উদ্ধব বলেছিল–কিন্তু আমি তো আপনার খোশামোদ করতে পারব না ভারতচন্দ্রের মতো
তা ভারতচন্দ্র কি আমায় খোশামোদই করে বলতে চাও?
না করলে তার চাকরি আছে কী করে? আপনি তো আর মিছিমিছি তাকে তার গুণ দেখে উপাধি দেননি!
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র মজা পেয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন–শুধু গুণের বুঝি কদর নেই?
আজ্ঞে আপনি নিজেই তা ভালরকম জানেন, দিল্লির বাদশার খোশামোদ না করলে কি আপনিই মহারাজ হতে পারতেন।
তুমি তো বড় মুখফোঁড় হে!
না হুজুর, আমি যার কাছে চাকরি করি, তাকে খোশামোদ করতে হয় না, খোশামোদনা করেই আমি উপাধি পেয়েছি একটা।
তোমার আবার উপাধি আছে নাকি? তাজ্জব কথা তো! কী উপাধি?
আজ্ঞে, আমার উপাধি ভক্ত-হরিদাস!
তোমার মালিক কে?
উদ্ধব দাস এবার গেয়ে উঠল
ওই দেখো শ্যামনবঘন উদয় গগনে।
এলেন আমার জগবন্ধু রথ-আরোহণে ॥
ওই-পদে রেখেছে মতি, ব্রহ্মা ইন্দ্র পশুপতি।
ভবভার্যা ভাগীরথীর জন্ম ওই চরণে ॥
গলে বনফুল হার, শিরে শিখিপুচ্ছ যার,
দ্বিভুজ মুরলীধর পীতবাস পরনে ॥
গান থামিয়ে উদ্ধব দাস বললে–শুনলেন তো প্রভু, আমার মালিক কে? সেইজন্যে আমি কারও কাছে কিছু চাই না প্রভু, চাইলে চাই মুগের ডাল, কিংবা পান্তা ভাত, কি একদলা নুন
যেখানে যেত উদ্ধব দাস, সেখানেই এইরকম করে কথা বলত। খলু সংসারে কে কাকে কী দিতে পারে গো! তোমরা সবাই খেতাব চাও, মনসবদারি চাও, টাকা চাও, মেয়েমানুষ চাও, আর আমি কিছুই চাই না। চাইলেই দুঃখ, না-চাইলেই সুখ। আমি কিছুই চাই না, তাই সব পাই। তোমরা সব কিছু চাও বলেই তোমাদের কষ্টের আর শেষ নেই।
মোল্লাহাটির মধুসূদন কর্মকার বলেছিল–তা হলে তুমি বিয়ে করতে গেলে কেন দাসমশাই?
উদ্ধব দাস বলেছিল-মতিভ্রম ভায়া, মতিভ্রম-
-তা তোমার কষ্ট হয় না মাগের জন্যে!
হয় বই কী!
কী রকম কষ্ট হয়?
উদ্ধব দাসের তখনই আবার ছড়া পেয়ে যায়। বলে তবে শোনো হে ভায়া–
বিষয়-শূন্য নরবর, বারি-শূন্য সরোবর, বস্ত্র-শূন্য বেশ।
দেবীশূন্য মণ্ডপ, কৃষ্ণশূন্য পাণ্ডব, গা-শূন্য দেশ ।
জলশূন্য ঘট, শিব-শূন্য গেহ, কর্পূর-শূন্য ভাণ্ড ॥
শিকল-শূন্য তালা, ভজনশূন্য মালা, দৃষ্টি শূন্য নয়ন।
ভূমি-শূন্য রাজার রাজ্য, বিদ্যা শূন্য ভট্টাচার্য, নিদ্রা-শূন্য শয়ন । ছড়াটা বলেই উদ্ধব দাস হোহো করে হেসে উঠল। বললে–দেখলে তো, আমি খোশামোদ করিনে তাই, নইলে আমিও রায়গুণাকর হতে পারতাম গো। আমারও বিদ্যে আছে–
তারপর হঠাৎ পোঁটলটা বগলে নিয়ে উঠে বললে–যাই গো অনেক দূর যেতে হবে
কোথায় যাবে, এত সকালে?
যেখানে দু’চোখ যায়। শ্বশুরবাড়ি নেই বলে কি খলু সংসারে যাবার জায়গার অভাব আছে ভায়া?
সেই হাঁটতে হাঁটতেই এখানে এসে পড়েছিল উদ্ধব দাস। এই কাটোয়ার সরাইখানার সামনে। তখন সরাইখানার সামনে সেপাই দুটো গাছতলায় খেয়েদেয়ে জিরোচ্ছে। বন্দুকটা পাশে রেখে সেপাই দুটো মাটিতে চিতপাত হয়ে শুয়ে পড়েছে।
উদ্ধব দাসের পেট তখন খিদেয় চো চো করছে। বললে–কী গো, সেপাই বাবাজীবন, কার পালকি? কোন বিবিজান চলেছে?
সেপাইরা উদ্ধব দাসকে চিনত। বেশ মানুষ। গান না শুনতে চাইলেও গান গাইবে, কিংবা ছড়া কাটবে, হেঁয়ালি বলবে। খেতে দাও আর না-দাও হৃক্ষেপ নেই। উদ্ধব দাস কাউকে হৃক্ষেপ করে না। তার কাছে রাজা-মহারাজ নবাব বাদশাও যা, রাস্তার বোস্টম ভিখিরিও তাই। একেবারে বলা-নেই কওয়া-নেই সটান তাদের মধ্যেই বসে পড়ে বললে–একটা নতুন গান বানিয়েছি—শোনো–
বলে আরম্ভ করলে
আমি রব না ভব-ভবনে
শুনো হে শিব শ্রবণে ॥
যে-নারী করে নাথ হৃদিপদ্মে পদাঘাত
তুমি তারই বশীভূত আমি তা সব কেমনে।
একজন সেপাই বলে উঠল–আরে দাসমশাই যে আবার খেদের গান গাইছে, কেউ বুঝি তোমার বুকে লাথি মেরেছে গো?
আর একজন বললে–তা জানিস না বুঝি, ওর বউ যে বাসরঘর থেকে পালিয়ে গেছে!
তাই নাকি? তারপর? তারপর?
পতিবক্ষে পদ হানি ও হল না কলঙ্কিনী
মন্দ হল মন্দাকিনী ভক্ত হরিদাস ভণে।
গান তখন বেশ জমে উঠেছে। সেপাইরা শুনছে আর হাতে তাল দিচ্ছে। আশপাশের গাঁয়ের লোকও জুটেছে। পালকি-বেহারারাও জুটেছে। কান্ত ঠিক সেই সময়ে এসে হাজির হল। রানিবিবির ঘরে এতক্ষণ কথা বলতে বলতেই গানটা কানে গিয়েছিল। বলেছিল–দেখে আসুন তো কে গান গাইছে ওখানে?
বেড়ে গান বানিয়েছ তো দাসমশাই! তা তোমার বউ পালাল কেন হে?
কান্তর কানে কথাটা গিয়েছিল। সোজা গিয়ে জিজ্ঞেস করলে কার বউ পালিয়েছে বললে–সেপাইজি?
উদ্ধব দাস হাসতে হাসতে বললে–আমার আজ্ঞে।
সেপাইটা তার আগেই বললে–হুজুর, ও পাগলা-ছাগলা লোক, ও গিয়েছে বিয়ে করতে! তা ওর বউ পালাবে না তো কার বউ পালাবে!
উদ্ধব দাস হাসতে হাসতে বললে–তা পালিয়েছে বেশ করেছে, আমার বউ পালিয়েছে তোত তোমাদের কী? বউ না পালালে কি এমন গান বাঁধতে পারতুম?
কান্ত জিজ্ঞেস করলে কোথায় বিয়ে করতে গিয়েছিলে তুমি?
আজ্ঞে হাতিয়াগড়ে!
হাতিয়াগড়ের নামটা শুনেই কান্তর বুকটা ধক করে বেজে উঠল।
আমি কি বিয়ে করতে গিছলাম বাবাজীবন, আমি গিছলাম রাজবাড়ির অতিথশালায় দুটো খেতে আর হাতিয়াগড়ের ছোটরানি আছেন, তাকে দুটো রসের গান শোনাতে!
হাতিয়াগড়ের ছোটরানি?
কান্ত আরও অবাক হয়ে গিয়েছে। যেন এক মুহূর্তে উদ্ধব দাস কান্তর একান্ত আপন লোক হয়ে গেল। কান্ত এবার আরও কাছে সরে এল। তারপর উঁচু হয়ে সামনে বসে পড়ল। বললেছোটরানি বুঝি রসের গান শুনতে ভালবাসে?
