আমি উড়ে চলেছি হুরি-পরিদের মতো। তারপর শেষকালে যখন নবাব আর সত্যি সত্যি আসে না, তখন সেই নেশার ঘোরের মধ্যেই বরকত আলি কি নজর মহম্মদ বাইরের কোনও পেয়ারের লোককে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে চলে যায়। তারপর কোথা দিয়ে রাত কাবার হয়ে যায় তা আর টের পায় না কেউ।
হারেমের বেগমদের জীবন এমনি করেই চলে আসছে বরাবর। সেই মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে শুরু করে সুজাউদ্দিন, সরফরাজ, আলিবর্দি খাঁ পর্যন্ত একটানা। পুরনো চালেই হারেমের নিয়মকানুন বাঁধা। আলিবর্দি খাঁ’র সময়ে সে-চাল একটু কমেছিল নানিবেগমের জন্যে। কিন্তু আর ক’দিন। লড়াই করতে করতেই সারাটা জীবন কেটে গেছে তার। এবার এসেছে নাতি নবাব মনসুর-উল-মুলুক শা কুলি খান বাহাদুর মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা হেবাৎ জঙ আলমগির।
