তারপর আবার গলা নিচু করে বললে–দেখুন, এখনও সময় আছে, আপনি পালিয়ে যান
তার মানে?
সামনের দিকে আমগাছতলায় সেপাই দুটো উদ্ধব দাসের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিয়েছে। বেহারারাও গা এলিয়ে দিয়েছে সেখানে। আপনি এই পেছনের দরজাটা দিয়ে বেরিয়ে যান না। ওই বাদিটা আছে, ওকে কোনও কাজের ছুতো করে কোথা থেকে জলটল আনতে বলে দিন। সেই ফাঁকে আপনি বেরিয়ে যান। এখান থেকে সামনে গঙ্গা পাবেন, সেই গঙ্গার পাড় ধরে যেদিকে দুচোখ যায় চলে যান–আর যদি কেউ আপনার দামি শাড়ি দেখে সন্দেহ করে তো একটা না-হয় ময়লা আটপৌরে শাড়ি পরে নিন। সঙ্গে আটপৌরে শাড়ি নেই আপনার?
কিন্তু তাতে আপনার কিছু ক্ষতি হবে না?
আমার ক্ষতি হোক গে! আপনি তো আগে বাঁচুন! আমি আমার একটা পেট যে-কোনও রকমে হোক চালিয়ে নেব। তার চেয়ে আপনার ধর্মটাই বড়।
বড় দেরিতে আপনার জ্ঞান হল দেখছি।
কান্ত বললে–না, কাল রাত্তিরেই আমার মনে হয়েছিল এ আমি কী করছি। আজ উদ্ধব দাসকে দেখেও এই কথাই আমার মনে হচ্ছিল–এ আমি কী করছি! না, আমি বলছি আপনি পালান ওই খিড়কির দরজাটা খুলে চলে যান, আমি বাইরেটা একবার দেখে আসছি
কিন্তু আপনি? আপনি কী বলবেন ডিহিদারকে? ডিহিদার যখন আপনাকে জিজ্ঞেস করবে রানিবিবি কোথায়, কেমন করে পালাল, তখন!
আমার কথা আমি পরে ভাবব। সে ভাববার অনেক সময় আছে। আপনি আগে যান, আমার কথা আপনাকে ভাবতে হবে না
রানিবিবি খানিকক্ষণ কী যেন ভাবতে লাগলেন। তারপর বললেন তার চেয়ে দুজনে মিলে একসঙ্গে পালালে কেমন হয়?–আপনিও আমার সঙ্গে চলুন না আপনি থাকলে অনেক সুবিধে হত!
কান্ত একটু মনে মনে ভাবতে লাগল।
কিন্তু আমাকেই বা আপনি বিশ্বাস করতে পারলেন কী করে? আমিও তো আপনার ক্ষতি করতে পারি!
কী ক্ষতি? আপনি আমার কী ক্ষতি করবেন?
না, আমাকে তো আপনি ভাল করে চেনেন না এখনও।
রানিবিবি বললেন–না, আপনাকে আমি চিনি।
আমাকে চেনেন আপনি?
আপনি যে ভোরবেলা নিজের নাম বললেন। আপনার নিজের পরিচয় দিলেন!
কান্ত বললে–সে তো ভারী, সেইটুকুতেই কি একজন মানুষকে চেনা যায়? আর আমি কোথায় নিয়ে যাব আপনাকে? হাতিয়াগড়ে?
রানিবিবি বললেন–না, সেখানে গেলে জানাজানি হয়ে যাবে! তাদের সকলের সর্বনাশ হবে!
তা হলে কোথায় যাবেন?
রানিবিবি বললেন–অন্য যে-কোনও জায়গায়। যেখানে গিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারব।
কেন? আপনার বাপের বাড়ি নেই? কোনও আত্মীয়স্বজন?
আমি তো বললুম আমি গরিবের মেয়ে। বিয়ের পরই বাবা মারা গেছেন, আর কেউ কোথাও নেই, এক শ্বশুরবাড়ি ছাড়া!
কান্ত যেন মুশকিলে পড়ল। রানবিবিকে নিয়ে কোথায় যাবে সে। তার নিজেরই কি কোনও জায়গা আছে যাবার! এক আছে বড়চাতরা! কিন্তু সেখানে গেলেও হয়তো নবাবের চর পেছন পেছন গিয়ে পৌঁছোবে। আর বড়চাতরার লোকেরাই যদি জিজ্ঞেস করে সঙ্গে কে? তখন কী উত্তর দেবে কান্ত! কী পরিচয় দেবে!
হঠাৎ কান্ত একটা কাণ্ড করে বসল। বললে–দাঁড়ান, আমি বাইরে গিয়ে দেখে আসি ওরা কী করছে। এখন আর খিড়কির দিকটাও দেখে আসি আপনি ততক্ষণে শাড়িটা বদলে নিন–
বলে কান্ত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
*
রাজবাড়ি থেকে তখন ফিরছিল শোভারাম। কাজ থাক আর না-থাক শোভারামকে গিয়ে নিয়ম করে হাজরে দিতে হয়। সকাল থেকে তেল-গামছা নিয়ে ছোটমশাইয়ের জন্যে বসে থাকতে হয়। তারপর গোকুল হোক কি হরিপদ হক, কাউকে দেখলেই জিজ্ঞেস করে হ্যাঁগো, ছোটমশাই নীচেয় নামবেন না?
সেই সেদিন থেকেই ছোটমশাইয়ের অসুখ। কাছারি বাড়িতেও আসেন না। দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়া করে আবার আর একবার যায় রাজবাড়িতে। তখন দুপুরবেলা ঘুম থেকে উঠে একবার ছোটমশাই নীচেয় নামেন। কাছারিবাড়িতে আসেন। খাতাপত্র দেখেন। কদিন ধরে তা-ও করছেন না।
পথে দুর্গার সঙ্গে হঠাৎ দেখা। দুর্গাই আগ বাড়িয়ে বললে।
বললে–আর ভাবনা নেই গো শোভারাম, তোমার মেয়েকে পাওয়া গিয়েছে
শোভারাম তো অবাক! এতদিন পরে পাওয়া গেল?
একেবারে দুর্গার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। কোথায় পেলে গো? কী করে পেলে?
দুর্গা বললে–বড় কষ্ট হয়েছে গো! তিন দিন তিন রাত অষ্টসিদ্ধি জপ করলাম। জপ করতে করতে দেবলোক নরলোক গন্ধর্বলোক সব খুঁজে খুঁজে হয়রান। শেষকালে গেলাম, দৈত্যলোকে, গিয়ে দেখি ছুঁড়ি ঘাপটি মেরে বসে আছে। তখন চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে এলুম। বললুম চল ঘুড়ি চল, তোর বাপ এদিকে কান্নাকাটি করে মরছে, আর তুই এখেনে ঘাপটি মেরে বসে আছিস। চল
কথাগুলো শুনতে শুনতে শোভারাম একেবারে মাটিতে বসে পড়ল। শোভারামের কাণ্ড দেখে এতদিন সবাই তাকে পাগল বলেছে। পাগল ছাড়া আর কী। মেয়ে পালিয়ে গেছে বলে মানুষ বিবাগী হয়েছে এমন ঘটনা কেউ আগে শোনেনি। আর চলে গেছে তো বেশ করেছে। মেয়ে তো গলার কাটা গো। তার বিয়েও দিতে হবে, আবার চিরকাল তার ভালমন্দ দেখতে হবে।
শোভারাম সেই অবস্থাতেই যেন কেঁদে ফেলবার জোগাড় করলে। জিজ্ঞেস করলে–মরি আমার কেমন আছে দুগ্যা? আমাকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে তো তার?
তা কষ্ট হবে না? বাপ বলে কথা! আমি খুব শুনিয়ে দিলুম তাকে, বললুম-হালা ছুঁড়ি, তোর বাপ ওদিকে কেঁদে কেঁদে হন্যে হয়ে বেড়াচ্ছে আর তুই এখেনে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছিস? তোর আক্কেল তো খুব লা?
