অ্যাঁ?
শোভারাম চাইলে গোকুলের মুখের দিকে।
গোকুল জিজ্ঞেস করলে কী হয়েছে তোমার বলো তো? কী হয়েছে? আমাকে চিনতে পারছ? আমি কে বলো তো?
শোভারাম আবার বিড়বিড় করে বলে উঠল–অষ্টসিদ্ধি.
সরকারমশাই বলে উঠল–এই রে, মাথাটা খেয়েছে একেবারে, যা গোকুল, ওকে বাড়িতে পৌঁছে। দিয়ে আয়
ভিড়ের মধ্যে এতক্ষণ একজন চুপি চুপি সব শুনছিল। অতিথিশালার লোজন, গোকুল, হরিপদ, জগা খাজাঞ্চিবাবু, সরকারমশাই সবাই যখন একবার পর একটা প্রশ্ন করে চলেছে তখন সে লোকটা সকলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে দেখছিল। তারপর যখন গোকুল শোভারামকে নিয়ে তার বাড়ির দিকে পৌঁছিয়ে দিতে গেল তখনও সে-লোকটা সঙ্গে সঙ্গে চলেছে।
গোকুল বলছিল–তুমি একটু মেয়ের কথা ভাবা ছেড়ে দাও দিকিনি ধরে নাও না মেয়ে তোমার মরে গেছে শোভারাম। চিরটা কাল কি আর সবাই বাঁচে। তোমার নিজের শরীরটার দিকেও তো দেখতে হবে। ধরে নাও না মেয়ে তোমার সুখে আছে, ধরে নাও না মেয়েকে তোমার নবাবের লোক চুরি করে নিয়ে গেছে। চুরি কি হয় না? তা হলে তাই নিয়ে ভেবে ভেবে তুমি নিজের মাথাটা খারাপ করবে?
শোভারাম বললে–দৈত্যরাজ…
কী ছাই বাজে কথা বলছ? দৈত্যরাজের মাথায় মারি ঝাটা! কোথায় দৈত্যরাজ? দৈত্যরাজ তোমার মেয়েকে চুরি করে নিয়ে গেছে, কে বললে? কে বলেছে শুনি? বিশু? হরিপদ? দুগ্যা?
শোভারাম হঠাৎ বলে উঠল–দুগ্যা…
গোকুল এক ধমকানি দিলে ধ্যেত, দুগ্যা আর বলবার লোক পেলে না, তোমাকে বলতে গেছে। দুগ্যা কি নবাবকে দেখেছে? দুগ্যার চোদ্দোপুরুষ নবাবকে দেখেছে? আর নবাবের কি মেয়েছেলের অভাব যে তোমার একফেঁটা মেয়েকে চুরি করে নিয়ে যাবে?
শোভারাম আবার দুম করে বলে উঠল–অষ্টসিদ্ধি…
গোকুল সেকথায় কান না দিয়ে বাইরে থেকে ডাকলে ও নয়ানপিসি, পিসি–
ডাকতে ডাকতে দু’জনেই বাড়ির ভেতরে চলে গেল। সঙ্গে অন্য যারা ছিল তারাও সদর পেরিয়ে বাড়ির উঠোনে ঢুকল।
লোকটা এতক্ষণ সব দেখছিল, শুনছিল, তারপর সবাই যখন ভেতরে গেল, তখন সোজা উলটোদিকে চলতে লাগল। তারপর যখন খানিকটা এসে মুসলমান পাড়ায় পা দিয়েছে, তখন আরও জোরে পা চালিয়ে দিয়েছে। তারপর এক দৌড়ে সোজা একেবারে ডিহিদারের দফতরে গিয়ে হাজির। বাইরে ফিরিঙ্গি’কে দেখেই বোঝা গিয়েছিল, রেজা আলি ভেতরে আছে। লোকটা ভেতরে যেতেই রেজা আলি তাকিয়ে দেখলে।
কী রে জনার্দন, হাঁপাচ্ছিস কেন? কেউ তাড়া করেছে?
জনার্দন বললে–হুজুর, খবর আছে
কী খবর? নেসার সাহেবের সঙ্গে মোলাকাত হল?
হয়েছে হুজুর, কিন্তু মুর্শিদাবাদে বড় গোলমাল চলছে। গুজব রটেছে যে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই বাধবে।
রেজা আলি জিজ্ঞেস করল–নবাবের এখন মেজাজ কেমন?
হুজুর, নবাব তো সকলকে তলব দিয়েছিল মতিঝিলে। মেহেদি নেসার সাহেব, মোহনলালজি, মিরমদনজি, মিরজাফর সাহেব, সবাইকে ডেকে একটা ফয়সালা করবার চেষ্টা করেছে। মিরজাফর সাহেবকে খুব বুঝিয়ে বলেছে নবাব যে, তুমি হচ্ছ আমার পুরনো আত্মীয়, আমার ঘরের লোক, তুমি যদি আমার এই বিপদের দিনে না দেখো তো কে দেখবে? তোমার ওপর ভরসা করেই তো আমি মসনদে বসেছি।
মিরজাফর সাহেবের সঙ্গে তা হলে নবাবের দোস্তি হয়ে গেছে আবার?
জনার্দন বললে–হুজুর, আমি তো শুনলুম সকলের সামনে নবাব মিরজাফর সাহেবের হাত ধরে নাকি কেঁদেছে নাকি কাঁদতে কাঁদতে মিরজাফর সাহেবকে দুই হাত দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেছে–
এত দূর গড়িয়েছে তা হলে?
হুজুর, নেয়ামত তো তাই আমাকে বললে।
নেয়ামত কে?
আজ্ঞে, মতিঝিলের খিদমদগার। তাকে খুব পান জরদা কাশীর খুশবু কিমাম খাইয়ে তো হাত করেছিলাম। খুব তোয়াজ করে তাকে জিজ্ঞেস করলুম-ইয়ার, সেদিন মতিঝিলের জমায়েতে কী সব সল্লা হল বলল আমাকেও তো সব আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে শোনে, মেহেদি নেসার সাহেবকে তো ও-ই চেহেল্-সুতুন থেকে ডেকে এনেছিল। ও বলছিল–মালুম হচ্ছে শায়েদ লড়াই হবে। নবাবের কথায় মিরজাফরের মন টলেছে, নবাবের কান্না দেখে মিরজাফর সাহেব আর চুপ করে থাকতে পারেনি, মিরজাফর সাহেবের চোখ দিয়েও নাকি পানি পড়ছিল–
রেজা আলি কথাটা শুনে নিজের মনেই কী যেন মতলব আঁটতে লাগল।
জনার্দন হঠাৎ আবার বললে–হুজুর, আর একটা কথা
বলে আরও কাছে সরে এল–
আর একটা কথা। কথাটা কারও সামনে বলতে চাই না হুজুর। হুজুরের নিমক খাই, তাই হুজুরকেই। বলছি। হাতিয়াগড়ে এসে দেখি রাজবাড়ির সামনে খুব ভিড়।
কেন? জানাজানি হয়ে গেছে নাকি?
সেই কথাই তো বলছি। সেই যে মেয়েটা পালিয়ে গিয়েছিল বিয়ের রাত্তিরে, শুনেছেন তো? সেই যে সেই মরালী? তার বাপ শোভারাম, সেই শোভারামটা হঠাৎ দেখি পাগল হয়ে গেছে, একেবারে বদ্ধ। পাগল। এতদিন মেয়েটা পালিয়ে গিয়েছে, তাতে কিছু হয়নি, হঠাৎ এখন অ্যাদ্দিন পরে পাগল হল কেন? আমার তো হুজুর একটা সন্দেহ হচ্ছে।
কী?
হুজুর, আমরা সেদিন রানিবিবিকে বজরা করে কাটোয়া পাঠিয়ে দিয়েছি, কিন্তু কাকে পাঠাচ্ছি তা তো পরখ করে দেখিনি হুজুর! অন্ধকারে ঘোমটা দিয়ে তাঞ্জামে তোলবার পর দরওয়াজা বন্ধ করে দিলুম। কিন্তু মুখ তো দেখিনি, যদি ভেজাল মাল পাঠিয়ে থাকে দুশমনি করে?
কে দুশমনি করবে? হাতিয়াগড়ের রাজা? ওটা তো একটা আসলি উজবুক রে। আর ও তো তখন কোঠিতে ছিল না কেষ্টনগরে মহারাজার সঙ্গে সল্লা করতে গিয়েছিল
