পালাব কেন? কী দোষটা করলুম?
ভৈরব বললে–না পালালে আমার কী? আমি পালালুম
বলে ভৈরব নিজের তলপিতলপা নিয়ে চলে যাচ্ছিল। ষষ্ঠীপদ সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়াল। বললে–এই পালাচ্ছিস যে বড়? আমার পাওনাগণ্ডার কী হবে?
আপনার আবার পাওনাগণ্ডার কী মুনশিবাবু, অ্যাদ্দিনের মাইনে নিলুম না, এর মধ্যে আপনার পাওনাগণ্ডাটা হল কীসের? হাতে কি একটা পয়সা পেইছি আমি?
সেই সোরার গদির মধ্যে ষষ্ঠীপদ ভৈরবের গলায় গামছা দিয়ে আটকে ধরেছে।
আজ্ঞে, পাওনাগণ্ডা যা হিসেব হয়, পরে আপনি নেবেন গুনে, এখন তো আগে প্রাণে বাঁচতে দিন।
হঠাৎ এতক্ষণে নজরে পড়ল আধো-অন্ধকারের মধ্যে মাঠের ওপর দিয়ে সব লোক গঙ্গার দিকে দৌড়োচ্ছে। কোলে ছেলে, হাতে পোঁটলা, মাথায় ঝুড়ি। কী হল গো? কী হল? কোথায় যাওয়া হবে? তাদের তখন আর উত্তর দেবার সময় নেই। একদিন বর্গিদের অত্যাচারে গ্রাম থেকে পালিয়ে এসে এখানে ঘরবাড়ি বেঁধে বসবাস শুরু করেছিল, আবার এখান থেকেও নবাবের অত্যাচারে পালিয়ে যেতে হচ্ছে। গরিব প্রজাদের কোথাও গিয়েই শান্তি নেই গো, কোনও যুগেই শান্তি নেই রাজায় রাজায় লড়াই বাধলেই উলুখড়ের প্রাণ যাবে। উলুখড়েরা এ-দেশ থেকে ও-দেশে প্রাণ বাঁচাতে প্রাণান্ত করবে। আর ষষ্ঠীপদরা সেই সুযোগে ভৈরবদের গলায় গামছা দিয়ে টাকাকড়ি সব শুষে নেবে।
আবার ওদিক থেকে কারা যেন সব হইচই করে চেঁচিয়ে উঠল।
ওই শুনুন কত্তা, নবাবের সেপাইরা এসে পড়ল বলে! এখন ছেড়ে দ্যান আমাকে
ষষ্ঠীপদর কী মনে হল। বললে–তবে তোর ট্যাঁকে কী আছে দেখি—
ট্যাঁকে কী থাকবে কত্তা কানাকড়িটাও তাঁকে নেই আজ এই দেখুন
ভৈরব নিজের ট্যাঁক উপুড় করে দেখালে। ট্যাঁকটা ঝেড়ে দেখেও ষষ্ঠীপদর যেন সন্দেহ গেল না। বললে–তা হলে সেদিন যে তোকে তিনটে টাকা দিলুম, সেটা কোথায় গেল?
আজ্ঞে, সে তো আমার হক্কের টাকা, সে আমি খরচা করে ফেলেছি!
এই সাত দিনের মধ্যে তিন টাকা খরচা হয়ে গেল? তুই যে দেখছি বেভারিজ সাহেবের ঘাড়ে…
আজ্ঞে, দেনা ছিল কিছু, তাই শোধ করেছি তিন টাকা!
ততক্ষণে গোলমাল আরও বেড়ে উঠেছে। গঙ্গার ঘাটের দিকে কয়েকটা জাহাজ পাল তুলে দিয়েছে। ফিরিঙ্গি সাহেবরা হুড়মুড় করে উঠছে সবাই তাইতে। দূর গোবিন্দপুরের দিকেও সবাই দৌড়োচ্ছ।
ষষ্ঠীপদর হঠাৎ কী মনে হল। ভৈরবকে একটা লাথি মারলে পা দিয়ে, বললে–যাঃ–তোকে ছেড়ে দিলুম–
তারপর মনে পড়ল এ-সময়ে মাথা ঠিক না রাখলে সব গোলমাল হয়ে যায়। বিপদের দিনে যে মাথা ঠিক রাখতে পারে, সে-ই তো জেতে। তাড়াতাড়ি ষষ্ঠীপদ তহবিলটা ভাল করে দেখলে। সাহেব আগের দিন এসে সব টাকাকড়ি হিসেব করে দিয়ে গিয়েছে। মনে হল, আর তো কিছুক্ষণ, তারপরেই নবাবের ফৌজি সেপাই এসে পড়বে। তখন হয়তো দাউদাউ করে জ্বলবে এই গদি। ষষ্ঠীপদ আর দাঁড়াল না। মালকেঁচা মেরে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। এই তো সুযোগ। বর্গিদের সময়েও লোকে যখন গাঁ ছেড়ে পালাত, ষষ্ঠীপদ তখন তাদের সঙ্গে পালাত না। ছেড়ে ফেলে যাওয়া ফাঁকা বাড়িগুলোর মধ্যে ঢুকে পড়ত ষষ্ঠীপদ। ঢুকে খুঁজে বেড়াত কোথায় বাসনকোসন আছে, কোথায় সোনাদানা আছে; এমনি করে অনেকবার অনেক জিনিস পেয়েছে ষষ্ঠীপদ। জীবনের শুধু একটা মানেই জানত সে। টাকা থাকাটাই যে জীবনের একমাত্র থাকা এই চরম জ্ঞানটাই বুঝে নিয়ে ষষ্ঠীপদ রীতিমতো জ্ঞানী হয়ে উঠেছিল। তাই আর দেরি করলে না। সেই ভোর-ভোর অন্ধকারেই ষষ্ঠীপদ চকমকি ঠুকে আগুন জ্বালাল। তারপর পেছনের দরজা দিয়ে নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে এল। সেখান থেকে সোজা একেবারে শেঠের বাগান। শেঠেদের গঙ্গার জল বিক্রি করবার ব্যাবসা। বৈষ্ণবচরণ শেঠ সিলমোহর করা গঙ্গাজল ত্রৈলঙ্গ দেশে মোটা দরে বিক্রি করে অনেক টাকার মালিক হয়েছে। ষষ্ঠীপদ পেছনের খিড়কির দরজার কাছে গিয়ে কান পেতে রইল। তারপর হঠাৎ চিৎকার করে উঠল–আল্লা হো আকবর
ওদিক থেকে পালে পালে যারা আসছিল তারা যেন একটু থমকে দাঁড়াল। কিন্তু অন্য এক দিক থেকে তুমুল চিৎকার উঠল আল্লা হো আকবর
শেঠের বাগানের বুড়ো মুনশি হীরালাল সরকারের আচমকা ঘুমটা ভেঙে গেছে। চাকরবাকর-বেয়ারা সবাই জেগে উঠেছে। বৈষ্ণব শেঠের এলাহি কারবার। লাখ লাখ টাকার কারবার করে শেঠেরা শেষকালে ফিরিঙ্গি কোম্পানির দালালও হয়েছিল।
হীরালাল মুনশি ষষ্ঠীপদকে দেখে হতবাক।–আরে তুই? তুই এই অসময়ে কোত্থেকে?
যষ্ঠীপদ তখন মরিয়া হয়ে উঠেছে–হুজুর, সর্বনাশ হয়ে গেছে। নবাব লড়াই শুরু করে দিয়েছে–সেপাই এসে গিয়েছে ওই শুনুন
হীরালাল চারদিকে চেয়ে দেখলেন।
তোদের গদিতে আগুন জ্বলছে না?
হা হুজুর, সাহেব গদিতে ছিল রাত্তিরে, সেপাইরা সাহেবকে খুন করে গদিতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, তাই আপনাকেও সাবধান করে দিতে এলাম
ষষ্ঠীপদ আগে থেকেই হাঁফাচ্ছিল, এবার খবরটা শুনে হীরালাল সরকারও থরথর করে কাঁপতে লাগল।
তাই আমি বলতে এলাম আজ্ঞে, যদি কর্তারা কেউ থাকে গদিতে—
তুই বেঁচে থাক বাবা, খবরটা দিলি ভাল করলি! এখন কী করি? তহবিলে যে অনেক টাকা রয়েছে–
ষষ্ঠীপদ বললে–ওগুলো সঙ্গে করে নিয়ে যান টাকা কি ফেলে রেখে যেতে আছে? চাকরবাকরদের বলুন, সিন্দুক খুলে পোঁটলা বেঁধে সঙ্গে নিয়ে যেতে
আরে বাবা, সে-যে অনেক টাকা রে, সে-সব নিতে গেলে যে আর প্রাণে বাঁচবনা-ও থাক, কপালে থাকে তো থাকবে, নয়তো থাকবে না
