হঠাৎ রানিবিবির ডাকেই কান্ত আবার ফিরে গিয়েছিল সরাইখানার ভেতরে। রানিবিবিও তার জন্যে বোধহয় উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিল। জিজ্ঞেস করলে–দেখে এলেন? কে ও?
কান্ত বললে–ওর নাম উদ্ধব দাস–অদ্ভুত মানুষ!
কেন? কী করে জানলেন?
কান্ত বললে–আপনি শুনলে অবাক হয়ে যাবেন, যার সঙ্গে আমার বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল, তার সঙ্গেই ওর বিয়ে হয়ে গেছে!
তারপর? ওর বউ কোথায় গেল?
সেই জন্যেই তো বলছি অদ্ভুত মানুষ। আমার ওরকম হলে আমি কিন্তু আত্মহত্যা করতুম। কিন্তু ও বেশ দিব্যি হেসে-খেলে গান গেয়ে বেড়াচ্ছে–
তা ওর বউ কোথায় পালাল?
তা হলে শুনুন!
কান্ত বলতে লাগল তা হলে শুনুন, তাকে আর পাওয়া যাবে না।
কী করে জানলেন পাওয়া যাবে না?
আমি যেদিন আপনাকে আনতে হাতিয়াগড়ে গিয়েছিলুম না, সেইদিনই দেখলুম সেই বউকে খোঁজবার জন্যে হাতচালা হচ্ছে। আপনাদের বাড়ির ঝি দুর্গাকে চেনেন আপনি? আপনারই তো ঝি সে? চেনেন?
খুব চিনি! সে তুকতাক করে!
হ্যাঁ, দেখি সেই দুগ্যা নয়ানপিসি বলে একজন বিধবার হাত চালাচ্ছে আর বিড়বিড় করে মন্তর পড়ছে। কিন্তু সেই মরালীকে আর পাওয়া গেল না–
মরালী কে?
যার সঙ্গে আমার বিয়ে হবার কথা হয়েছিল তারই নাম। তা দুগ্যা বললে–সে নাকি পুষ্যানক্ষত্রে শ্বেতজয়ন্তীর শেকড় খেয়েছে, তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। দেবনর-গন্ধর্ব কেউ খুঁজে পাবে না। কথাটা দুগ্যা বললে–বটে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে সব বুজরুকি। নিশ্চয়ই সে কোথাও লুকিয়ে আছে। আপনি কি তুকতাকে বিশ্বাস করেন?
কেন করব না। দুগ্যার দেওয়া মাদুলি পরে কত লোকের রোগ সেরে যেতে দেখেছি।
কিন্তু তা বলে অদৃশ্য হয়ে যাবে একেবারে? তাই কখনও হয়? আমি তো উদ্ধব দাসকে বলে এলাম, নিশ্চয়ই সে কোথাও লুকিয়ে আছে, আমি তাকে খুঁজে বার করব। আপনাকে মুর্শিদাবাদে পৌঁছিয়ে দিয়েই আমি আবার হাতিয়াগড়ে ওর বউকে খুঁজতে যাব–
ওর বউয়ের জন্যে আপনার তো দেখছি খুব মাথাব্যথা!
কান্ত বললে–আহা, আমি তো বুঝতে পারি বউ পালিয়ে গেলে মানুষের কীরকম কষ্ট হয়! ও অবশ্য মুখে কিছু বলছে না, হেসে হেসে ছড়া বানাচ্ছে আর গান গাইছে–কিন্তু মনে মনে তো কষ্ট হচ্ছে।
রানিবিবি বললে–ওর কষ্টের চেয়ে দেখছি আপনার কষ্টটাই যেন বেশি।
কিন্তু আমার জন্যেই তো ওর বউ পালাল!
আপনার জন্যে পালিয়েছে কে বললে?
ওই উদ্ধব দাসই তো বললে। বললে–আমার সঙ্গেই নাকি মরালীকে বেশি মানাত! ওর মতে ওকে পছন্দ হয়নি বলেই সে পালিয়েছে। আপনি নিজে রাজরানি, আপনি তো সাধারণ মানুষের মনের খবর রাখেন না।
রানিবিবি বললে–আমি রাজরানি হলেও সাধারণ গরিব ঘরেরই মেয়ে, আমি বুঝি
আপনি সাধারণ ঘরের মেয়ে?
আমি চাকদা’র মুখুটি বংশের মেয়ে। আমাদের বাড়িতে এক-একদিন ভাতই রান্না হত না–এত গরিব ছিলাম আমরা
কেন?
চাল থাকত না বলে। বাবা ছিলেন পণ্ডিত মানুষ। এঁরা আমাকে আমার রূপ দেখে পছন্দ করে বউ করে নিয়ে এসেছিলেন। আমি সাধারণ লোকের দুঃখকষ্ট খুব ভাল করেই বুঝি
কান্ত বললে–অথচ, কাল রাত থেকে আপনার সঙ্গে কথা বলতে আমার খুব ভয় করছিল। ভাবছিলাম হয়তো আপনি আমার মতো গরিব লোকদের সঙ্গে কথাই বলবেন না। তাই মাঝিরা যখন কাল রাত্তিরে ডাকাতের ভয় দেখাল তখন আমি আর আপনাকে না ডেকে পারিনি
তারপর একটু থেমে আবার বললে–আচ্ছা, আর একটা কথা জিজ্ঞেস করছি। কিছু মনে করবেন না–
বলুন না
আপনি কেন মুর্শিদাবাদ যাচ্ছেন? নবাবের ডিহিদার পরওয়ানা দিলে আর আপনিও চললেন? হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই কিছু আপত্তি করলেন না? আমি হলে তো আমার স্ত্রীকে কিছুতেই পরের হাতে তুলে দিতে পারতুম না, প্রাণ গেলেও না। সত্যিই কি নবাবকে আপনাদের এত ভয়?
রানিবিবি একটু হাসলেন। রানিবিবির হাসিটা খুব ভাল লাগল কান্তর। রানিবিবি বললেন–সকলে কি আপনার মতো সাহসী?
কান্ত বললে–সাহসের কথা হচ্ছে না, কেউ যদি কাউকে ভালবাসে তা হলে বিপদের দিনে তাকে ছাড়তে পারে? আর আমার কথা ছেড়ে দিন, চাকরির জন্যেই তো আমাকে এই পাপ করতে হচ্ছে–
পাপ যদি মনে করেন তো এ-চাকরি করতে গেলেন কেন?
আগে কি জানতুম চাকরি নিলে এই পাপ কাজ করতে হবে?
এখন তো জানলেন, এখন ছেড়ে দিন।
কান্ত বললে–ছাড়তে আমি এখনই পারি! না-হয় উপোসই করব। কিন্তু আপনার তাতে তো কোনও লাভ হবে না। আমি না হলে অন্য কেউ আপনাকে নিয়ে গিয়ে পুরে দেবে হারেমের ভেতরে। তখন?
আমার কথা ছেড়ে দিন! আমার যা হবার তা হবেই। আমি সবকিছুর জন্যেই তৈরি
কান্ত বললে–কিন্তু আমি বলছি আপনাকে, আপনি না এলেই ভাল করতেন-নাটোরের মহারানি রানিভবানীর নাম শুনেছেন তো?
হ্যাঁ!
তা হলে চুপি চুপি আপনাকে একটা কথা বলি। কাউকে বলবেন না, তার মেয়েকেও একদিন আপনার মতন ডেকে পাঠিয়েছিল নবাব–তা জানেন?
তাই নাকি?
হ্যাঁ, আমাকে চকবাজারের গন্ধতেলের দোকানের মালিক সারাফত আলি সব বলেছে! নবাব তো লোক ভাল নয়। তা ছাড়া তার ইয়ারবকশি যারা আছে, তারাও খারাপ লোক। সেই রানিভবানী নবাবের পরোয়ানা পেয়েই এক কাণ্ড করলেন–
কিন্তু রানিভবানীর মেয়েকে নবাব দেখলে কী করে?
নবাব নৌকো করে যাচ্ছিল আর ওদিকে রানিভবানীর মেয়ে বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে রোদ্দুরে চুল শুকোচ্ছিল, তখনই নবাবের নজরে পড়ে গেছে। তা তারপর রানিভবানী করলেন কী, দু’দিন পরেই শ্মশানে একটা খালি চিতা সাজিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দিলেন। রটিয়ে দিলেন যে তার মেয়ে হঠাৎ অসুখ হয়ে মারা গেছে আর ওদিকে মেয়েকে এক সাধুর আশ্রমে লুকিয়ে রাখলেন! আপনিও তো সেই রকম কিছু করতে পারতেন। কেন আপনি আসতে গেলেন এমন করে? ওখানে গেলে আপনার ধর্ম থাকবে না তা বলে রাখছি–আপনি হিন্দু আমিও হিন্দু আপনাকে বিশ্বাস করে সব কথা বললুম!
