সত্যি আসলি চিজ কিনা জানতে কৌতূহল হল সারাফত আলির। একবার চিল্লিয়ে উঠল-বাদশা, দেখে আয় তো কৌন–
বাদশা সারাফত আলির নৌকর। সারাফত আলির কেনা বান্দা। তাকে বেশি আর বলতে হয় না। সে দৌড়ে রাস্তায় গিয়ে হাজির। একেবারে তাঞ্জামের সামনে। যাকে সামনে পেলে তাকেই জিজ্ঞেস করলে তাঞ্জাম মে কৌন হ্যায় জি?
সেপাইটা বন্দুক ঘাড়ে করে চলছিল। বললে–নয়াবেগম
নয়াবেগম! কোথায় চলেছে নয়াবেগম এই সাঁঝবেলায়? সন্ধেবেলায় তো বেগমরা রাস্তায় বেরোয় । কোথায় চলেছে গো নয়াবেগম?
জাহান্নম!
বোধহয় রাগ করেই কথাটা বলেছিল সেপাইজি? আর তা ছাড়া রাগ তো হবারই কথা! উল্লুকদের কথার জবাব দিতে সেপাইদের ইজ্জত বাধে।
কী রে, কী বললে–সেপাইজি? কে?
বাদশা বললে–হুজুর নয়াবেগম!
ফিন নয়াবেগম! শালা বেগমে বেগমে ভরে গেল চেহেল সুতুন! তবু শালার বেগমের কমতি নেই! বড় খতরা হয়ে গেল দুনিয়াটা! ব্যাকোয়াশ হয়ে গেল জিন্দিগিটা! মুর্শিদাবাদ আবার ডুববে রে! সঙ্গে আবার কাফের যাচ্ছে একটা! ওটা কে রে? সঙ্গে সঙ্গে ওটা যাচ্ছে কেন রে? আমাদের কান্তবাবুনা?
কান্ত একমনে ভাবতে ভাবতে পালকির পেছন পেছন যাচ্ছিল। পাশ থেকে সারাফত আলির কথাগুলো কানে এল। এতক্ষণে যেন জ্ঞান ফিরে এল কান্তর। এতক্ষণ যেন খেয়ালই ছিল না কোথায় চলেছে, কোথায় এসে পৌঁছেছে। চকবাজার। এখান থেকেই হাতিয়াগড়ে রওনা হয়েছিল সে। এই সেই সড়ক, এখানে এসেই বশিরের সঙ্গে দেখা করেছিল সে! রাস্তার লোকগুলো পর্যন্ত তাকে আজ আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। ওই দেখো নবাবের চর! চর যখন ছিল না, তখনই চর বলে ধরে নিয়েছিল বেভারিজ সাহেব। ষষ্ঠীপদ খুব বাঁচিয়ে দিয়েছে। ষষ্ঠীপদ লোকটা ভাল। বড় সরল। ইচ্ছে করলেই তো তাকে ধরিয়ে দিতে পারত। সাহেবকে গিয়ে চুপি চুপি খবরটা দিলেই পারত যে মুনশিবাবু নিজামতের চর। তখন গোরা-পল্টন এসে কান্তকে ধরে নিয়ে গেলেই বা তার কী বলবার থাকত।
মাথার মধ্যে সমস্ত অতীতটা তোলপাড় করতে লাগল কান্তর। সড়কটা উঁচু নিচু। এখান দিয়ে পালকি যেতে যেতে কতবার বেহারারা পা ভেঙে পড়ে গেছে। দিদিমার সঙ্গে বড়চাতরার রাস্তায় চলতে চলতে এমনি অন্যমনস্ক হয়ে যেত কান্ত। দিদিমা বলত–রাস্তার দিকে নজর দিয়ে চল, পড়ে যাবি যে
অথচ ভাবনা নাম করলে চলে! সারাফত আলি হয়তো তাকে দেখতে পেয়েছে। মৌতাতের মৌজে হয়তো ঠিক চিনতে পারেনি। চিনতে না-পারলেই ভাল। চিনতে পারলেই কাল আবার জিজ্ঞেস করত মিঞাসাহেব কাল তাঞ্জামে চড়িয়ে কাকে নিয়ে যাচ্ছিলে বাবুসাহেব?
কাটোয়ার সেই উদ্ধব দাসও সেপাইদের জিজ্ঞেস করেছিল–পালকিতে কোন বিবিজান যাচ্ছে গো?
সত্যিই বড় অদ্ভুত লোক ওই উদ্ধব দাস। কোনও বিকার নেই কোনও দুঃখ নেই। কেবল ঘোরে। ঘুরে বেড়িয়েই সারা পৃথিবীটা প্রদক্ষিণ করতে চায়। উদ্ধব দাস বলেছিল–আমি মানুষ নই প্রভু, আমি মানুষ নই আমার বউ পালাবে না তো কার বউ পালাবে বলুন?
তারপর বোধহয় কী মনে হয়েছিল, বলেছিল–তোমরা হাসছ সেপাইজান, কিন্তু হাসি নয়, খাঁটি কথা বলছি আমি! বউ পালিয়েছে বেশ করেছে। পালিয়ে গিয়ে বেঁচেছে হে! সে-মেয়ের আমার সঙ্গে বনবে কেন গো? সে মেয়ে যে ঠোঁটে আলতা লাগায়, তাম্বুল-বিহার না হলে মুখে পান রোচে না তার, পাশা খেলে! বাউন্ডুলে বরের সঙ্গে তার বনবে কেন প্রভু?
কান্ত আর থাকতে পারেনি। জিজ্ঞেস করেছিল তোমার বউকে কেমন দেখতে ছিল গো?
উদ্ধব দাস কান্তর দিকে চেয়ে হঠাৎ বলেছিল–আজ্ঞে প্রভু, আপনার সঙ্গে মানাত তার
সেপাই দুটো খুব হেসে উঠেছিল হোহো করে দূর বুড়ো, তুই থাম–
আজ্ঞে না সেপাইজি, আমি ঠিক বলছি, এই বাবুর সঙ্গে খুব মানাত, বাবুও দেখতে সুন্দর, আমার বউও দেখতে সুন্দর, দু’জনে মিলে সংসার আলো করে থাকত
কী ভেবে উদ্ধব দাস সেদিন কথাগুলো বলেছিল কে জানে! হয়তো রসিকতা করেছিল। কিংবা হয়তো রসিকতা করেনি। হয়তো সে সত্যি কথাই বলেছিল। কিন্তু উদ্ধব দাসের কথাটা এখনও ভুলতে পারেনি কান্ত, পরে একবার মরালীকে বলেছিল। মরালী প্রথমে কিছু উত্তর দেয়নি।
কান্ত বলেছিল সত্যি বলছি, তুমি বিশ্বাস করো, সত্যি সত্যিই দাসমশাই আমাকে সেই কথা বলেছিল–
মরালী তখন মরিয়ম বেগম। বলেছিল–তার কথা থাক–
কান্ত আর সে কথা নিয়ে বেশি পীড়াপীড়ি করেনি। শুধু বলেছিল–তার কথা সত্যি হলেই বোধহয় ভাল হত, না গো?
মরালী বলেছিল–ছিঃ, তোমার মুখে দেখছি কোনও কথাই আটকায় না—
কান্ত বলেছিল কিন্তু আমি যে কিছুতেই সে-সব কথা ভুলতে পারি না।
তা ভুলতে চেষ্টাও তো করবে। আমি তো ভুলে গেছি!
তোমার মতন মন হলে আমিও হয়তো ভুলতে পারতাম। কিন্তু আমার মনের গড়নটাই যে অন্যরকম। তোমার সঙ্গে তাই আমার কিছুই মেলে না দেখছি।
মরালী বলেছিল–মেলেই তো না। মিললে তুমি বিয়ের দিন ঠিক সময়ে এসে হাজির হতে! আমাকেও আর তা হলে এখানে এসে মরিয়ম বেগম হতে হত না!
কান্ত বলেছিল–তুমি মরিয়ম বেগমই হও আর যে-ই হও, আমার কাছে তুমি কিন্তু সেই মরালীই আছ!
মরালী ভয়ে ভয়ে চারদিকে চেয়ে বলেছিল–অত চেঁচিয়ো না, শেষকালে কেউ শুনে ফেললে মুশকিল হয়ে যাবে
মনে আছে, প্রত্যেক দিন কান্ত লুকিয়ে লুকিয়ে গিয়ে হাজির হত মরালীর কাছে। আর তারপর যখন না এসে উপায় থাকত না তখন পেছনের সুড়ঙ্গ দিয়ে বাইরে চলে আসত। বাইরে এসে আবার সেই সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানের পেছনে গিয়ে নিজের আস্তানার মধ্যে চিতপাত হয়ে শুয়ে পড়ত। সে-সব একদিন গেছে। চকবাজারের ছোট্ট একটা দোকানঘরের মধ্যেই কান্তর জীবন-যৌবন-জীবিকা সবকিছু কেটে গিয়েছিল। কাটোয়ার সরাইখানার সামনে সেদিন উদ্ধব দাসের সঙ্গে পরিচয় না-হয়ে গেলে হয়তো এমন হত না। এমন করে ঘনিষ্ঠ হওয়াও যেত না মরালীর সঙ্গে। হয়তো পালকিতে করে রানিবিবিকে চেহেলসূতুনে পৌঁছিয়ে দিয়েই সে একথা ভুলে যেত। একেবারে। তার জীবন অন্য দিকে মোড় ফিরত! কিন্তু উদ্ধব দাসই তার সব বানচাল করে দিলে। উদ্ধব দাসকে দেখে উদ্ধব দাসের সঙ্গে কথা বলেই কান্তর জীবনের গতি অন্য দিকে ঘুরে গেল।
