বৈষ্ণবচরণ শেঠবাবুরা বহুদিনের তাঁতের কারবারি। ফিরিঙ্গি সাহেবরা তাঁতিদের, আরমানিদের, হিন্দুদের, শিখদের সকলকে তোয়াজ করে ভেতরের গুপ্ত কথা আদায় করতে চায়। বেছে বেছে এমন। মুনশি রাখে যারা ফিরিঙ্গিদের দেবতার আসনে বসিয়ে পুজো করবে। এমন লোককে দালালি দেয় যে, বিপদের দিনে ফিরিঙ্গিদের দলে আসবে।
সেদিন শেঠবাবুদের বাগানের গদিবাড়িতেও তাই যখন হীরালাল মুনশি প্রাণের ভয়ে সবকিছু ছেড়ে পালিয়ে বাঁচল, তখন গদির সম্পত্তি টাকাকড়ি দেখবার জন্যেও কেউ রইল না। যে-আগুন বেভারিজ সাহেবের সোরার গদিতে জ্বল, সে-আগুন বৈষ্ণবচরণ শেঠের গদিতেও লাগল। নবাব ফৌজ নিয়ে আসবার আগেই সমস্ত কলকাতায় আগুন লেগে গেল। যখন সবাই পালিয়েছে, তখন ষষ্ঠীপদই একলা শেঠবাবুদের গদির ভেতর সিন্দুক ভেঙে কোচড় ভরতি করেছে। ষষ্ঠীপদর কাছে নবাবও যা, ফিরিঙ্গি কোম্পানিও তাই। হিন্দুও যা, মুসলমানও তাই। ষষ্ঠীপদরা শুধু টাকাটাই জানে! টাকাই তো আসল জিনিস রে। তোর টাকা হোক ভৈরব, তখন তোর হাতের ছোঁয়া বামুনরাও খাবে, মোছলমানও খাবে, ফিরিঙ্গি বেটারাও খাবে।
ষষ্ঠীপদর মনে হল, সমস্ত কলকাতাটাই যেন সে কিনে নিয়েছে। এত টাকা। এত মোহর, এত সোনা। সোনা দিয়ে আমি কলকাতা মুড়ে দেব। তখন দেখব, জগৎশেঠ তুমি বড়লোক, না আমি। তুমি আর আমি তখন এক জাত। কলকাতা ছেড়ে সবাই পালিয়ে গেছে। আমি কলকাতার নবাব আর সিরাজ-উ-দ্দৌলা মুর্শিদাবাদের নবাব। তোমার যদি বেশি টাকা থাকে তো আমাকে কিনে নাও। আর আমার যদি বেশি টাকা থাকে তো আমিও তোমাকে কিনে নেব কিন্তু। এখন কলকাতার জমিদারির ৫৭৮৬ বিঘে ১৯ কাঠা জমির মালিক আমি। আমি আবার ওই পোড়া কলকাতায় তোমাদের জমি পত্তনি দেব। ফৌজদারি বালাখানা বানাব, তারপর…
ও কত্তা, কত্তা
হঠাৎ ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে গেল ষষ্ঠীপদর। চারদিকে একবার চেয়ে দেখলে। এ তো সেই বেভারিজ সাহেবেরই গদিবাড়ি। তা হলে গদিবাড়ির তক্তপোশের ওপর ছেঁড়া মাদুরে শুয়ে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল নাকি সে। নিজের কেঁচড় দেখলে, নিজের হাত দুটো দেখলে। জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে দেখলে। কী আশ্চর্য, কোথাও তো আগুন দেখা যাচ্ছে না। কলকাতা তো সেই কলকাতাই আছে। তার নিজের ধুতিখানাও তো সেই একই ধুতি।
ও কত্তা, কত্তা
দুরতেরিকা! সক্কালবেলা জ্বালাতে এসেছে। কে? কে তুই? তাড়াতাড়ি দরজা খুলে ভৈরবকে দেখেই মুখটা বেঁকিয়ে উঠল ষষ্ঠীপদ!
ভোরবেলাই তোর মুখটা দেখতে হল তো! আর সময় পেলি না আসবার! দিনটা একেবারে মাটি, তোর জন্যে দেখছি একটা টাকারও মুখ দেখতে পাব না আজকে! তোর জ্বালায় কি আমি বনবাসী হব রে ভৈরব? সক্কালবেলা তোদের মুখ দেখতে আছে?
ভৈরব অবাক হয়ে গিয়েছিল।
কেন হুজুর, আমি তো ভৈরব দাস নই আর, ভৈরব চক্কোত্তি–নমশুদ্র নই কত্তা, বামুন! আমি তো পইতে পরেছি
ষষ্ঠীপদ রেগে দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিলে। বললে–যা এখন এখান থেকে, ওদিকে মুখ করে দাঁড়া, আমি ঘাটে গিয়ে আগে গঙ্গাজলে মুখ ধুয়ে আসি, তখন আসিস
ষষ্ঠীপদর সমস্ত শরীরটা ঘেন্নায় ঘিনঘিন করতে লাগল। ভোরবেলার স্বপ্ন হয়তো সত্যি হত, কিন্তু বেটার জ্বালায় সব মাটি করে দিলে।
ভেতর থেকেই চেঁচিয়ে বলে–ও-মুখ করে দাঁড়া শিগগির, দাঁড়িয়েছিস?
আজ্ঞে হ্যাঁ, কত্তা
দেখিস, যেন আমাকে দেখে ফেলিসনি! তোকে রেখে তো দেখছি আমার মহা বিপদ হল। আমি এবার বেরোচ্ছি, বুঝলি?
আজ্ঞে হ্যাঁ, বেরোন, কোনও ভয় নেই কত্তা আপনার
ষষ্ঠীপদ আবার সাবধান করে দিলে। বললে–আমি গঙ্গায় গিয়ে মুখ ধুয়ে গদিতে ফিরে এলে তখন মুখ ফেরাবি, বুঝলি তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ কত্তা, বুঝেছি!
ষষ্ঠীপদ মাথা নিচু করে দরজাটা খুলে গঙ্গার ঘাটের দিকে গেল। তারপর ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে নেমে দু’হাতের আঁজলা ভরে জল দিয়ে মুখ ধুতে ধুতে বলতে লাগল–মা, পতিতোৰ্ধারিণী গঙ্গে, রাজা। করো মা আমাকে, রাজা করো–
ওদিকে তখন বোধহয় ভোর হচ্ছে। অন্ধকার কেটে আসছে। গঙ্গার নৌকোগুলোর ভেতরে তখন মাঝিরা জেগে উঠেছে। ফিরিঙ্গি কোম্পানির দু-একটা হাতি তখন ঘাটের ধারে চরতে বেরিয়েছে। ষষ্ঠীপদ চোখ দুটো বুজে আবার তখন মন দিয়ে গঙ্গাস্তব করতে লাগল একমনে। মা, পতিতোদ্ধারিণী, গঙ্গে…
*
চকবাজারে তখন সন্ধে হয়-হয়। সড়কের দু’ধারের দোকানে দোকানে রোশনাই। খুশবু তেল তৈরি করত সারাফত। সারাফত আলির তিনপুরুষের খুশবু তেলের দোকান। গুলাবি আতর মাখানো তুলে কানের ভেতর লাগিয়ে দোকানে আগরবাতি জ্বেলে দিয়েছে। জ্বেলে দিয়ে গড়গড়ায় তামাক খাচ্ছে। আগরবাতির ধোঁয়া আর তামাকের ধোঁয়া মিশলে আর একরকম নতুন গন্ধের সৃষ্টি হয়। সেই গন্ধতেই মৌতাতটা জমে সারাফত আলির। হঠাৎ তামাক টানতে টানতে একটা স্বপ্নের ঘোর যেন সারাফতের চোখের ওপর নেমে এল। কেয়াবাত কেয়াবাত! সামনে দিয়ে যেন ঝালরদার পালকি চলেছে একটা। আর তার ভেতরে যেন এক জরিদার ওড়নি ঢাকা চাঁদনি চলেছে বাইরে উঁকি দিতে দিতে।
স্বপ্নই বটে! আগরবাতির ধোঁয়ার স্বপ্ন। খুশবু তেলের স্বপ্ন। আগরাইয়া তামাকুর ধোঁয়ার স্বপ্ন। কেয়াবাত! কেয়াবাত।
কিন্তু হঠাৎ নেশাটা কেটে গেছে। স্বপ্ন নয় তো৷ এ যে চলেছে আসলি ঝালরদার পালকি, নবাবের ফৌজি সেপাই চলেছে।
