*
দুটো নদী এসে মিশেছে কাটোয়াতে। একদিকে অজয় আর একদিকে গঙ্গা। ডিহিদারের বজরা এসে পঁড়াল। এখান থেকে পালকিতে যেতে হবে। ডিহিদারের বজরা আবার খালি ফিরে যাবে ডিহিদারের কাছে। এবার আবার নতুন সেপাই, নতুন বন্দুক নিয়ে এসে হাজির হয়েছিল নতুন ডিহিদার।
কিছু কিছু লোক বজরা থেকে মেয়েমানুষ নামতে দেখে ভিড় করেছিল। ডিহিদারকে দেখে তারা সরে গেল।
তারপর সরাইখানার ভেতর রানিবিবি ঢুকে গিয়েছিল। সে এক অস্বস্তিকর অবস্থায় কেটেছে। নদীর ঘাটে, রাস্তায় যে দেখেছে সে-ই কেবল জিজ্ঞেস করেছে–পালকিতে কাদের বউ যাচ্ছে গো?
কান্ত কোনও উত্তর দেয়নি। সেপাইরা, পালকির বেহারারাও কোনও উত্তর দেয়নি। হাতিয়াগড় থেকে বেরিয়ে সমস্তটা রাস্তা ঘুম হয়নি কান্তর। সরাইখানার একদিকটা জেনানামহল, আর একদিকটা মর্দানাদের জন্যে। বোরখাপরা বাঁদির ব্যবস্থাও করে রেখেছিল কোতোয়াল সাহেব। আগে দেখেছিল শুধু রানিবিবির একটা পায়ের গোছ। পালকি থেকে নামবার সময় দেখা গেছে। কিন্তু আজ পালকি থেকে নামবার সময় দেখা গেল মুখখানা। পালকি থেকে মাথা নিচু করে নামতে গিয়েই ঘোমটাটা খসে গিয়েছিল মাথা থেকে। কাটোয়ার সেই খাঁ খাঁ দুপুরের রোদে মুখখানা বুঝি আরও লাল হয়ে গেছে।
হঠাৎ বাঁদিটা এসে ডাকতেই কান্ত অবাক হয়ে গিয়েছিল। ধড়মড় করে বসে জিজ্ঞেস করেছিল আমায় ডেকেছেন? কেন?
তা জানিনে হুজুর।
তুমি ঠিক বলছ?
জি হাঁ।
তারপরে পেছন পেছন গিয়ে যেখানে পৌঁছুল সেখানে আর কেউ নেই। ঘরের মধ্যে একটা গালচের ওপর রানিবিবি একা বসে ছিল। কান্ত দরজার সামনে গিয়ে বললে–আপনি আমায় ডেকেছেন?
রানিবিবি পানের ডিবেটা হাতে তুলে নিয়ে বললো, কাল রাত্তিরে আমাকে ডাকছিলেন কেন?
কান্ত বললে–ডাকতুম না, আপনি আরাম করে ঘুমোচ্ছিলেন, আমার ডাকতে সত্যিই ইচ্ছে হচ্ছিল না, কিন্তু আমার ভয় হচ্ছিল হয়তো ডাকাত পড়বে, বদরগঞ্জের কাছে খুব ডাকাতির ভয় কিনা–তাই আপনাকে ডেকেছিলুম
ডাকাত? ডাকাতের কথা শুনে রানিবিবি যেন একটু হাসলেন।
আপনি হয়তো বিশ্বাস করছেন না, কিন্তু সত্যিই আমি বড় ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম
কিন্তু ভয় পেয়েছিলেন কার জন্যে? আমার জন্যে না আপনার জন্যে?
এর উত্তর দিতে গিয়ে কান্ত একটু বিব্রত হয়ে পড়ল। বললে–আপনার জন্যে?
রানিবিবি হাসতে হাসতে বললে–আমার জন্যে? আমার আবার ভয় কী? আমি তো এক ডাকাতের হাতেই যাচ্ছি, তা বদলে না-হয় বদরগঞ্জের ডাকাতের হাতেই যেতাম। আমার কাছে মুর্শিদাবাদের ডাকাতও যা, বদরগঞ্জের ডাকাতও তাই। বদরগঞ্জের ডাকাতরা কি আর বেশি খারাপ
কান্ত কথাটার ইঙ্গিত বুঝল।
বললে–দেখুন, আপনি হয়তো আমাকেও সেই ডাকাতদের দলে ফেলেছেন, কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি শুধু হুকুম তামিল করতে এসেছি, আমার মাত্র সাত দিনের চাকরি, পেটের দায়ে আমাকে এই চাকরি নিতে হয়েছে–আগে জানলে আমি একাজ নিতুমই না, কাল সারারাত আমি কেবল এই কথাই ভেবেছি
কেন? আপনি ঘুমোননি? সারারাত জেগে ছিলেন?
কান্ত বললে–ঘুম যে এল না, আমি কী করব? আমার কেবল মনে হচ্ছিল ক’টা টাকার জন্যে আমি হয়তো আপনার সর্বনাশ করছি
রানিবিবি পানের ডিবেটা খুলে একটা পান তুলে নিলেন।
কান্ত আবার বললে–ফিরিঙ্গি কোম্পানির চাকরিটা থাকলে, আমি সত্যি বলছি, এ চাকরিটা নিতুম । তা ছাড়া আমার তো আর কেউ নেই যে, তার কাছে গিয়ে থাকব! এক বুড়ি দিদিমা ছিল, বর্গিদের হাতে সে-দিদিমাও মারা গিয়েছে, তাই আমার এ-চাকরি নেওয়া ছাড়া কোনও উপায় ছিল না
তারপর একটু থেমে বললে–আমার কথায় যদি বিশ্বাস না হয় তো আর কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারেন! বশির মিঞা সব জানে!
বশির মিঞা? সে কে?
নিজামতের চর, সে-ই তো আমাকে এ চাকরিটা করে দিলে। কিন্তু আপনি মেয়েমানুষ, জিজ্ঞেস করবেনই বা কী করে। নইলে জানতে পারতেন আমার কথা সত্যি কি না। সে সব জানে! তাকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারতেন, আমি বেভারিজ সাহেবের সোরার গদিতে মুনশির কাজ করতাম, তিন টাকা মাইনে পেতাম, আমার নামও জানে সে, আমি মুসলমান নই, হিন্দু। আমরা বড়চাতরার সরকার, আমার বাবার নাম ঈশ্বর শশধর সরকার, আমার নাম কান্ত সরকার
কী নাম?
কান্ত আবার বললে–কান্ত সরকার
সঙ্গে সঙ্গে রানিবিবির হাত থেকে পানের ডিবেটা পাথরের মেঝের ওপর পড়ে ঝনঝন আওয়াজ করে উঠল। কান্তর মনে হল কাছাকাছি কোথাও কেউ তার নামটা শুনে আর্তনাদ করে উঠল যেন।
.
সরাইখানার সামনে তখন বেশ ছায়া-ছায়া। সোজা কেষ্টনগর থেকে হাঁটতে হাঁটতে সেদিন উদ্ধব দাস সেখানে এসে হাজির। উদ্ধব দাসের এই-ই নিয়ম। যখন যেখানে থাকে সেখানেই তার ঘর। গাছতলাই হোক আর একটা বোস্টমদের আখড়াই হোক, কিংবা রাজবাড়ির অতিথিশালাই হোক, একটা কিছু হলেই হল। না-হলেও কিছু আসে-যায় না। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র একবার বলেছিলেন–উদ্ধব, একটা চাকরি নেবে নাকি হে
উদ্ধব বলেছিল–চাকরি তো করি আমি মহারাজ
তার মানে?
উদ্ধব বলেছিল–আমি আপনার এখানে পড়ে থাকি বলে আপনি কি ভাবেন আমি বেকার? আমি যেখানে যাব সেখানেই সবাই আমার গান শুনে আমায় ঠাই দেবে–
তা নয়, আমার কাছে চাকরি করলে তোমাকে আর চিরকাল এরকম টো টো করে ঘুরে বেড়াতে হবে না–এই দেখো না, ভারতচন্দ্রকে রায়গুণাকর উপাধি দিয়েছি, মুলাজোড়ে ছ’শো টাকা আয়ের সম্পত্তি ইজারা দিয়ে দিয়েছি, সে আয়েশ করে পায়ের ওপর পা দিয়ে বসে বসে বিদ্যাসুন্দর লিখেছে, অন্নদামঙ্গল লিখেছে–
