খেপেছ তুমি? আমি উচাটন করে দিয়েছিনা। দেখো তুমি, মরি’র কোনও ক্ষতি কেউ করতে পারবে না —
এতক্ষণ ধরে কী করছে ঘরের দরজা বন্ধ করে? যদি ওকে ওর বাপের কাছে পাঠিয়ে দেয়? তুই একবার গিয়ে দেখে আয় না
দুর্গা যাচ্ছিল, কিন্তু ওদিক থেকে তরঙ্গিনীও আসছিল এদিকে। তরঙ্গিনী বললে–ছোট বউরানিকে একবার ডেকে দে তো দুগ্যা–ডাকছে বড় বউরানি
সেখানেই সেই দিন সেই বন্ধ ঘরের মধ্যে বাংলাদেশের সেই মেয়ে এক অমোঘ প্রতিজ্ঞা করে বসল! এর চেয়ে যে সে-মৃত্যু অনেক ভাল। মৃত্যুর মধ্যেও তো ছোট মৃত্যু আর মহৎ মৃত্যু আছে। যে মৃত্যু মহৎ তার কাছে জীবন তত তুচ্ছ। যে-জীবন শুধু খাওয়া-পরা সাজাগোজার নামান্তর, সে জীবন তো মরালীর কাছে বিড়ম্বনা। মৃত্যুই তো সে কামনা করেছিল, বিষ খেয়েই তো সে জীবনকে আত্মসাৎ করতে চেয়েছিল। তার চেয়ে এ যে অনেক বেশি ভাল হল। যখন একবার ঘর ছেড়ে বেরিয়েছি, তখন সসাগরা পৃথিবীই তো আমার ঘর। আমি ওই অনন্তদিদি আর রাধারানিদিদির মতো সংসার করতে যে চাইনি। চাইনি বলেই তো পালিয়ে এসেছিলাম এখানে। এখানেও আমি এমন থাকতে পারতুম না। একদিন আমাকে এখান থেকেও বেরোতে হত, এখান থেকেও পালাতে হত। একদিন আমি এই হাতিয়াগড়ের ছাতিমতলায় ঢিবির ওপর ছুটোছুটি করে খেলে বেড়িয়েছি, এখন না হয় পৃথিবীর ঢিবিটার ওপরেই খেলে বেড়াব। ওরা আমাকে মদ খাওয়াবে? ওরা আমার গায়ে হাত দেবে? আমাকে গোরুর মাংস খাওয়াবে? খাওয়াক না, ওরা তো তাতে আর আমাকে পাবে না, পাবে আর একজনকে, সে-মেয়েটা যতই কলমা পড়ুক, তাতে আমি তো আমিই থেকে যাব। তবু তো মনে মনে জানব আমি আর একজনকে বাঁচিয়েছি। আর একজনের সুখের কারণ হয়েছি। একদিন বেহুলা যেমন করে তার স্বামীর শব নিয়ে মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিল, আমি না হয় আমার শবটা নিয়ে তেমনি করে মহাজীবন পাড়ি দেব! যদি নিজের এই শবদেহটাকে বেহুলার মতো কোনওদিন বাঁচিয়ে তুলতে পারি, সেদিন তো তবু আমার শব-সাধনা সার্থক হবে!
তা হলে আমার কাছে কথা দে, প্রাণ গেলেও কারও কাছে নিজের নাম বলবিনে?
মরালী বললে–এই তোমার পা ছুঁয়ে দিব্যি গালছি বড় বউরানি, প্রাণ গেলেও আমি তোমাদের কাউকে দায়ী করব না, এই তোমার পায়ে মাথা ঠেকিয়ে দিব্যি গালছি
তারপর ছোট বউরানির দিকে চেয়ে বড় বউরানি জিজ্ঞেস করলেন–আর তুই?
মরালী বললে–কাক-পক্ষীতেও জানতে পারবে না বড় বউরানি আমি মরালী, সবাই জানবে আমি হাতিয়াগড়ের ছোট বউরানি–
আর ও? ওই মুখপুড়ি?
ছোট বউরানি তখন আঁচলে চোখ ঢেকে কাঁদছে। দুর্গা বললে–ছোট বউরানিকে আমি দেখব, ছোট বউরানিকে আমি লুকিয়ে রাখব মন্তর পড়ে–তুমি কিছু ভেবো না বড় বউরানি
আবার তোর ওই বুজরুকি?
বিশ্বাস করো বড় বউরানি। ছোট বউরানির গায়ে কারও আঁচড় লাগবে না–আমি উচাটন করব
কিন্তু তার আগে ছোটমশাই এলে কী বলব তাই বল–ছোটমশাই হয়তো আজই এসে যাবেন–
তুমি বোলো ছোট বউরানিকে তুমি খুন করে ফেলেছ
তার মানে?
তুমি তাই-ই বলো না, তারপর আমি তো আছি
যদি জিজ্ঞেস করেন লাশ কোথায় গেল?
বোলো নদীতে লাশ ভাসিয়ে দিয়েছ!
বড় বউরানি রেগে গেল–তা মাথা-মুন্ডু যাহোক একটা কিছু বললেই হল? নবাব টের পাবে না? নবাবের শাগরেদরা যদি কাউকে বলে দেয়?
নবাবের হারেমে একবার গেলে কি আর তাকে কাক-পক্ষীতে দেখতে পায় বউরানি! তখন কি আর তার নামধাম কোথাও লেখা থাকে? তখন যে তার কুলুজি পর্যন্ত ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায় তখন কি আর কেউ জানতে পারবে যে ও হাতিয়াগড়ের না লস্করপুরের, কোথাকার?
কিন্তু ছোটমশাইকে ছেড়ে ও-মুখপুড়ি থাকতে পারবে? ও যে একদিন এক বিছানায় শুতে না পারলে হাঁসফাস করে–
তা কিছুদিন একটু কষ্ট করুক না বউরানি, প্রাণের চেয়ে সে তবু তো ভাল।
কী রে, তুই ছোটমশাইকে ছেড়ে থাকতে পারবি মুখপুড়ি?
মুখপুড়ি তখন চোখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছে।
দুর্গা বললে–সে তুমি আমার ওপর ছেড়ে দাও বড় বউরানি, আমি সামলে রাখব সব–এ-ছাড়া তো আর গতিই নেই–
তারপর সেই রাজবাড়িতে রাত আরও গম্ভীর হয়ে এল। আমগাছটার কোটরে তক্ষক সাপটা কয়েকবার কটকটকটাস করে ডেকে উঠল। তারপর রাত যখন আরও গম্ভীর হল, রাজবাড়ির সদর মহলে ডিহিদারের লোক এল পালকি নিয়ে। বড় বউরানি দুর্গাকে ডাকলেন নিঃশব্দে। দুর্গাও ঘুমোয়নি। ছোট বউরানিকে ডেকে আস্তে আস্তে সিঁড়ির নীচের ঘরে ঢুকিয়ে দরজায় চাবি বন্ধ করে দিয়ে এল।
ছোট বউরানি একবার শুধু জিজ্ঞেস করলে আমি এখানে কী করে থাকব দুগ্যা
তুমি থাকো না ছোট বউরানি, আমি তো আছি, আমি থাকতে তোমার ভাবনাটা কী!
কিন্তু কতদিন থাকতে হবে?
দুর্গা বললে–দেখো না, আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি, তুমি যেন আবার কথাটথা বোলো না, ডিহিদারের সেপাইরা চলে যাক, তখন আমি আবার আসব–
ছোটমশাই যদি আজ এসে আমাকে খোঁজে?
দুর্গা রেগে গেল। বললে–তা হলে তুমি চলো, তোমাকেই আমি ডিহিদারের পালকিতে তুলে দিয়ে আসছি
না না, তুই রাগ করছিস কেন দুগ্যা? আমি কি তাই বলেছি?
তা একটা রাত আর আলাদা কাটাতে পারবে না তুমি? তোমার ভালর জন্যেই তো এসব করছি গো!
ছোট বউরানি বললে–যদি ওই মেয়েটা ধরা পড়ে?
ধরা পড়বে কেন? তার জন্যে তো আমি দায়িক আছি। আমি তো উচাটন করে দিয়েছি ওকে, দেখলে না ওর মাথার চুল ছিঁড়ে থুতু দিয়ে মন্তর পড়ে দিয়েছি। দেবনর-গন্ধর্ব কেউ ওর কিছু করতে পারবে
