হঠাৎ অনেক দূরে মনে হল যেন আকাশের গায়ে খুব মেঘ করেছে। কেমন হল? এই দুপুরবেলা কি ঝড় উঠবে নাকি? তাই সচ্চরিত্র পালাচ্ছিল? অনেকক্ষণ দেখতে দেখতে হবে যেন খানিকটা স্পষ্ট হল। প্রথমে মনে হয়েছিল মেঘ। তা নয়। আসলে হাতির পাল। হাতিগুলো সার সার এগিয়ে আসছে। তারপর ঘোড়ার সার। তারপর হাজার হাজার সেপাই। পাটুলির জনকয়েক লোক রাস্তায় নেমে দেখতে এসেছিল। তারাও অবাক।
ও দাসমশাই, দাঁড়িয়ে দেখছ কী? নবাব আসছে, পালিয়ে যাও গো
উদ্ধব দাস জিজ্ঞেস করলে–কেন? পালাব কেন? কী করেছি আমি?
ঠিক আছে, বুঝবে মজাটা। নবাব লড়াই করতে যাচ্ছে কলকাতায় গাঁয়ে যা পাবে সব নেবে, আর কিছু আস্ত রাখবে না–
সত্যিই তাই। পাটুলির লোকরা সব গ্রাম ছেড়ে নবাবের রাস্তার উলটোদিকে একেবারে গঙ্গার ওপারে গিয়ে হাজির। উদ্ধব দাস ঠায় সেখানে পঁড়িয়ে রইল। নির্জন জনহীন রাস্তা দিয়ে নবাবের সৈন্যরা এগিয়ে চলেছে। হাতি, ঘোড়া, কামান, বন্দুক, সেপাই সার সার চলেছে। মুর্শিদাবাদ থেকে সেই কোন রাত থাকতে বেরিয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে চলেছে বাংলাদেশের নবাব। এবার সবাই দেখুক নবাবেরও ক্ষমতা আছে, নবাবেরও সৈন্যসামন্ত আছে। ডাচ, পর্তুগিজ, ফরাসিরাও একটু শিক্ষা পাক। এ-দেশটা যে নবাবের তার প্রমাণ না দিলে সবাই বড় বেড়ে উঠবে। এই সময়েই সকলকে শিক্ষা। দিয়ে দেওয়া ভাল। বুড়ো নবাব আলিবর্দি খাঁ সাহেব যা পারেনি, নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা তাই পেরে দেখিয়ে দেবে।
আর শুধু পাটুলিই নয়। কলকাতাতেও হুলস্থুল কাণ্ড বেধে গেছে। কেল্লার ভেতরে হলওয়েল সাহেব তখন হোমে আর্জেন্ট ডেসপ্যাঁচ লিখছে–এই-ই হয়তো আমাদের শেষ ডেসপ্যাঁচ। আমরা অনেক রকম করে লড়াই ঠেকিয়ে রাখবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হল না। শুনছি নবাব আর্মি নিয়ে কলকাতার দিকে আসছে। এদিকে চিফ স্পাই রাজারাম সিং একটা চিঠি পাঠিয়েছিল উমিচাঁদের কাছে। সে-চিঠি আমরা ধরেছি। সে-চিঠিতে উমিচাঁদকে কলকাতা ত্যাগ করে পালিয়ে যাবার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছিল। উমিচাঁদ লোকটা একটা আস্ত স্কাউড্রেল। তাকে আমরা অ্যারেস্ট করে ফোর্টে রেখে দিয়েছি। তার প্রপার্টি যাতে কলকাতা থেকে সরিয়ে ফেলতে না পারে সেজন্যেও আমরা কুড়ি জন গার্ড বসিয়েছি তার বাড়িতে। উমিচাঁদের চিফ বরকন্দাজ-জমাদার জগমন্ত সিং সে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল, পাছে আমাদের হাতে পড়ে। বাড়ির জেনানার ভেতরে তেরোজন লেডিকে খুন করে। ফেলেছিল নিজের হাতে, পাছে আমরা তাদের মলেস্ট করি। শেষকালে নিজেও সে সুইসাইড করতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমরা তা করতে দিইনি। তাকে ধরে ফেলেছি। ওদিকে রাজা রাজবল্লভের ছেলে কৃষ্ণবল্লভকেও অ্যারেস্ট করে রেখে দিয়েছি। কারণ ইন্ডিয়ানদের বিশ্বাস নেই। এরা ভয়ানক বিশ্বাসঘাতক লোক। আর বাগবাজারের খালের উলটোদিকে হুগলি-রিভারের ওপর একটা জাহাজে আঠারোটা কামান সাজিয়ে রেখেছি। দেখি কী হয়। আমরা যুদ্ধ করবই। এত কষ্ট করে এসে এখান থেকে আমরা সহজে এখন হটব না। কেবল মুশকিল হয়েছে একটা। আমাদের সবই দেশি সোলজার। তাদের ওপর ভরসা, আর ম্যাড্রাস থেকে কিছু ইউরোপীয় সোলজার চেয়ে পাঠিয়েছি। আমাদের আর্মিতে বারোজন সোলজার শুধু ইউরোপীয়ান। তাদের সবাইকে পেরিং-পয়েন্টের পাঁচিল আর ব্রিজ গার্ড দেবার জন্য রাখা হয়েছে। দেখা যাক কী হয়। সবই অনিশ্চিত। যদি আমরা টিকে থাকি তো আবার ডেসপ্যাঁচ পাঠাব। গড সেভ দি কিং।
*
মুর্শিদাবাদের চকবাজারেও তখন সব গোলমেলে অবস্থা। সকালবেলাও কেউ কিছু জানত না। ভোররাত্রে কখন কী ঘটছে, কেউ কিছু জানে না। বেলা হলে তখন জানা গেল। সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানে মৌতাত তখন বেশ জমে উঠেছে। তামাকের সঙ্গে আফিম মেশালে আর তার সঙ্গে আগরবাতি জ্বালিয়ে দিলে যা মৌতাত হয় তার মজা সারাফত আলিই জানে!
সন্ধেটা কেটে রাত বাড়ল। তখন সারাফত আলির বেশ ঘোর লেগেছে।
হঠাৎ ডাকলে–বাদশা
কান্তও এতদিন ধরে কত রাস্তা হেঁটে সবে একটু বিশ্রাম করবে বলে নিজের আস্তানায় এসে ঢুকেছিল। অন্ধকার ঝুপড়ি ঘর। ঘরের না আছে শ্রী না আছে ছাদ। তা হোক, তবু তো একটা আশয়। আজ হয়তো এখানে আসতেই হত না শেষপর্যন্ত। কায়োয়ায় রানিবিবির সঙ্গে পালিয়ে গেলেই হয়তো ভাল হত। অন্তত রানিবিবিকে এই অপমানের হাত থেকে তো বাঁচানো যেত। উদ্ধব দাসের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবার পর থেকেই মনটা কেমন বিকল হয়ে গিয়েছিল। শেষপর্যন্ত কাটোয়ার ডিহিদার সাহেব এসে যাওয়াতে আর পালিয়ে যাওয়া হয়নি। তারপর থেকে রানিবিবির সঙ্গে কথাও হয়নি। দেখাই হয়নি তো কথা হবে কী করে। ডিহিদার সাহেব নিজে তাগাদা দিয়ে সেপাই দিয়ে কড়া পাহারা দিতে বলে মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দিলে।
নিজের ময়লা বিছানার ওপর শুয়েও ভাল করে ঘুম এল না। চকবাজারে ঢুকেই লড়াইয়ের খবরটা শুনেও বেশ খারাপ লেগেছে। বেভাজির সাহেবের সেই সোরার গদিটার কথাও মনে পড়ল। যদি সে-গদি নবাবের কামানের গোলা লেগে পুড়ে যায়! ক’টাই বা সৈন্য আছে ফিরিঙ্গিদের। নবাবের সঙ্গে কেন ঝগড়া করতে গেল। আহা, ষষ্ঠীপদর চাকরিটাও চলে যাবে। কান্ত এখন মুনশি থাকলে কান্তর চাকরিটাও চলে যেত। শুধু চাকরি নয়, প্রাণটাও হয়তো যেতে সেই সঙ্গে সঙ্গে।
