যশোর নগর ধাম
প্রতাপ আদিত্য নাম
মহারাজ বঙ্গজ কায়স্থ।
নাহি মানে পাতশায়।
কেহ নাহি আঁটে তায়
ভয়ে যত ভূপতি দ্বারস্থ।
তার খুড়া মহাশয়।
আছিল বসন্ত রায়,
রাজা তারে সবংশে কাটিল।
তার বেটা কচু রায়,
রানি বাঁচাইল তায়,
জাহাঙ্গিরে সে-ই জাঁনাইল।
ক্রোধ হইল পাতশায়
বান্ধিয়া আনিতে তায়
রাজা মানসিংহে পাঠাইলা।
বাইশি লস্কর সঙ্গে
কচু রায় লয়ে বঙ্গে
মানসিংহ বাঙ্গালা আইলা।
কচু লেখা। নিমকহারাম মানসিংহের দাস ভবানন্দকে দেবতা বানিয়ে কী লাভ হল শুনি তোর? সত্যি। কথা লিখলে তোকে উপাধি দেবে না বলে? ছাই, ছাই, উপাধির মুখে ঝাটা মারি! আমি কাকে ভয় করি গো? আমার কাউকে ভয় করতে বয়ে গেছে। আমি লিখব সত্যি কথা। আমি লিখব আর একখানা অন্নদামঙ্গল।
এমনি করেই পাটুলির রাস্তা দিয়ে চলছিল উদ্ধব দাস। হঠাৎ সামনে কাকে দেখে থমকে গেল। কে গো তুমি মশাই। তোমাকে চেনা চেনা ঠেকছে যেন?
উলটো দিক দিয়ে আর একটা নোকও আসছিল। হাতে কতকগুলি পুঁথিপত্র। উদ্ধব দাসকে দেখে মুখটা আড়াল করে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। কী গো? অমন করে আমাকে দেখে পালিয়ে যাচ্ছ কেন?
লোকটা এবার দৌড়োত লাগল। উদ্ধব দাসও দৌড়োতে লাগল। ধরো ধরো ওকে। ধরো!
চিৎকার শুনে খেতের কিছু লোক দৌড়ে এসেছে। তারাই ধরে ফেললে লোকটাকে! লোকটা বুড়ো মতন। ধরতেই কেঁদে ফেলেছে একেবারে হাউহাউ করে। একেবারে অঝোর ধারায় কান্না।
আরে, সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ না?
চিনতে পেরেছে উদ্ধব দাস। এই সচ্চরিত্রই ঘটকালি করেছিল বিয়েটার।
আজ্ঞে আমাকে ছুঁয়ে দিলেন? আমার যে জাত গেছে! আমার জাত কুল-পেশা সব যে গেছে, আমার বউ-ছেলে-মেয়ে সব গেছে–
বলে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল সচ্চরিত্র।
উদ্ধব দাস হেসে উঠল হো হো করে। বললে–কেন গো? কীসে গেল তোমার জাত, শুনি?
সচ্চরিত্র বললে–আমাকে ম্লেচ্ছ-মাংস খাইয়ে দিয়েছে গো ধরে-বেঁধে; আমি খেতে চাইনি গো, জোর করে আমার মুখে পুরে দিয়েছে…
পাটুলির যে-লোকগুলো এতক্ষণ শুনছিল তারা কানে আঙুল দিলে। আস্তে আস্তে সরে পড়বার চেষ্টা করতে লাগল।
আমাকে ছেড়ে দাও গো বাবাজি, আমাকে ছেড়ে দাও
উদ্ধব দাস বললে–তোমার জাত তো বড় ঠুনকো পুরকায়স্থ মশাই, আমি তো যেখানে-সেখানে যা-তা খাই, আমার তো জাত যায়নি। এই তো তোমাকে আবার ঘূচ্ছি, আমার তো জাত যাচ্ছে না, কই
তা হলে আমার কী হবে বাবাজি! আমাকে যে মুর্শিদাবাদের মসজিদের ইমামসাহেব নিজের বাড়িতে রেখে সারিয়ে তুলেছে, আমি যে সেখানে তিন রাত্তির কাটিয়েছি সবাই যে সেকথা জানে। আমার কী হবে?
উদ্ধব দাস বললে–কলা হবে, কচু হবে–
তুমি তো বললে–কলা হবে, কিন্তু আমাকে দিয়ে যে কেউ আর ঘটকালি করাবে না, আমি কী খাব? আমি যে ঈশ্বর কালীবর ঘটকের পৌত্র, ইন্দীবর ঘটকের পুত্র…
উদ্ধব দাস বললে–আমাকে কে খাওয়ায়? আমি কার পুত্র? আমি কার পৌত্র?
সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ খানিকক্ষণ হাঁ করে চেয়ে রইল উদ্ধব দাসের দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করলে তা হলে গাঁয়ের লোক আমাকে তাড়িয়ে দিলে কেন? সিদ্ধান্তবারিধি মশাই আমাকে একঘরে করলেন কেন? আমার বউ-ছেলে-মেয়ে আমাকে বাড়িতে ঢুকতে দিলে না কেন? আমি অপরাধ না করলে কি শুধু শুধু তারা আমাকে নাকাল করলে?
উদ্ধব দাস হঠাৎ গান গেয়ে উঠল
তারা, আর কী ক্ষতি হবে।
তুমি নেবে যবে, সবই নেবে, প্রাণকে আমার নেবে।
থাকে থাকবে, যায় যাবে, এ-প্রাণ গেলে যাবে।
যদি অভয় পদে মন থাকে তো কাজ কী আমার ভাবে ।
তুমি নিজেই যদি আপন তরি ডুবাও ভবার্ণবে।
আমি ডুব দিয়ে জল খাব তবু, অভয় পদে ডুবে
সচ্চরিত্র পুরকায়স্থর হাতটা তখনও ধরে আছে উদ্ধব দাস। হঠাৎ একটা ঝটকা মেরে সচ্চরিত্র নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলে। তারপর এক দৌড়ে দূরে পালিয়ে গেল। চেঁচিয়ে বলতে লাগল–আমাকে পাগল পেয়েছ বাবাজি, আমি কি পাগল? আমার সংসারধর্ম নেই? আমাকে পাগল করতে
উদ্ধব দাস হেসে উঠল। চেঁচিয়ে উঠল। বললে–সবাই পাগল গো, সবাই পাগল, এ সংসারে সবাই পাগল, কেউ বিষয়-পাগল, কেউ মেয়েমানুষ-পাগল, কেউ নাম-পাগল। পাগলা বদনাম শুধু এই পাগল উদ্ধব দাসের
কিন্তু যার উদ্দেশে বলা সে তখন পাঁইপাঁই করে দৌড়োচ্ছে। উদ্ধব দাস হেসে উঠল খানিকটা সেই দিকে চেয়ে চেয়ে! গান গাইলেই পাগলামি বলে। আসলে সবাই পাগল হয়ে গেল। দেশটা পাগলে ভরে গেল, তবু উদ্ধব দাসকেই সবাই পাগল ভাবে। তাজ্জব দেশ প্রভু, তাজ্জব দেশ।
সারাদিন খাওয়া হয়নি উদ্ধব দাসের। মাথার ওপর রোদ উঠছে। বড় চড়া রোদ। কাঁধের চাদরটা মাথায় বেঁধে নিয়ে আবার পায়ে হাঁটা দিলে। কিন্তু কিছু দূর যেতেই হঠাৎ আবার কার দপদপ পায়ের শব্দ হল। পেছন ফিরেই দেখে সচ্চরিত্র আবার সেই দিকেই দেীড়োতে দৌড়োতে আসছে। একেবারে ঊর্ধ্বশ্বাসে উদ্ধব দাসের দিকেই দৌড়ে আসছে
উদ্ধব দাস একটু থমকে দাঁড়াল। সচ্চরিত্র কাছাকাছি আসতেই বললে–কী গো, আবার কী হল?
সচ্চরিত্র সে-কথার উত্তর না দিয়ে পাইপাই করে তখনও সামনের দিকেই দৌড়ে আসছে—
কী হল গো? আবার ফিরলে কেন?
এবার সচ্চরিত্র উদ্ধব দাসকে পাশে রেখে সোজা দৌড়োচ্ছ। কথার উত্তর দিলে না। অবাক কাণ্ড! এমন কাণ্ড তো করে না লোকটা! সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে গেল নাকি নোকটা! দেখতে দেখতে দূরে গাছপালা মাঠের ধুলোর মধ্যে সচ্চরিত্র অদৃশ্য হয়ে গেল। সত্যিই অবাক হবার মতো ঘটনা। পেছনে তো কেউ তাড়া করছে না। তবে?
