সেপাই দু’জন হো হো করে হেসে উঠেছে।
তুমি মহারাজের কাছে কিনা চাইতে গেলে মুগের ডাল? আর কোনও দামি চিজ চাইতে পারলে না দাসমশাই?
উদ্ধব দাস বললে–আমার কাছে সেপাইজি মুগের ডালও যা নবাবের নবাবিও তাই। মুগের ডাল খেয়ে আরাম করে আমি তো তবু ঘুমিয়ে পড়তে পারি, কিন্তু নবাবি? নবাবি পেলে কি কারও ঘুম থাকে আজ্ঞে? বশির মিঞাকে তো তাই বলেছিলুম
কান্ত যেন লাফিয়ে উঠেছে বশির মিঞাকে তুমি চেনো?
চিনব না? আমিও রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই, বশির মিঞাও ঘুরে বেড়ায়। আমাকে বশির মিঞা বললে–তুমি তো হিল্লি দিল্লি ঘুরে বেড়াও উদ্ধব দাস, চরের চাকরি নেবে? আমি জিজ্ঞেস করলাম–কীসের চাকরি? বশির বললে–নিজামতের চরের চাকরি! শুনে আমি বললাম আমি তোর চাকরির মুখে পেচ্ছাব করে দিই!
সেপাই দুটো ভয়ে চারদিকে চেয়ে দেখলে। কেউ শুনতে পায়নি তো!
জিজ্ঞেস করলে–হ্যাঁগো, তুমি বললে–ওই কথা?
তা বলব না? আমি কি কাউকে ভয় করি নাকি? আমি ভয় করতে যাব কোন দুঃখে শুনি? আমার মাগ আছে, না ছেলেপুলে আছে যে ভয় করতে যাব? শেষকালে কোন দিন হুকুম হবে–যাও, মহারাজ কেষ্টচন্দ্রের দ্বিতীয় পক্ষের বউকে ধরে নিয়ে এসো গে। তখন?
উদ্ধব দাসের কথাগুলো শুনতে শুনতে কান্তর যেন কেমন নিজেকে বড় নিঃসহায় নিঃসম্বল মনে হল। মনে হল এই উদ্ধব দাসও হয়তো তার চেয়েও সুখী! এই উদ্ধব দাসও জীবনের সার তত্ত্বটা জেনে গেছে। উদ্ধব দাসের কিছু না থেকেও যেন সে সকলের সব থাকার গৌরবকে ম্লান করে দিয়েছে। যে-চাকরি সে বশির মিঞার কাছে সেধে নিয়েছে, সেই চাকরিই উদ্ধব দাস লাথি মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। উদ্ধব দাসের বাইরের ভাড়ামির আড়ালে যেন আর একটা নিরাসক্ত মানুষ বড় বড় দুটো চোখ নিয়ে পৃথিবীকে দেখতে বেরিয়েছে। উদ্ধব দাসের এই ঘুরে বেড়ানোও যেন তার আর একরকমের দর্শন। সে পৃথিবীকে দেখে দেখে যেন আরও অনেক কিছু জানতে চায়।
উদ্ধব দাসকে আড়ালে ডাকলে কান্ত। আড়ালে ডেকে চুপি চুপি জিজ্ঞেস করলে একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করতাম উদ্ধব দাস। তুমি ঠিক ঠিক উত্তর দেবে?
বলুন প্রভু?
আমার মনে হচ্ছে, তোমার বউ কোথাও পালায়নি উদ্ধব দাস, নিশ্চয় কোথাও লুকিয়ে আছে। কারও বাড়িতে কি কোনও আত্মীয়স্বজনের কাছে। একদিন না একদিন সে বেরোবেই। ধরো যদি কখনও তাকে খুঁজে পাও, তখন তুমি তাকে নেবে?
উদ্ধব দাস যেন এতক্ষণে স্পষ্ট করে প্রথম কান্তর দিকে চেয়ে দেখল।
কিন্তু আপনি কে প্রভু? আপনি কেন একথা জিজ্ঞেস করছেন?
কান্ত একটু ভেবে বললে–আমার স্বার্থ আছে বলেই জিজ্ঞেস করছি
কিন্তু সবাই তো প্রভু আমার বউ পালিয়ে গেছে বলে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করে, কেউ তো এমন করে বলেনি কখনও
তা না বলুক, তাদের কথা আলাদা! তুমি নেবে কি না বলো! আমি একটা কাজে এখন মুর্শিদাবাদে যাচ্ছি। তারপরই হাতিয়াগড়ে যাব, তখন যদি খুঁজে পাই তো তুমি তাকে নেবে?
কিন্তু আপনি প্রভু কেন আমার জন্যে খামোক কষ্ট করতে যাবেন? আপনার কীসের দায়? বউ পালিয়ে গেছে বলে তো আমার কোনও কষ্ট হচ্ছে না–
কান্ত বললে–তোমার কষ্ট না হোক, তোমার সেই বউয়ের তো কষ্ট হতে পারে। তার জীবনটা তো চিরকালের মতো নষ্ট হয়ে গেল
তার জীবন নষ্ট হয়ে গেলে আপনার কীসের দায় প্রভু?
কান্ত একটু ভেবে বললে–দায় আছে বলেই তো বলছি তোমাকে, তোমাদের দুজনের চেয়ে আমারই যে বেশি দায়?
কেন? আপনার দায় কেন প্রভু?
হঠাৎ পেছন থেকে ডাক এল-রানিবিবি আপনাকে এত্তেলা দিয়েছেন বাবুজি!
রানিবিবি! কান্ত উদ্ধব দাসকে বললে–তুমি এখানে একটু দাঁড়াও দাসমশাই, আমি এক্ষুনি আসছি বুঝতেই তো পারছ নিজামতের চাকরি, আমি আসছি এখুনি
বলে কান্ত সরাইখানার ভেতরে চলে গেল।
২.০৩ বেভারিজ সাহেব
বেভারিজ সাহেবের সোরার গদিতে তখন ষষ্ঠীপদ ঘুম থেকে সবে উঠেছে। হিসেবত্তরটা ঠিক না রাখলে আখেরে বড় মুশকিল হয়। একবার যদি সাহেবের সন্দেহ হয় তো মুনশিগিরি ঘুচে যাবে। তিরিশ টাকাকে কী করে তিন টাকা করতে হয় তার কসরত ষষ্ঠীপদ জানে।
ষষ্ঠীপদ মুখে বলে–আমি বাপু ধর্ম করতে এসেছি, ধর্ম করে যাব! তাতে যদি আমার লোকসান হয় তো হোক! আমার বাপের কাছে আমি একটা জিনিস শিখেছি বাপু যে, অধর্মের পয়সা থাকে না
সেই অধর্মকেই ধর্ম বানাতে হলে কিন্তু হিসেবটি পাকা রাখা চাই। হিসেবের গোলমালটি করেছ কি তোমার সব নষ্ট!
ভৈরব দাস ওইটে বোঝে না।
ভৈরব বলে–ধর্ম আবার কী কত্তা? পয়সাকড়ি কামিয়ে গঙ্গাস্নান করে তবে তো ধম্ম করব। এটা তো আপনিই শিখিয়ে দিয়েছেন! এটা কি ধর্ম করবার বয়েস?
দুর হ, দুর হয়।
ষষ্ঠীপদ তাড়া দেয় ভৈরবকে। বলে–তুই নরকে যাবি ভৈরব, ডাহা নরকে যাবি তোর আর মুক্তি নেই রে
কিন্তু সেদিন এক কাণ্ড ঘটল। সকালবেলা ভৈরব আসবার আগেই হিসেবের খাতাগুলো নিয়ে বসেছিল ষষ্ঠীপদ। এমন সময় ভৈরব দৌড়তে দৌড়োতে এল। তখনও হাঁফাচ্ছে। বললে–শিগগির পালান কত্তা, শিগগির পালান–শিগগিরবেভারিজ সাহেব পালিয়েছে, কেল্লার সেপাইরাও পালিয়েছে, লাটসাহেবও পালিয়ে গেছে–আপনি পালান কত্তা, পালান।
সত্যিই ষষ্ঠীপদ প্রথমে বুঝতে পারেনি অতটা। শুধু ষষ্ঠীপদকে দোষ দিয়েই বা কী হবে, কলকাতার কেউই তখন বুঝতে পারেনি। এমন যে হবে, এ-যেন সকলের ধারণার বাইরে। গভর্নর ড্রেক, ক্যাপ্টেন গ্র্যান্ট, জেনারেল লিসবন, বেভারিজ সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছিল। ষষ্ঠীপদ অনেক দিন ধরে মুনশিগিরির চাকরিটার জন্যে হাঁ করে ছিল। সবে হাতে দুটো মাগনা পয়সা আসতে শুরু করেছিল, এমন সময় এ কী বলে ভৈরব!
