একটা রাস্তার চৌমাথায় আসতেই ওধার থেকে হাঁক এল–কৌন? আমি।
আমি বললেও কিছু সুরাহা হল না। কোতোয়ালের লোক সামনে এগিয়ে এল। এসে অন্ধকারের মধ্যেই কান্তর মুখখানা ভাল করে পরখ করে দেখলে। তুম কৌন?
আমি কান্ত সরকার। নিজামতের চর
লোকটা আর কিছু বললে–না। শুধু জিজ্ঞেস করলে-কাহা যানা হ্যায়?
কান্ত বললে–বশির মিঞার বাড়িতে, নিজামতের কাজে
পাঠান নিশ্চয়ই লোকটা। জগৎশেঠজির মহিমাপুরের বাড়িতে যেমভিখু শেখ পাঠান, এও তেমনি। দিল্লি সাজাহানাবাদ আগ্রা থেকে সব বেছে বেছে পাঠানদের এনেছে কোতোয়ালের কাজে। এদের গায়েও যেমন জোর, মনেও তেমনি ভয়-ভীত কিছু নেই। হুকুম করলেই বুকের ওপর গুলি করতে পারে নির্বিচারে। এরা বর্গিদের দলেও কাজ করেছে, আবার মোগলদের দলেও আছে। কান্তর মতোই টাকা পেলে সকলের নিমক খেতে রাজি।
সদর কাছারির পাশে মনসুর আলি মেহের সাহেবের আস্তানা। তার বাড়িতেই বশির থাকে। এত ভোরে সেখানে হয়তো পাঠান পাহারাদার আছে। হয়তো ঢুকতে দেবে না। এত ভোরে না এলেই ভাল হত। কিন্তু মনটা কেবল ছটফট করছিল। বশিরের কাছে কথাটা শোনার পর থেকেই মনে হচ্ছিল যদি আর একবার কোনওরকমে রানিবিবির সঙ্গে দেখা করা যায়। যদি কোনওরকমে একবার চেহেল্-সুতুনের ভেতরে যেতে দেয় বশির মিঞা। কিন্তু ঢুকতে দেবেই বা কেন? বাইরের লোককে ঢুকতে দেখলে তো খোজারা কোতল করে ফেলবে তাকে। বাইরে থেকে দেখে তো কিছু বোঝা যায় না। অত বড় প্রাসাদ! মতিঝিল দেখেছে কান্ত, মনসুরগঞ্জ দেখেছে, হিরাঝিলও দেখেছে। কিন্তু চেহেলসুতুনের কথাটা ভাবলেই যেন ভয় লাগে। কত মানুষ, কত বেগম, কত রহস্য, কত রোমাঞ্চ জড়িয়ে আছে চেহেল সুতুনের সঙ্গে। কত গল্প শুনেছে কান্ত। ভেতরে শুধু মহলের পর মহল। কত ষড়যন্ত্র, কত চোখের জল নিয়ে গড়ে উঠেছে চেহেল্-সুতুন। মুর্শিদকুলি খাঁর আমলের বাড়ি। ইটের তৈরি। ভেতরে নাকি দরবার ঘর আছে। চল্লিশটা বড় বড় থামের ওপর ছাদটা দাঁড়িয়ে আছে। তারই তলায় দরবার করতেন মুর্শিদকুলি খাঁ। কালো পাথরের বিরাট একটা মসনদ। আকবরনগরের এক মিস্ত্রির তৈরি, বশির মিঞা বলেছিল–মুঙ্গেরের নামজাদা কারিগর বোখারার খাজা নজর নিজে তৈরি করেছিল মসনদটা। মুর্শিদকুলি খাঁর সঙ্গে সঙ্গে সব জায়গায় ঘুরেছে সেটা।
বশির মিঞা, বশির মিঞা
হঠাৎ একটা লাঠি ঠোকার শব্দ হল পাশে। বাড়িটার চারপাশে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিচ্ছিল কে একজন। কান্তর গলা শুনেই অন্ধকার থেকে ভূতের মতন সামনে এসে হাজির হয়েছে। লোকটা কান্তর আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বোধহয় চিনতে পারলে। বিশেষ কিছু জিজ্ঞেস করলে না। শুধু বললে–মিঞাসাহেব কোঠিতে নেই
কোথায় গেছে? কখন দেখা হবে?
এ-প্রশ্নটা অবান্তর। প্রশ্নটা করেই কান্ত নিজের ভুল বুঝতে পারলে। কে কখন কোথায় যাচ্ছে তা জিজ্ঞেস করতে নেই নিজামতের চাকরিতে। কারণ সবাই নিজের নিজের ধান্ধায় ঘুরছে। আর দিনকাল যা পড়েছে তাতে তো কেউ কাউকে বিশ্বাসই করে না। বিশ্বাস করা উচিতও নয়। কে কার সর্বনাশ করার কথা ভাবছে কে বলতে পারে। সবাই তো নিজের নিজের উন্নতির কথা ভাবছে। রেজা আলি ভাবছে কী করে কার সর্বনাশ করে, কাকে তোয়াজ করে ফৌজদার হওয়া যাবে। মিরজাফর ভাবছে কী করে মোহনলালকে খাটো করতে পারবে। উমিচাঁদ ভাবছে কী করে নবাবের বিরুদ্ধে ফিরিঙ্গিদের উসকে দিয়ে তাদের কাছ থেকে বেশি টাকা আদায় করবে। জগৎশেঠজি ভাবছে কী করে নবাবকে জব্দ করা যাবে। মুর্শিদাবাদের রাস্তার লোকগুলো পর্যন্ত সোজা করে কথা বলতে জানে না। সবাই যেন কথা চেপে যায়। অথচ কলকাতা এমন নয়। কেন যে এখানে এল চাকরি করতে! না এলেই ভাল হত। বড়চাতরায় গিয়ে নায়েব-নাজিরবাবুদের সেরেস্তায় কাজ নিলেই এর চেয়ে তার অনেক ভাল হত।
বশির মিঞা বলেছিল–এ হল শহর। মুর্শিদাবাদ, এ তো আর তোর কলকাতার মতো পাড়াগাঁ নয়
তা বটে। শহরের লোকগুলোই বোধহয় এমনি। এ-চাকরিটা ছাড়তে পারলেই হয়তো ভাল হত। শুধু শুধু একটি পাপ কাজ করতে হল। অবশ্য পাপটা তার নিজের নয়। কিন্তু যারই হুকুম হোক, এ-পাপের ভাগীদারও তো সে। এ-পাপের কিছু ভাগ তো তার গায়েও লাগবে। রানিবিবিকে চেহেল্-সুতুনের ভেতরে পৌঁছে দিয়ে আসা এস্তক মনটা কেমন ভারী হয়ে রয়েছে। কাজটা ভাল করেনি সে। মোটেই ভাল করেনি। রানিবিবি তো পালিয়েই যেতে চেয়েছিলেন তার সঙ্গে। তাকে নিয়ে সেদিন পালিয়ে গেলেই হত। কথার খেলাপ হত বটে। কিন্তু তার চেয়ে তো আরও বড় পাপ করলে তাঁকে এখানে নিয়ে এসে। রানিবিবিই তো পালিয়ে যাবার কথাটা তুলেছিলেন নিজে। কান্তরই শুধু সাহস হয়নি! আর কোতোয়ালের লোকজনও ঠিক সেই সময়ে সেখানে এসে পড়েছিল।
সারা মুর্শিদাবাদ শহরটাই আস্তে আস্তে টহল দিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল কান্ত। চেহেল্-সুতুনের পুব দিকে তোপখানা। সেদিকটায় শুধু যায়নি। আজ পাহারাদাররা ওদিকে কড়া পাহারা লাগিয়েছে। কাউকে ওদিকে যেতে দেখলেই নানান কথা তুলবে। তার পাশেই জাহানকোষা। বিরাট একটা কামান। তার ওপাশে গঙ্গা। গঙ্গার ধারে গিয়ে দাঁড়াল কান্ত। কিছুই ভাল লাগছে না। মনে হচ্ছিল এখুনি যদি একবার চেহেল্-সুতুনের ভেতরে গিয়ে রানিবিবির সঙ্গে দেখা করে আসতে পারত। রাত্রে কী খেলে, কী করে কাটালে, সব জানতে ইচ্ছে করছে। হিন্দুর জন্যে কি আর আলাদা রান্নার ব্যবস্থা করেছে! কান্ত থাকলে হয়তো কাটোয়ায় যেমন ব্যবস্থা করেছিল, সেই রকম ব্যবস্থা করতে পারত। তারপর শুধু কি খাওয়া? হয়তো রানিবিবিকে বেগমদের মতো ঘাগরা-ওড়নি পরতে হবে। হয়তো মদ খেতেও দেবে!
