তা আমাকেও তাই কর না-তুই! আমিও বেঁচে যাই তা হলে?
দুর্গা বললে–তা আমি যা বলব, তাই করবে তুমি?
তাই করব রে, তাই করব। তুই আমাকে বাঁচা!
দুর্গা বললে–তা হলে তুমি একটু বোসো, আমি মরালীকে পালকিতে তুলে দিয়ে আসি
তারপর সেই অন্ধকারের আড়ালে জাহাঙ্গিরাবাদের জরিপাড় শাড়ি-ঢাকা একটি যৌবন এসে পালকিতে উঠল। কে উঠল, কেন উঠল, তা কেউ জানল না। মাধব ঢালির পাহারা দেওয়া কাজ; সে শুধু জানল ভেতরবাড়ির রানিমহল থেকে কেউ উঠে চলে গেল। কে গেল, কেন গেল তা প্রশ্ন করা পাহারাদারের কাজ নয়। রাজা-রানির ব্যাপারে মাথা ঘামানো তার কাজ নয়। দুর্গা যখন নিজে এসেছে, তখন কৌতূহল প্রকাশ করা তার এক্তিয়ারের বাইরে।
.
আর ঠিক তার কিছুক্ষণ পরেই আবার ছোটমশাই এসে হাজির।
গোকুলকে দেখেই ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছিল মাধব ঢালি। সিংদরজাটা ফাঁক করে পাশে দাঁড়িয়ে সেলাম করলে।
সরে দাঁড়া না, দেখছিস ছোটমশাই এসেছেন।
ছোটমশাই ভাবতে ভাবতেই আসছিলেন সারা রাস্তা। মাধব ঢালিকে দেখেই আর কৌতূহল চাপতে পারলেন না। জিজ্ঞেস করলেন–কেমন আছিস সব?
আজ্ঞে, ভাল ছোটমশাই।
কোনও গণ্ডগোল টণ্ডগোল ঘটেনি তো?
আজ্ঞে, গণ্ডগোল হবে কেন? আমি আছি কী করতে?
এরপর আর দাঁড়ালেন না। গোকুলের পেছন পেছন ভেতরে ঢুকে গেলেন। আসবার সময়। বদরগঞ্জের কাছে ডাকাতের উৎপাতের ভয় ছিল। তাই তাড়াতাড়ি বজরা চালিয়ে আসতে বলেছিলেন। বাড়ির ভেতর ঢুকে যেন নিশ্চিন্তির নিশ্বাস ফেললেন একটা। তখনও কেউ জাগেনি। ছোটবউয়ের মহলের দিকটায় অন্ধকার। ওদিকে পরে গেলেই চলবে। তার আগে বড়বউকে খবরটা দেওয়া দরকার। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র নিজে কালীঘাটে যাচ্ছেন, গিয়ে একটা কিছু ব্যবস্থা করবেন কথা দিয়েছেন।
বউবউয়ের ঘরের সামনে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিলেন–বড়বউ, বড়বউ–আমি…
*
ওদিকে কালীঘাটের মন্দিরের ঘাটেও মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের বজরা এসে ভিড়েছে। এখানে পুজোর ভিড় লেগেই আছে। শুধু কালীঘাটে নয়। কালীমন্দির আরও আছে। সেখানেও লোকেরা পুজো দেয়। রাত যখন গম্ভীর হয়, চিৎপুরের খালটা পেরিয়ে পেরিন সাহেবের বাগানটা ছাড়িয়ে আরও দূরে অন্ধকারের মধ্যে কারা যেন নিঃশব্দে কালীমন্দিরটায় গিয়ে ঢোকে। অন্ধকারের মধ্যেই তারা হড়িকাটের সামনে কাকে যেন ধরে নিয়ে আসে। গঙ্গাজল এনে তাকে স্নান করায়। টু শব্দটি পর্যন্ত করবার উপায় থাকে না। তার। চোখ-মুখ-কান-নাক কাপড়ের ফেটি দিয়ে বাঁধা। তারপর যখন সব শেষ হয়ে যায়, সবাই রক্তের ফোঁটা কপালে লাগিয়ে বেরিয়ে পড়ে। চণ্ডালের রক্ত। হাতে থাকে সড়কি বল্লম বর্শা আর রণ-পা। ঘোড়ার চেয়েও জোরে ছুটে চলে তারা সেই রণ-পা দিয়ে। তারপর সকালের সুতোনুটির লোক অবাক হয়ে দেখে কাণ্ডকারখানা। চিত্রেশ্বরী মন্দিরের মধ্যে সকালবেলা পুজো দিতে গিয়ে সাত হাত পেছিয়ে আসে পুরোহিত। নরবলি। নরবলিতে শান্ত হবার বদলে মায়ের জিভ আরও লকলক করে ওঠে। ফিরিঙ্গিদের সেপাই সান্ত্রি আরও তৎপর হয়ে ওঠে। পেরিন সাহেবের বাগানের বাদুড় আর চামচিকেরা। আরও কিচমিচ করে ওঠে।
কিন্তু সকাল হলেই আবার অন্য দৃশ্য। সাহেবরা যখন পুজো দিতে আসে তখন বড় জাকজমক হয়। সেদিন গণ্ডা গণ্ডা পাঁঠা বলি হয়। প্রসাদের পুষ্পবৃষ্টি লেগে যায়। চিৎপুরে কালীঘাটে পাণ্ডাদের পাড়ায় হাঁকডাক পড়ে যায়। এ-পাড়া ও-পাড়া সরগরম হয়ে যায়। চেতলা থেকে গঙ্গা পেরিয়ে সাঁতরে সবাই ও-পারে গিয়ে হাজির হয়।
কীসের পুজো গো? কীসের পুজো?
সাহেবরা পুজুরিদের ডেকে গণেশ পুজো করে, সরস্বতী পুজো করে। গোবিন্দপুর সুতানুটির লোক সে-প্রসাদ ভক্তিভরে মাথায় চুঁইয়ে খায়। বলে বেঁচে থাকো বাবা কোম্পানির সাহেব, অক্ষয় পেরমায়ু হোক সাহেব কোম্পানির
কিন্তু এবার আরও জাঁক। এবার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র এসেছেন কেষ্টনগর থেকে মায়ের পুজো দিতে। সঙ্গে সাত-সাতটা বজরা। এক হাজার পাঁঠা বলি হবে। বহুদিন আগে মহারাজার মানত ছিল, তারই উদ্যাপন। দান-ধ্যান-দক্ষিণার ছড়াছড়ি হবে। যে যত পারো কুড়িয়ে নাও। সঙ্গে সবাই এসেছে। রায় গুণাকর ভারতচন্দ্র এসেছেন, গোপাল ভাড় মশাই এসেছেন। কিন্তু মহারাজ তবু নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। কালীপ্রসাদ সিংহ তখনও আসেননি। বারবার খবর নিচ্ছেন তার।
বেলা পুইয়ে যখন তিন প্রহর তখন কালীপ্রসাদ সিংহ এলেন। মুর্শিদাবাদ থেকে সোজা নদীপথে এসে হাজির।
মন্ত্রীকে দেখেই আড়ালে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন-কী খবর?
খবর খুব খারাপ শুনে এলুম। আপনার কথা সব বুঝিয়ে বলে এলুম। বললুম ইংরেজদের সাহায্যটা বড় কথা নয়, যদি মিরজাফর দলে থাকে সত্যি সত্যি তবেই ভরসা
শুনে শেঠজি কী বললেন?
শেঠজি বললেন, মিরজাফরকে অপমান করেছ নবাব, সে দলে থাকবেই।
কী অপমান করেছে?
মিরজাফরকে নবাব হুকুম দিয়েছিল মোহনলালকে দেখলেই সেলাম করতে হবে।
শুনে মহারাজ কী যেন ভাবতে লাগলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন–আর হাতিয়াগড়ের জমিদার? তার সেই খবরটা সত্যি?
সত্যি বলেই তো শুনলুম। শুনলুম, ডিহিদারের লোক গিয়ে তাঁর দ্বিতীয়পক্ষের বউকে নাকি নিয়ে এসেছে
নিয়ে এসেছে মানে?
মানে, খবর পেলুম তাদের বজরা নাকি এতক্ষণে কাটোয়ায় পৌঁছে গেছে
মহারাজ গম্ভীর হয়ে গেলেন আরও। তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন–তুমি এক কাজ করো, উমিচাঁদকে খবর দাও যে, আমি এখানে এসে গেছি, আর রাজবল্লভ সেনকেও একবার দেখা করতে বলল আমার সঙ্গে দেখো, খুব সাবধানে যাবে, কেউ যেন টের না পায়–
