বাবুজি।
বাদশার গলা।
কী রে বাদশা?
হুজুর, মালিক আপনাকে একদফে এত্তেলা ভেজিয়েছে।
ধড়মড় করে তাড়াতাড়ি উঠে সারাফত আলির কাছে যেতেই খুশবুর গন্ধতে কান্তর সমস্ত শরীর অসাড় হয়ে এল।
সড়ক দিয়ে কোথায় যাচ্ছিলি রে? তাঞ্জামে কোন বিবি ছিল? নবাব হারেমের মাল?
সে কথার উত্তর দিতেও যেন ঘেন্না হতে লাগল। চরের চাকরি করে বলে সারাফত আলি সাহেবও তাকে যেন তাচ্ছিল্য করতে শুরু করেছে। শুধু বললে–জি, মিঞাসাহেব!
সারাফত আলি বললে–জাহান্নমে যাবি, তা বলে রাখছি, কান্তবাবু। বেশক জাহান্নমে যাবি, দুশমনের লড়াই ফতে হলে ভাবিসনি জিন্দগি খুশ হয়ে যাবে, জিন্দগির লড়াই ফতে করতে পারিস তো তখন বুঝব তুই বাহাদুরের বেটা
আরও কিছু কথা হয়তো বলত সারাফত আলি সাহেব। কিন্তু নেশার ঝেকে তখন চোখ দুটো বুড়োর লাল জবাফুল হয়ে উঠেছে। বেশি কথা বলার হয়তো ক্ষমতাই নেই মিঞা-সাহেবের।
হঠাৎ ওপাশ থেকে বশির মিঞার গলা শুনে একটু অবাক হয়ে উঠল। বশির মিঞা আবার এত রাত্রে কী জিজ্ঞেস করতে এসেছে। রানিবিবিকে তো চেহেল্-সুতুনের হারেমে পৌঁছিয়েই দিয়েছে। আবার কাউকে আনতে হবে নাকি? একটা কাজ হাসিল হতে-না-হতে আবার একটা কাজ?
কী রে? কী করছিলি? আমি ভাবছিলুম ঘুমিয়ে গেছিস
তুই হঠাৎ? আবার কোনও কাজ আছে নাকি?
বশির মিঞা বলল–না রে, না।–তোর সঙ্গে একটা বাত আছে, এখানে কেউ নেই তো?
বলে ঘরটার চারদিকে দেখে নিলে। তারপর গলাটা নিচু করে বললে–একটা বাত বলি তোকে, আজকে যে রানিবিবিকে এনেছিস, ও আসলি রানিবিবি তো? নাকি দুসরা কাউকে পাঠিয়ে দিয়েছে?
কান্ত অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে–কেন?
তাই তো জিজ্ঞেস করছি তোকে।
কান্ত বললে–কেন? অন্য কোনও রানিবিবি এসেছে নাকি তার বদলে? অন্য কোনও মেয়ে?
আরে না, হাতিয়াগড়ের ডিহিদার রেজা আলি শালা বুড়বাক আছে। আমার ফুপাকে খপর পাঠিয়েছে। নাকি রানিবিবির বদলে হাতিয়াগড়ের রাজবাড়ির একটা নফরের ডপকা মেয়েকে পাঠিয়েছে। শোভারাম নাকী তার নাম, তারই নাকি মেয়ে। তুই কিছু জানিস? ফুপা আমাকে গালাগাল করছে। মেহেদি নেসার
সাহেব জানলে তো বেত্তমিজি করবে! জানিস কিছু তুই?
*
মনে আছে কান্ত সে-রাত্রে ঘুমোতে পারেনি। সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানের পেছন দিকে একটা ছোট ঘরে আস্তানা নিয়েছিল কান্ত। আস্তানাটা নামেই আস্তানা। ওর ভেতরে মানুষ কোনওরকমে থাকতেই শুধু পারে, বেঁচে থাকতে পারে না। কিন্তু সারাফত লোকটা ভাল। একজন গরিব মানুষকে দেখে দয়া করে থাকতে দিয়েছিল শুধু, কিরায়া নিত না। কতকগুলো কড়ির জার আর মাটির হাঁড়ি-কলসির গুদাম ছিল সেটা। সেটাই মালপত্র সরিয়ে কান্তকে থাকবার জন্য খালি করে দিয়েছিল। সেই অন্ধকার ঘুপসি ঘরের বিছানার ওপর চিতপাত হয়ে গা এলিয়ে দিয়ে আকাশ-পাতাল শুধু চষে বেড়িয়েছিল। যাকে সে রানিবিবি ভেবেছিল সেই-ই তা হলে শোভারামের মেয়ে! আশ্চর্য না আশ্চর্য! একবারও যদি জানতে পারত সে আগে। একবারও যদি কেউ কথাটা বলত তাকে।
ভোরবেলা বড় মসজিদের আজানের শব্দ শুনেই উঠে পড়ল কান্ত। সময় যেন আর কাটতে চায় না। যেন সূর্য আর উঠবে না চকবাজারে।
বশির মিঞা বলেছিল–রেজা আলি শালা ফৌজদার হতে চাইছে, বুঝলি! তাই মেহেদি নেসার সাহেবকে খুশামুদ করতে চাইছে এই করে
কান্ত বলেছিল–তা হলে কি আসল রানিবিবিই এসেছে?
আলবত! হাতিয়াগড়ের জমিনদারের এত বুকের পাটা হবে না যে ঝুটা মাল চালিয়ে দেবে, জমিনদারবেটা জানে যে নবাবের গোঁসা হলে তার জমিনদারিই লোপাট হয়ে যাবে।
কান্ত হঠাৎ বললে–কিন্তু ভাই, আমার মনে হচ্ছে হয়তো ডিহিদারের কথাই ঠিক, ওরা বোধহয় শোভারামের মেয়েকেই পাঠিয়ে দিয়েছে ষড়যন্ত্র করে
দুর, দুর–ওসব রেজা আলির শয়তানি রে! রেজা আলিকে তুই তো চিনিস না। শালা খুব জাঁহাবাজ লোক, কেবল ফৌজদার হতে চাইছে কেরামতি দেখিয়ে
বশির মিঞা চলে যাবার পর সমস্ত রাত ধরে কান্ত কেবল ভেবেছিল। ও রানিবিবি না মরালী! কে? কাকে সঙ্গে করে এনেছে সে? দু’জনের কাউকেই দেখেনি আগে। শোভারামের মেয়ের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধই হয়েছিল শুধু। সেই পর্যন্ত। ঘটক সচ্চরিত্র পুরকায়স্থর মুখের কথা শুনেই বিয়েটায় রাজি হয়েছিল। শুধু শুনেছিল খুব শৌখিন মেয়ে, ঠোঁটে আলতা লাগায়, দিনরাত তাম্বুল-বিহার দিয়ে পান খায়, পাশা খেলতে ভালবাসে। তার বেশি আর কিছু শোনেনি মরালীর সম্বন্ধে। আর হাতিয়াগড়ের ছোটরানি? তার সম্বন্ধেও যা কিছু শুনেছিল সেসবই উদ্ধব দাসের কাছ থেকে। খুব নাকি রসিক বউ। উদ্ধব দাসের মুখে রসের গান শুনতে ভালবাসে। তা ছোটরানিও নিশ্চয়ই সুন্দরী। নইলে এক বউ থাকতে আবার বিয়ে করতে গেলেন কেন ছোটমশাই? গরিবঘর থেকে কেন আনতে গেলেন আবার একটা বউ? সত্যিই কে ও? কাকে এনেছে সে সঙ্গে করে? রানিবিবি, না মরালী?
তখনও সারাফত আলির নাক ডাকছে পাশের ঘর থেকে। বড় মসজিদ থেকে আজানের শব্দ কানে আসছে। কান্ত উঠল বিছানা ছেড়ে। তারপর রাস্তায় বেরোল। কান্তর ধারণা ছিল এ সময়ে চকবাজারের রাস্তায় এমনিতে কেউ থাকে না। এত ভোরে কেউ ঘুম থেকে ওঠে না। কিন্তু তবু দেখা গেল রাস্তায় রাস্তায় কোতোয়ালের লোক পাহারা দিচ্ছে। কাল মুর্শিদাবাদে এসেই শুনেছিল,নবাব ফৌজ নিয়ে লড়াই করতে গেছে। মিরবকশি গেছে, বকশি আহাদিয়ান গেছে, বকশি সুবাজারাও সবাই গেছে। জমাদার, হাজারি কেউই বাদ নেই। ফৌজখানা একেবারে ফাঁকা রেখে গেছে। শুধু আছে কোতোয়ালের লোকরা নগরের তদারকিতে। পেছন থেকে যদি কেউ হঠাৎ মুর্শিদাবাদে হামলা করে তার জন্যেই এই কড়া পাহারা।
