তারপর আসত শোভারাম। গোকুল সরষের তেলের পাথরবাটি এনে দিত। গামছা, তেল, দাঁতন জোগান নিয়ে শোভারামের অপেক্ষা করে থাকাই কাজ।
খবর এসে গিয়েছিল ছোটমশাই শেষরাত্রের দিকে বাড়ি ফিরেছেন। দু’জনে বসে আছে তো বসেই আছে ঠায়।
বিশু পরামানিক জিজ্ঞেস করে-কী গো শোভারাম, তোমার মেয়ের কিছু হদিশ পেলে?
একথা শুনে শুনে আর একথার জবাব দিয়ে দিয়ে মুখ পচে গেছে শোভারামের। তবু মানুষের যেখানটায় ব্যথা সেইখানেই ঘা দেওয়া যেন মানুষের স্বভাব। কেন বাপু, অন্য কথা বললেই হয়। আর কি কোনও কথা নেই?
যেকদিন ছোটমশাই ছিলেন না সেকদিন বিশু পরামানিকেরও এখানে আসতে হয়নি, শোভারামকেও আসতে হয়নি। কোনও ঝঞ্জাটই ছিল না কোথাও। শোভারাম নিজের ঘরের মধ্যে খিল এঁটে পড়ে থাকত। সেই মরালী পালিয়ে যাবার পর থেকেই এমনি। শুধু আর একদিন গিয়েছিল দুর্গার কাছে। দুর্গা বলেছিল–না বাপু, মেয়েকে তোমার পাওয়া যাবে না শোভারাম, ও দেবের অসাধ্যি
শোভারাম বলেছিল–তা জলজ্যান্ত মেয়েটা তো আর আকাশে উড়ে যেতে পারে না তাই বলে?
দুর্গা বলেছিল–কেন পারবে না, তুমি বলো না, তোমাকেই আমি আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছি বকভৈরবী মন্তর পড়ে-মন্তরের ওপর তোমার অত অচ্ছেদ্দা বলেই মেয়ে তোমার পালিয়ে গেছে, তা জানো
তা হলে মন্তর পড়েই আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দে দুগ্যা–আমি যে একদণ্ড সুস্থির থাকতে পারছিনে।
এইরকম করেই বলত রোজ শোভারাম। আর ঠিক তার পরেই সেই কাণ্ড ঘটল। ছোট বউরানির সঙ্গে পাশা খেলতে খেলতে হঠাৎ বড় বউরানি একেবারে পালঙের তলা থেকে হাতেনাতে ধরে ফেললে মরালীকে!
এ কে? কে এখেনে?
ছোট বউরানি তখন বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছে। বললে–ওর সঙ্গে আমি পাশা খেলছিলুম বড়দি
বড় বউরানি ধমক দিয়ে উঠল–ওলো, তা আমি দেখতে পাচ্ছি, আমি এখনও চোখের মাথা খাইনি, কিন্তু কে এ?
দুর্গা ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। বললে–ওকে কিছু বোলোনা বড় বউরানি, আমি ওকে নিয়ে এইচি এখেনে, ও বড় দুঃখী!
তবু সেই এক কথা! আমি জিজ্ঞেস করছি, এ কে, তার জবাব দিবি তো?
দুর্গা তখন বড় বউরানির পা দুটো জড়িয়ে ধরেছে। বললে–তুমি কাউকে বলতে পারবে না বউ বউরানি, ও আমাদের শোভারামের মেয়ে, বিয়ের সময় বর পছন্দ হয়নি বলে পোড়ারমুখি আত্মঘাতী হতে যাচ্ছিল, আমিই ওকে এখানে এনে লুকিয়ে রেখেছি, ও-বেচারির কোনও দোষ নেই–ওর কোনও দোষ নেই
তা ওর বাপ যদি টের পায়?
শোভারামকে আমি বলেছি তার মেয়েকে আর পাওয়া যাবে না, পুষ্যানক্ষত্রে শ্বেতজয়ন্তীর শেকড় খেয়ে হাওয়ায় উড়ে গেছে
রাখ তোর বুজরুকি! ধমক দিয়ে উঠল বড় বউরানি।
বুজরুকি নয়, বড় বউরানি, পুষ্যা নক্ষত্রে শ্বেতজয়ন্তীর শেকড় খেলে সত্যি সত্যি উড়ে যায়—
থাম তুই! ওর বর কোথায়?
বরের কাছে ও যাবে না, বর আসতে দেরি হয়েছিল বলে আমাদের অতিথশালা থেকে একটা পাগলা-ছাগলা মানুষের সঙ্গে ওর বিয়ে দিয়ে দিয়েছে ওর বাপ এখন বাপের কাছে পাঠালেই ওর বাপ সেই পাগলা বরের কাছে পাঠিয়ে দেবে
বড় বউরানি কী যেন ভাবলে খানিকক্ষণ। একবার ছোট বউয়ের দিকে তাকালে, আর একবার মরালীর দিকে তাকালে। তারপর বললে–এ যে এ বাড়িতে লুকিয়ে আছে তা কেউ জানে?
না বড় বউরানি, মা কালির দিব্যি, বলছি কেউ জানে না। আমি জানি আর ছোট বউরানি জানে!
ওর নাম কী?
মরালী। ছোটমশাই ওই নাম রেখেছিলেন ওর
তারপর একটু থেমে বড় বউরানি বললেন–তা হলে ওকে তুই আমার মহলে পাঠিয়ে দে, তোকে আসতে হবে না–ও একলা আমার ঘরে আসুক–
বলে বড় বউরানি চলে গেলেন। চলে যেতেই মরালী বড় ভয় পেয়ে গিয়েছিল। বলেছিল–কী হবে দুগ্যাদি?
কী আর হবে! কচুপোড়া হবে। আমি যতক্ষণ আছি ততক্ষণ তোর ভয় কী?
আমাকে যদি বরের কাছে পাঠিয়ে দেয়?
ওমনি পাঠিয়ে দিলেই হল? আমি উচাটন করব না? তোর কোনও ভয় নেই, তুই যা—
মরালী তবু নড়ে না। বললে–কিন্তু আমার বড় ভয় করছে যে দুগ্যাদি—
তবে আয়, উচাটন করে দিই
বলে মরালীকে হাত ধরে কাছে টেনে আনলে। বললে–তোর মাথার একগাছা চুল দেখি—
মরালী দুর্গার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। দুর্গা তার মাথা থেকে একগাছা চুল ছিঁড়ে নিয়ে তাতে কী সব মন্ত্র পড়তে লাগল। ওঁ নমো ভগবতে রুদ্রায় দংষ্ট্রাকরালায় উদ্ধব দাসৈঃ হনহন দহদহ পচপচ উচ্চাটায় উচ্চাটায় হুঁ ফট স্বাহা ঠং ঠঃ। মন্ত্রটা অনেকবার বলতে লাগল বিড়বিড় করে। তারপর সেই একগাছ চুল পুঁটলি পাকিয়ে তার ওপর একদলা থুতু দিয়ে মাথার খোঁপার মধ্যে বেঁধে দিলে।
বললে–যাঃ, উচাটন করে দিলাম। যে তোর ক্ষেতি করতে যাবে তার সব্বোনাশ নিঘ্যাত যাঃ, চলে যা, কিচ্ছু ভয় নেই–আমি উচাটন করে দিয়েছি, আর কীসের ভয় তোর–
বলে ঠেলে ঠেলে নিয়ে গেল বড় বউরানির মহলের দিকে। ঘরের ভেতর যেতেই বড় বউরানি ঘরের দরজায় খিল লাগিয়ে দিয়েছে।
তারপর যখন সন্ধে হয়ে এসেছে, পুজোবাড়িতে কাঁসর-ঘণ্টা বেজে উঠেছে, তখনও ছোট বউরানির ভয় যায়নি। তখনও ঘর থেকে বেরোয় না কেউ। দুর্গাও ছিল। ছোট বউরানির জলখাবার এনে দিলে। ছোট বউরানিকে খাইয়ে দাইয়ে রোজকার মতো পা ধুইয়ে আলতা পরিয়ে চুল বেঁধে দিলে, তখনও বড়। বউরানির মহল থেকে কোনও সাড়া শব্দ নেই।
ছোট বউরানি জিজ্ঞেস করলে কী হল রে দুগ্যা, মেয়েটাকে খুন করে ফেললে নাকি বড়দি?
