খুব ভালবাসে! রসের গান শুনতে কার না ভাল লাগে আজ্ঞে! আমি রসের গান শুনিয়েছিলুম পিরিতের কথা আর বোলো না, দ্বিতীয় পক্ষের রানি যে! বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা যে, ও কম্মে তো ঢুঁ ঢুঁ, তাই কেবল রসের গান শুনেই পেট ভরায়
তুমি দেখেছ ছোটরানিকে?
আমি কী করে দেখব আজ্ঞে, আমি যে অতি দীন-হীন ব্যক্তি
বলেই হঠাৎ গান গেয়ে উঠল–
আমি মা অতি দীন, তনু ক্ষীণ, হল দশার শেষ।
কোন দিন মা রবি-সুতে ধরবে এসে কেশ!
কান্ত ততক্ষণে অধীর হয়ে উঠেছে। বললে–তোমার গান থামাও, আমার কথার উত্তর দাও। আগে–ছোটরানিকে তুমি দেখেছ?
দেখিনি, হরিপদর কাছে ছোটরানির কথা শুনিচি।
কী শুনেছ?
উদ্ধব দাস সেই সব পুরনো কথা বলে গেল। হরিপদর কাছেই কথাগুলো শোনা। চাকদহর শ্রীনিবাস মুখুটির একমাত্র মেয়ে রাসমণি! ছোটমশাই বজরায় করে যাচ্ছিলেন। এমন সময় বড় বউরানির নজর পড়ল ঘাটের দিকে। ঘাটে তখন চান করছিল রাসমণি। মা নেই, ভাই নেই, বোন নেই। সংসারে আপন বলতে আর কেউ নেই। সেই বউ শ্বশুরবাড়ি এসে পর্যন্ত আর বাপের বাড়ি যেতে পায়নি। বাপ শ্রীনিবাস মুখুটি মেয়ের বিয়ের পরই মারা গিয়েছিল। তারপর সেই যে ছোটরানি হাতিয়াগড়ের রাজবাড়িতে এসে ঢুকল, আর বেরোতে পারেনি। একবার শুধু কী শখ হয়েছিল, ছোমশাইয়ের সঙ্গে মুর্শিদাবাদে গিয়েছিল নবাবের নাতির বিয়েতে। সেই তখন থেকেই দুর্গা আছে সঙ্গে। দুর্গাই চুল বেঁধে দেয়, দুর্গাই ছোটরানিকে পুতুলের মতো দিনরাত সাজাত গোজাত।
দুর্গা ছোটরানির চুল বাঁধতে বাঁধতে বলত–কী চুলই হয়েছে তোমার বউরানি, যেন মেঘ, মেঘলা চুল তোমার
পিঠের ওপরে কাপড়টা সরে যেতেই দুর্গা একদিন বললে–ওমা, দেখি দেখি, পিঠে তোমার দাগ কীসের বউরানি?
ছোটরানি খিলখিল করে হেসে উঠেছিল। বলেছিল–ও আর তোকে দেখতে হবে না, তুই চুল বাঁধ
ওমা, এ যে দাঁতের দাগ গো!
ছোট বউরানি হাসছে দেখে দুর্গা বলেছিল–ছোটমশাই কি তোমার পিঠেও দাঁত বসায় নাকি গো?
ছোট বউরানি বলেছিল–তোর ছোটমশাইয়ের গুণের ঘাট নেই তো
দুর্গা বলেছিল–আহা, তুমি আদর চেইছিলে, জন্ম জন্ম এমন আদর পাও তুমি বউরানি! সোয়ামির আদর কি যে-সে জিনিস গো, বলে সোয়ামি হেন জিনিস যে হতভাগী পায়নি সে এর কদর কেমন করে বুঝবে বলো–
বউরানি বলেছিল–মোটে ঘুমুতে দেয় না তোর ছোটমশাই, এমন বজ্জাতি করে—
আহা, তা না-ই বা দিলে ঘুমোতে, এয়োতি মানুষ, মেয়েমানুষের আর কী চাই?
তা ঘুম না হলে মানুষ বাঁচে? তাই তো সকালবেলা গা ম্যাজম্যাজ করে, উঠতে পারিনে বিছানা ছেড়ে
কান্তর শুনতে খুব ভাল লাগছিল। বললে–তারপর?
আজ্ঞে, হরিপদর তো কোনও কাজ নেই, আমি অতিথিশালায় গেলেই আমার কাছে এসে গল্প করত। আমি বলতাম–বাড়ির ভেতরের গল্প আমার কাছে কেন করো বলল তো? তা হরিপদ বলত–দুর্গা যে আমাকে সব এসে বলে গো, আর শুনে কারও কাছে তো বলা চাই! তা ওই সব শুনতাম আর রসের গান বাঁধতুম! কিন্তু একদিন নিজেই বাঁধা পড়ে গেলুম–
সেপাইরা এ-গল্প আগেই শুনেছিল। কান্ত জিজ্ঞেস করলে–কী রকম?
সে এক কাণ্ড প্রভু। একদিন ছোটমশাইয়ের নফর শোভারামের মেয়ের বিয়ে। বর আসবার কথা ছিল কলকাতা থেকে, সেবর ঠিক সময়ে আসতে পারেনি।
কেন? আসতে পারেনি কেন?
উদ্ধব দাস বললে–না এলে যে আমার সর্বনাশ হয় তাই আসতে পারেনি। আমি ঘুমোচ্ছিলাম অতিথশালার দাওয়ায়, সে-ই আমাকে এসে ডেকে নিয়ে গিয়ে সেই মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলে সেই রাত্তিরে–! কপালের গেরো না থাকলে এমন সর্বনাশ হয় কারও প্রভু?
তা তুমি তাকে বিয়ে করলে?
আজ্ঞে, সে প্রভু ওই নামে মাত্তরই বিয়ে। সম্প্রদানটাই শুধু হল, তারপর বাসরঘরে একপাল মেয়ের মধ্যে বসে আছি, আমাকে প্রভু তারা সবাই বললে–কিনা বউকে কোলে করতে
তারপর? তুমি কোলে করলে নাকি?
উদ্ধব দাস বললে–আত্তে প্রভু, আমি তখন ভাবছি, কার ভোগ্য জিনিস কে ভোগ করবে। অমন সুন্দর বউ কি বাঁদরের গলায় মানায় প্রভু? আপনিই বলুন?
তা তুমি কোলে করলে কি না তাই বলো না!
কোলে করব কী করে আজ্ঞে, তার আগেই দেখি কী বউ তখন হাপুস নয়নে কাঁদছে গো
কাঁদছে? কাঁদছে কেন?
প্রভুই জানে কেন কাঁদছে। ওই কান্না দেখে কি আর তখন বউকে কোলে করতে কারও ইচ্ছে করে আজ্ঞে? আমারও তো মন বলে একটা পদার্থ আছে! কান্না দেখে আমার বড় মায়া হল প্রভু! আবার লোভও হল!
লোভ হল কেন?
আজ্ঞে, লোভ হবে না? আমি কুচ্ছিত হলে কী হবে, আমারও তো কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ মদ-মাৎসর্য আছে! অমন গোলাপ ফুলের মতো বউ পাশে বসে কাদবে আর আমি চুপ করে দেখব? আমার বুঝি কান্না আসতে নেই?
উদ্ধব দাস জীবনে কখনও কাঁদে না। কথা বলতে বলতে তারও হয়তো চোখ দুটো ছলছল করে উঠছিল। হঠাৎ হেসে ফেললে। বললে–আমি তখন মনে মনে ওই গানটা বাঁধলুম আজ্ঞে আমি রব না ভব-ভবনে–
তারপর?
তারপর প্রভু, ভাবলুম আমাকে পছন্দ হয়নি বউয়ের। আমাকে তো আজ্ঞে কারওই পছন্দ হয় না, আমার পছন্দ হবারই কিছু নেই। আবার ভাবলুম হয়তো কলকাতার বরের জন্যে মন-কেমন করছে
কেন? কলকাতার বরকে বুঝি ভাল দেখতে?
আমার চেয়ে সবাইকে ভাল দেখতে প্রভু! আমি কি মানুষ আজ্ঞে, আমার না আছে চাল, না আছে চুলো। আমি মানুষই নই। তাই বউটা পালিয়ে যাবার পরই প্রভু আমি রাস্তায় বেরিয়ে পড়লুম। সোজা কেষ্টনগরে গিয়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় গেলুম। শিবনিবাসে নিয়ে গেলেন মহারাজ বললেন, চাকরি নেবে তুমি উদ্ধব দাস? আমি বললুম-আমার বউ পালিয়ে গেছে, চাকরি আমি কার জন্যে নেব প্রভু? কার জন্যে দাস বৃত্তি করব। সেখানে গিয়ে গোপাল ভাঁড় মশাইকে হেঁয়ালিতে হারিয়ে দিলুম, রায় গুণাকর ভারতচন্দ্র আমার ছড়ার তারিফ করলেন। আমাকে মহারাজ জিজ্ঞেস করলেন-তুমি কী চাও উদ্ধব! আমি বললুম-মুগের ডাল
