তুমি বললে–তাকে এই কথা?
বলব না তো কি ভয়ে চুপ করে থাকব?
শোভারাম বললে–তা তো বটেই, তা জিজ্ঞেস করলে না কেন যে, পুষ্যানক্ষত্রে শ্বেতজয়ন্তীর শেকড় খেতে গেল কেন সে? কেন মরতে ও-বিষ খেতে গিয়েছিল? আমি কী অপরাধটা করেছিলুম?
জিজ্ঞেস করেছি। আমি ছাড়িনি। মুখপুড়িকে আমি জিজ্ঞেস করলুম–তুই আর খাবার জিনিস পেলিনে? পুষ্যানক্ষত্রে শ্বেতজয়ন্তী শেকড় কেউ খায় রে?
তা কী বললে–সে?
কিছুতেই জবাব দেয় না সে কথার। আমাকে তো চেনে না। আমিও তেমনি মেয়ে। আমি তখন স্তম্ভন আরম্ভ করলুম। আমার কাছে দুধ-অপরাজিতার শেকড় ছিল, তাই মুখে পুরে দিয়ে আটবার পরি-সাধন মন্তরটা জপ করতে লাগলুম। তখন যাবে কোথায়, গড়গড় করে সব বলে ফেললে
কী বললে?
বললে–আমি যা ভেবেছি তাই ঠিক–বর পছন্দ হয়নি!
শোভারাম আরও অবাক হয়ে গেল। বললে–তা বর পছন্দ হয়নি বলে নিজের বাপকে ত্যাগ করে গেল সে? অ্যাদ্দিন যে তাকে খাওয়ালুম পরালুম, মানুষ করলুম, তার কিছু দাম নেই রে? আমার কথাও একবার তার মনে পড়ল না? এই যে আমার খাওয়া নেই দাওয়া নেই ঘুম নেই, সেটাও কিছু নয়?
দুর্গা বললে–আমি তাও বলিছি, আমি ছাড়িনি। বললুম–তুই নিজের বাপকে যে এত কষ্ট দিলি এতে কি তোর ভাল হবে ভেবেছিস? তোর মেয়ে হলে তোকেও যে সে এমনি করে ভোগাবে রে!
না না দুগ্যা! আমি যেমন ভুগছি, মরি যেন এমন করে না ভোগে। আমাকে ছেড়ে যদি সে সুখী থাকে তো তাও ভাল। এমন কষ্ট যেন কেউ না পায়। তা থাকগে, মরি কোথায় আছে এখন
দুর্গা বললে–সেই কথাই তো তোমাকে বলছি শোভারাম, মেয়েকে তো তোমার এনেছি, কিন্তু একটা কথা আছে…
কী কথা?
দৈত্যলোক থেকে তোমার মেয়েকে তো ছাড়িয়ে আনছি, এমন সময় দৈত্যরাজ ধরলে আমাকে, বললে–মরালীকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস? আমি বললুম–মহারাজ, এর বাপ কান্নাকাটি করছে, একে একবার দেখতে চায় সে। সে বড় দুঃখী মানুষ। এই মেয়ে ছাড়া তার কেউ নেই। অনেক করে বলতে তবে বোধহয় একটু মায়া হল বেটার। বললে–নিয়ে যা তার মেয়েকে, কিন্তু খবরদার বলছি, এর বাপ যদি এর মুখের দিকে একবার চেয়ে দেখে তো আবার এখেনে টেনে নিয়ে আসব
তা নিজের মেয়ের দিকে মুখ তুলে চাইতে পারব না?
না বাপু না, চাইতেও পারবে না, আর তোমার মেয়েকে যে ফিরে পেয়েছ তাও কাউকে বলতে পারবে না।
শোভারাম কেঁদে ফেললে ও দুগ্যা, তা হলে আমি বাঁচব কী নিয়ে?
দুর্গা বললে–তা হলে তুমি নিজেই বাঁচো, মেয়ের কথা আর মুখে এনো না। আমাকে বাপু দৈত্যরাজ পইপই করে ওই কথা বলে রেখেছে, আমি কী করব, আমি তবু অনেক কষ্ট করে তোমার মেয়েকে যে খুঁজে বার করতে পেরেছি এই-ই যথেষ্ট! আমি এখন চলি গো, আমার অনেক কাজ ওদিকে….
শোভারাম পেছন পেছন গেল। বললে–তা সে কোথায় আছে তা তো বললে–না গো!
কোথায় আবার, রাজবাড়িতে! রাজবাড়িতেই লুকিয়ে রেখেছি, নইলে তো তোমারই বিপদ, তুমি আবার কোনদিন মেয়েকে দেখে ফেলবে তখন তোমারও সব্বোনাশ, মরিরও সব্বোনাশ
তা তার সঙ্গে একবার কথাও বলতে পারব না আমি?
দুর্গা বললে–কথা আমি তার সঙ্গে বলিয়ে দেব, কিন্তু দেখা না করলেই হল!
কখন কথা বলব?
সে তোমায় আমি খবর দেবখন–বলে খরখর করে দুর্গা রাজবাড়ির দিকে চলে গেল। শোভারামও পেছন পেছন গেল, কিন্তু দুর্গার তখন আর সময় নেই। সেই রাজবাড়ির দেউড়ির সামনে দাঁড়িয়েই খানিকক্ষণ বোবার মতন চারদিকে চেয়ে রইল শোভারাম।
জগা খাজাঞ্চি হন্তদন্ত হয়ে আসছিল রাজবাড়ির দিকে। সে শোভারামের দিকে চেয়ে অবাক হয়ে গেল। বললে–কী রে, এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী করছিস, একলা?
শোভারাম তবু উত্তর দেয় না। সে যেন জগা খাজাঞ্চিকে চিনতেই পারলে না। দেখা হলে জগা খাজাঞ্চিকে বরাবর প্রণাম করে এসেছে আগে। আজ যেন জগা খাজাঞ্চি কে-না-কে!
কী রে, কথা বলছিস না কেন? কী হল তোর? ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখছিস কী?
তবু উত্তর দেয় না শোভারাম। সরকারমশাই আসছিল খাত্তাপত্তর নিয়ে। সে-ও দাঁড়িয়ে গেল।
শোভারামের কী হয়েছে বলে তো সরকারমশাই? পাগল হয়ে গেল নাকি?
সরকারমশাইও থমকে দাঁড়াল। ভাল করে চেয়ে দেখলে শোভারামের দিকে। জিজ্ঞেস করলে কী রে শোভারাম, কী হয়েছে তোর? অসুখ করেছে?
শোভারাম বিড়বিড় করে বললে–দৈত্যরাজ…
দৈত্যরাজ? সে আবার কে রে বাবা? কোথায় দৈত্যরাজ? দৈত্যরাজ কী করেছে তোর?
দেখতে দেখতে আরও কয়েকজন লোক জড়ো হয়ে গেল দেউড়ির সামনে। অতিথিশালায় যারা সেদিন এসে জুটেছিল তারাও বাইরে এসে মজা দেখতে লাগল। হরিপদ, গোকুল তারাও এসে দাঁড়াল।
শোভারাম তখন হঠাৎ বলে উঠল–অষ্টসিদ্ধি..
একজন বললে–পাগল বুঝি লোকটা?
আর একজন চিনতে পেরেছে। সে বললে–এ শোভারাম না? সেবার তো এমন ছিল না! এমন হল কী করে?
তা পাগলাকালীর বালা পরিয়ে দেয় না কেন? এর কে আছে গা?
কে আর থাকবে, কেউই নেই। এক মেয়ে ছিল, সে পালিয়ে যাবার পর থেকেই অমনি। এবার বেড়েছে দেখছি। আহা
জগা খাজাঞ্চিবাবু তখন শোভারামের সামনে গিয়ে হাত-মুখ নেড়ে বললে–তুমি বাড়ি যাও শোভারাম, বাড়িতে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকো গে, বুঝলে?
সরকারমশাই বললেইস, মাথাটা একদম খারাপ হয়ে গেল গো
গোকুলও দেখছিল সব। সামনে এগিয়ে এসে বললে–ও শোভারাম, শোভারাম–
