কিন্তু একটা বাত আছে, নানিবেগমসাহেবা যেন টের না পায়।
পিরালি এবার জবাব দিতে দেরি করলে। নানিবেগমের কাছ থেকে খবর লুকিয়ে রাখা একটু শক্ত। সব দিকেই যেন নানিবেগমের কড়া নজর। নানিবেগম যে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব খবর জেনে নিতে চায়। কোথায় কে রাত্রে কার ঘরে গিয়ে কী ষড়যন্ত্র করছে, কার কীসের কষ্ট, কার কী অসুখ, কী দুঃখ, কে হারেমের ভেতরে লুকিয়ে লুকিয়ে কোম্পানির সাহেবদের সঙ্গে কারবার করছে, জগৎশেঠজির কাছ থেকে হুন্ডি কাটছে, সব নানিবেগমের নখদর্পণে। কোরান নিয়ে পড়লে কী হবে, সমস্ত চেহে সুতুনটা যেন নানিবেগমের সংসার। কে বেশি মদ খেয়ে বেহুঁশ হয়ে আছে, কে গোসা করে উপোস করছে, কে রোজার দিন লুকিয়ে-ছাপিয়ে কী খাচ্ছে, তারও খবর চাই নানিবেগমের!
কিন্তু এ-খবর যদি নানিবেগমসাহেবা জানতে পারে তো তোমার নোকরি থাকবে না পিরালি।
জনাব খোদাবন্দ, বান্দা তো নবাবের নিমক খায়, নিমকহারামি কী করে করবে জনাব?
তা রানিবিবি তো নবাবের খেদমতের জন্যেই আসছে, তুমি যেমন নবাবের খিদমদগার, বেগমরাও তো খিদমদগার ছাড়া আর কিছু নয়!
তা তো বটেই হুজুর। নবাবের খেদমতি করতেই তো বেগমদের পয়দা হয়েছে। খোজাদেরও পয়দা হয়েছে।
তা হলে সেই কথাই রইল!
পিরালি জিজ্ঞেস করলে রানিবিবি কবে নাগাইদ আসবে হুজুর?
আর দু-তিন রোজের মধ্যেই এসে যাবে। হাতিয়াগড় থেকে আসতে তার বেশি সময় লাগবে না, তারা সেখান থেকে রওয়ানা করে দিয়েছে। আমি খবর পেয়ে গিয়েছি ডিহিদারের কাছ থেকে–।
তা হলে জনাব এক কাজ করুন। কাফের বিবি তো? মসজিদের ইমাম সাহেবকে দিয়ে শুরুতেই কলমা পড়িয়ে আগে মুসলমান বানিয়ে নিন। নাম ভি বদলে দিন–নাম দিয়ে দিন মরিয়ম বেগম
শোহনআল্লা! তোমার তো খুব বুদ্ধি পিরালি
তা না থাকলে এতদিন বান্দার ঘাড়ের ওপর শিরটা আছে কেমন করে জনাব?
তা হলে নানিবেগম যদি জিজ্ঞেস করে, ও কে, কোথা থেকে এল? তুমি কী জবাব দেবে পিরালি?
আমি বলব ও মরিয়ম বেগম, লস্করপুরের তালুকদার কাশিম আলির লেড়কি, বেগম বনবার জন্যে নবাবের কাছে দরবার করেছিল
বহুত আচ্ছা, তা হলে এক কাম করো…
কথাগুলো ফিসফিস করেই হচ্ছিল, হঠাৎ দেয়ালের ওপাশে যেন কার গলার আওয়াজ শোনা গেল–উধার কৌন? পিরালি?
জি বেগমসাহেবা!
একেবারে খাস নানিবেগম! কিন্তু ততক্ষণে মেহেদি নেসার জাফরির থামের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছে। নানিবেগমসাহেবা সারা রাতই হয়তো কোরান পড়ে কাটিয়েছে। তারপর মসজিদে গিয়েছিল নমাজ করতে। এখন ফিরছে।
কার সঙ্গে বাতচিত করছিলে পিরালি?
বরকত আলির সঙ্গে বেগমসাহেবা। আজকে রাত-পাহারা ছিল বরকত আলির, বেতমিজটা ঘুমিয়ে পড়েছিল তাই বকাবকি করছিলুম। কেউ পাহারায় গাফিলতি করলে মেজাজ শরিফ থাকে?
মনে হল নানিবেগম যেন খুশ হল কথাটা শুনে।
আমার মেহেরুন্নিসা শরবত খেয়েছে? গোঁসা কেটেছে মেয়ের?
খেয়েছেন বেগমসাহেবা। বড্ড গোঁসা হয়েছিল, আমি বুঝিয়ে-সুজিয়ে খাইয়ে এসেছি। এখন আরামসে ঘুমোচ্ছেন দেখে এসেছি–আপনি কিছু ভাববেন না বেগমসাহেবা।
আর পেশমন? সেই ছোঁড়াটা আসে না তো আর পেশমনের কাছে?
তাকে তো কোতল করা হয়ে গেছে বেগমসাহেব! বাঘের বাচ্চাকে কি জিন্দা রাখতে আছে?
তারপর আরও অনেক খবর নিলে নানিবেগম। গোসলমহলে পানি ঠিক আছে কিনা, তকিবেগমের তবিয়ত কেমন আছে, আমিনার গয়না খোয়া গিয়েছিল সেটা সে পেয়েছে কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক খবর। তারপর খুশি হয়ে নামিবেগম চলে গেল। আস্তে আস্তে ভোর হচ্ছে। চেহেল্-সুতুনের বাইরে যখন ভোর হয় তখনও এর ভেতরে গভীর রাত, সেই সময়েই নহবতখানার ওপর থেকে ইনসাফ মিঞা ভৈরবীর তান ধরে নহবতেএকেবারে উদারার কোমল রেখাব থেকে মোচড় দিতে দিতে কোমল। গান্ধার ছুঁয়েই আবার নেমে যায় উদারার সুরে। তারপর আস্তে আস্তে মুদারার কোমল ধৈবতটা একটুখানি ছুঁয়ে এসেই জমে যায় কোমল গান্ধারে। এইরকম করতে করতে ভোর হয়। গঙ্গার ওপারে কাশিমবাজারের দিক থেকে সূর্যের আলোটা ঠিকরে এসে পড়ে চেহেলসূতুনের মিনারের চূড়ায়। তখন নানিবেগমের কোরান পড়া শেষ হয়ে গিয়েছে। তখন আড়মোড়া খেয়ে ঘুম ভাঙে চেহেলসুতুনের।
মেহেদি নেসার বাইরে আসতেই খাস-দরবারের কাছেই নেয়ামত দৌড়োত দৌড়োত এসেছে।
হুজুর, নবাব এত্তেলা দিয়েছে।
সেকী! মেহেদি নেসার অবাক হয়ে গেছে। এত সকালেই মির্জা মতিঝিলে পৌঁছে গেছে?
নবাব একলা, মা আর কেউ আছে?
হুজুর, সফিউল্লা সাহেব আছে, ইয়ারজান সাহেব আছে, মোহনলালজি আছে, মিরমদন সাহেব ভি আছে
নেয়ামত মতিঝিলের খিদমদগার। সে সবাইকে চেনে। কিন্তু এত সকালে তো মির্জার আসার কথা নয়। চল, চল, জলদি চল। মির্জার তলব মানে যে খোদাতালার তলব!
জনাব, আর একটা বাত, মিরবকশিকে যখন নবাব তলব দিয়েছে, তখন মালুম হচ্ছে শায়েদ লড়াই হবে।
লড়াই? মেহেদি নেসার ফুঃ শব্দ করলে মুখ দিয়ে। লড়াই হবে কী রে! এখন সবে হাতিয়াগড়ের রানিববিকে এনে মরিয়ম বেগম বানাচ্ছি, এখন লড়াই করতেই দেব না মির্জাকে। এখন লড়াই করবার ফুরসত কোথায়?
বলে বাইরে দাঁড়ানো পালকির ভেতর উঠে বসল মেহেদি নেসার। বললে–জলদি হাঁকা—
*
ছোটমশাই আসার খবর পেয়েই বিশু পরামানিক এসে সকাল থেকে বসে ছিল। এখানকার ভোর হওয়ারও একটা রীতি আছে। সে মুর্শিদাবাদের চেহেল-সূতুনের ভোর হওয়া নয়। এখানে সমস্ত শান্ত। বড় পুকুরঘাটের ওপর আমগাছটার ছায়া আস্তে আস্তে হেলে যায় পশ্চিমদিকে। খোলা মাঠময় রোদ ছড়িয়ে পড়ে রাজবাড়ির ছাদে, দরদালানে, খাজাঞ্চিখানায়, কাছারিবাড়িতে, অতিথিশালার উঠোনে, আর পুকুরঘাটের পাথর-বাঁধানো পইঠের ওপর। বিশু পরামানিক বড়মশাইকে খেউরি করবার জন্যেও ঠিক ওইখানে এসে বরাবর বসে থাকত। তারপর গোকুলকে দেখলেই জিজ্ঞেস করত–ও গোকুল, বড়মশাই উঠেছেন নাকি?
