কিন্তু বড় রানিবিবি তো ছিল হুজুর। সে তো দুশমনি করতে পারে? আর ওই ঝি-টা! দুগ্যা! ওই দুগ্যামাগিটি হুজুর কুটনি! ও সব পারে। ভেজাল মালকে আসল মাল বলে অনায়াসে চালিয়ে দিতে পারে! নইলে শোভারাম হঠাৎ পাগল হয়ে যাবে কেন, হুজুর, তাই বলুন!
রেজা আলি ডিহিদার মানুষ। হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় কাজ করে না কখনও। অনেক দিন থেকে ডিহিদারি করে আসছে। আরও প্রথম জীবনে মুর্শিদাবাদের নিজামতে আমিন কাছারি ছিল। তারপর নিজের বুদ্ধির কেরামতিতে একদিন দারোগা-কাছারি হয়েছিল। তারপর ধাপে ধাপে হুজুর-নবিস, খাসনবিস, মসরেফ, মুস্তোফি হয়ে শেষ পর্যন্ত ডিহিদার। এর পরে যদি ফৌজদার হতে পারে তবেই জিন্দগি খুশ হয়ে যাবে রেজা আলির। সেই পথটাই এতদিন খুঁজে পাচ্ছিল না। জনার্দনের কথায় যেন আবার বিদ্যুৎ চমকে উঠল মগজের মধ্যে! তোবা! তোবা! এই তো সুযোগ!
আর হুজুর, এত বড় কাণ্ড ঘটে গেল, জগা খাজাঞ্চি কি কানুনগো কাছারির সরকার কিছুই জানতে পারলে না, এতেও আমার বড় সন্দেহ হচ্ছে হুজুর!
তা হলে এক কাজ কর তুই জনার্দন!
কী কাজ, বলুন হুজুর!
রেজা আলি নিজের ডান হাতের একটা আঙুল দিয়ে নিজের কপালে টোকা মারলে। অর্থাৎ মতলবটা মগজে এবার পাকা হয়ে বসে গেছে। বললে–তুই এক কাজ কর,–ওই শোভারাম বেটা তো মস্তানা হয়ে গেছে, ঠিক তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ হুজুর! আমি নিজের চোখেই তো সেটা দেখে এলুম–
তা হলে ছোটমশাইয়ের নোকোরের কাম করবে কে? ওকে দিয়ে তো আর কাম চলবে না। অন্য নোকর তো দরকার। তুই গিয়ে ওর নোকরিটা নে। আমিও তোর তলব দেব, রাজবাড়ি থেকেও তলব পাবি। দুনো আয় করবি–আর ভেতরের খবর জেনে নিবি–যা–
জনার্দন ভক্তিতে গদগদ হয়ে বারবার মাথা নুইয়ে কুর্নিশ করতে লাগল রেজা আলিকে হুজুর, দেখবেন হুজুর গরিবকে, এ-গরিব কাফের বটে, কিন্তু হুজুরের নিমক খায়, নিজামতের একটা পাকা নোকরি আমাকে করে দিতে হবে হুজুর, বড় গরিব আমি হুজুর, হুজুর মেহেরবান…।
আচ্ছা তুই এখন যা, দেখি তুই কেমন কাম হাসিল করিস বলে রেজা আলি আবার মৌচে তা’ দিতে লাগল। মনে মনে আবার বলতে লাগল তোবা! তোবা! এই তো সুযোগ! মেহেদি নেসার সাহেবকে কেরামতি দেখাবার এই-ই তো সুযোগ!
*
বাংলার অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধের ইতিহাস বড় বেদনার ইতিহাস। মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে শুরু করে, সুজাউদ্দিন, রায়-রায়ান আলমচাঁদ, সরফরাজ খাঁ, আলিবর্দি, হাজি মহম্মদের পর যে-ইতিহাস সে-ইতিহাস নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌল্লা, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের ইতিহাস। মিরজাফর, মোহনলাল, ক্লাইভ, ড্রেক, উমিচাঁদ, ম্যানিংহাম, কিলপ্যাট্রিক, ওয়াটস্-এর ইতিহাস। ফরাসি ডাচ পর্তুগিজদেরও ইতিহাস। বাংলার ইতিহাসই ভারতবর্ষের ইতিহাস। এই শোভারাম জনার্দন, ষষ্ঠীপদ, সচ্চরিত্র, কান্ত, উদ্ধব দাস, মেহেদি নেসার, দুর্গা, নয়ানপিসি, নন্দরানিরাই সে-ইতিহাস সেদিন কালের খাতায় পাতার পর পাতা লিখেছিল। আর উদ্ধব দাস শুধু লিখেছিল বেগম মেরী বিশ্বাস।
আজ থেকে প্রায় দু’শো বছর আগের মানুষ আজকের মতোই ভালবেসেছিল, ষড়যন্ত্র করেছিল, খুন করেছিল আর স্বার্থসিদ্ধি করেছিল। সেদিনও দেশের মানুষ এমনি করেই অসহায়ের মতো ভাগ্যের হাতে নিজেদের ছেড়ে দিয়ে নিরাপদ মনে করেছিল। যেনবাব সে-দেশের কথা ভাবুক, যে-মন্ত্রী সে-মন্ত্রণা দিক, তোমার আমার কিছু করবার নেই। এসো আমরা সবাই মিলে দুটো পয়সা উপায়ের চেষ্টা দেখি। তুমি রাজা, তুমি আমাকে জায়গির দাও, আমাকে খেতে পরতে দাও, আমি তোমাকে নিয়ে অন্নদামঙ্গল’ মহাকাব্য লিখব। আমি লিখে দেব–ভবানন্দ মজুমদার দেবীর বরপুত্র। তুমি অন্যায় করো, অত্যাচার করো, উৎপীড়ন করো, তাতে কিছু ক্ষতি নেই। আমি আমার মহাকাব্যে তোমাকে। দেবতা করে তুলব।
তাই উদ্ধব দাস বলত–আমিও এক কাব্য লিখব গো, আমিও লিখব—
মোল্লাহাটের মধুসূদন কর্মকার জিজ্ঞেস করত তা তুমিও কি রায়গুণাকর ভারতচন্দোরের মতো অন্নদামঙ্গল লিখবে নাকি?
আজ্ঞে না প্রভু, রায়গুণাকর তো ঘুষ খেয়ে মিথ্যে কথা লিখেছে-
-ঘুষ খেয়ে? তুমি বলছ কী দাসমশাই?
হ্যাঁ গো, আমি ঠিক বলছি। রায়গুণাকর তো ঘরের ভেঁকি কুমির। নইলে প্রতাপাদিত্য গেল, কেদার। রায় গেল, চাঁদ রায় গেল, ভবানন্দ মজুমদারকেই বীরস্য বীর তৈরি করলে রায়গুণাকর।
তা তুমি কাকে নিয়ে লিখবে?
উদ্ধব দাস বলত–তাকে তোমরা জানো না, তার নাম বেগম মেরী বিশ্বাস!
ওমা, সে আবার কে গা?
সে যখন লিখব তখন তোমরা দেখতে পাবে।
উদ্ধব দাস হাসত আর বলত–সেসব কী দিন গেছে, তোমরা তো জানো না, এখন তো ফিরিঙ্গি রাজত্ব, এখন তো তোমরা সে-সব কথা ভুলে গেছ। কিন্তু আমি ভুলিনি গো! সে ভোলবার নয়–
সত্যিই উদ্ধব দাস কিছুই লিখতে ভোলেনি। যা দেখেছে, যা শুনেছে, সব লিখেছে। কাটোয়ার গঙ্গার ঘাট থেকে অনেক দূর যেতে যেতে হঠাৎ মনে হল এদিকে গিয়ে আর লাভ কী! ডিহিদারের লোক পালকি নিয়ে আসতেই উদ্ধব দাসকে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
আরে এখানে লোকটা কেন? ভাগো, ভাগো হিয়াসে—
ঠিক আছে! উদ্ধব দাসকে খাতির করলেও যা, তাড়িয়ে দিলেও তাই। নির্বিকার। একদিন আমাকে তাড়িয়ে দিয়ে তোমরা রাজত্ব করছ, আবার একদিন তোমাদের তাড়িয়ে দিয়ে আর-একজনরা রাজত্ব করবে! কেউ এখানে চিরটা কাল রাজত্ব করতে আসেনি। এইটেই যে নিয়ম গো। চিরটা কাল রাজত্ব করবে শুধু সেই একজন। সে-ই মালিক। তা তুই এত বড় ঘুষখোর, সেই আসল মালিককে ছেড়ে দিয়ে ভবানন্দ মজুমদারের গুণ গাইলি?
